গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়ে আওয়ামী লীগ সরকার। এর পরপর সব জায়গায় পরিবর্তন হলেও গুলিস্তানের মার্কেটগুলোর সিন্ডিকেট পরিবর্তন হয়নি। একসময় আওয়ামী লীগের এমপি আফজাল, মেয়র তাপস, খোকন, কাউন্সিলর রতন সিন্ডিকেটের লোকজন বিএনপির কাঁধে ভর করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তাদের অভিযোগ, পতিত স্বৈরাচার সরকারের আমলের অনিয়ম-দুর্নীতিতে সিদ্ধহস্ত অনেকেই বিএনপিকে ব্যবহার করে অপকর্ম করছে। এমনকি বঙ্গবাজারে আগুনের ঘটনায় করা মামলার বাদীকে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে হত্যা মামলার আসামি করা হচ্ছে। নানাভাবে হুমকি দিয়ে বাদীকে কোণঠাসা করে বঙ্গবাজারের অগ্নিকান্ড আগের মতো ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা করে যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছর ৪ এপ্রিল ভোরে আগুন লাগে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী বিপণিবিতান বঙ্গবাজারে। ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যায় মার্কেটটির চারটি ইউনিটসহ আশপাশের আরও তিন মার্কেট। দোকান, মালামাল ও নগদ টাকা পুড়ে নিঃস্ব হন শত শত ব্যবসায়ী। অনেক ব্যবসায়ী পরিকল্পিত আগুনের অভিযোগ করলেও তৎকালীন সরকার পাত্তা দেয়নি। এমনকি অভিযোগকারী ব্যবসায়ীরা হুমকি এবং মারধরের শিকার হন।
ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর গত ২২ অক্টোবর বঙ্গবাজারে পরিকল্পিতভাবে আগুন দেওয়ার অভিযোগ এনে ৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী রাজধানীর মিরপুর এলাকার বাসিন্দা কামাল হোসেন রিপন। এরই মধ্যে মামলার তদন্ত কাজ শুরু করেছে শাহবাগ থানা পুলিশ। একজন আসামিকেও গ্রেপ্তার করেছে তারা। তবে এ মামলা করে বেকায়দায় পড়েছেন ব্যবসায়ী রিপন। হত্যা মামলার আসামি করাসহ তাকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
আলাপকালে রিপন বলেন, মার্কেটের পুরনো সিন্ডিকেট এখন নতুনভাবে ফিরে এসেছে। বিএনপিকে ব্যবহার করে একটি অসাধু চক্র মার্কেটে আগুন দেওয়ার ঘটনা ধামাচাপা দিতে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। এতে আমি ও আমার পরিবার মারাত্মক উদ্বিগ্ন।
তিনি বলেন, বঙ্গবাজার পোড়ানোর মামলায় একজন আসামি গ্রেপ্তার হওয়ার পর আমাকে চারটি মামলার আসামি করা হয়েছে। মিরপুর থানায় এসব মামলায় আমাকে জড়িয়েই তারা ক্ষান্ত হয়নি। আমার চার ভাইকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা। যে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ছিল, তার অন্যায় থাকলে মামলা হতেই পারে। কিন্তু আমিসহ অন্য ভাইদের আসামি করে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। যাতে আমি মামলা (বঙ্গবাজার পোড়ানোর) তুলে নিই। সম্প্রতি কুরিয়ার সার্ভিসে এক চিঠি পাঠিয়ে আমাকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এখন আমি প্রাণ ভয়ে পলিয়ে আছি। আমার ব্যবসা-বাণিজ্যও দখলের হুমকি আসছে।
গুলিস্তানের ব্যবসায়ীরা বলেছেন, আওয়ামী লীগ শাসনামলের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন, ব্যারিস্টার তাপস ও কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক এমপি আফজাল ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন রতন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ীকে নিয়ে মার্কেটগুলোয় সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।
গুলিস্তানকেন্দ্রিক সরকারি এসব মার্কেটে তাদের হয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে দোকান বাণিজ্য বাস্তবায়ন করেছিলেন দেলোয়ার হোসেন দেলু, নাজমুল হুদা, মোজাম্মেল হক মজু, হুমায়ুন কবির মোল্লা ও জহিরুল ইসলাম সিন্ডিকেট। তাদের সবাই আওয়ামী লীগ আমলে মার্কেট মালিক সমিতির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে ছিলেন। এর মধ্যে ট্রেড সেন্টারের উত্তরের সভাপতি ছিলেন নাজমুল ও সাধারণ সম্পাদক মজু। আর ট্রেড সেন্টার দক্ষিণের সভাপতি ছিলেন হুমায়ুন ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এমপি আফজাল।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকার পরিবর্তনের পর আওয়ামী আমলের সুবিধাভোগীরা আত্মগোপন করলেও ঢাকা ট্রেড সেন্টার উত্তরের সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক মজু কর্তৃত্ব ধরে রাখতে নানা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নানা তদবির করে পদও বাগিয়ে নিয়েছেন ঢাকা মহানগর বিএনপিতে। রামগঞ্জ স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী জানান, ২০০৮ সালে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার দুর্দিনের এমপি নাজিম উদ্দিনকে আহ্বায়ক থেকে বাদ দিয়ে কৌশলে রামগঞ্জ উপজেলা বিএনপির অহ্বায়ক হন মজু। তাকে পদ দেওয়ার পর উপজেলা বিএনপি কয়েকভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
রামগঞ্জ বিএনপির পদধারী দুজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মোজাম্মেল হক মজু রামগঞ্জ বিএনপিতে বিভক্তি সৃষ্টি করেছেন। অধিকাংশ বিএনপি নেতাই তার কার্যকলাপ পছন্দ করেন না। মজু আওয়ামী লীগ আমলে তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ৫ আগস্ট হাসিনা সরকার পতনের পর আবার বিএনপি সাজার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে টাকার জোরে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপিতে সদস্য পদ বাগিয়ে নিয়েছেন।
পুরনো নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, হাসিনা সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন মোজাম্মেল হক মজু। ‘রাতের ভোটের’ সংসদ সদস্য খ্যাত লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ার খানের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একসঙ্গে মঞ্চে বসেছিলেন। রামগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজাহানের সঙ্গেও আওয়ামী লীগের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানেও একই মঞ্চে অংশ নিতে দেখা গেছে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু দেশ রূপান্তরকে বলেন, মোজাম্মেল হক বিএনপি করেন, সে হিসেবেই তাকে পদ দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের আমলে তার কর্মকা- আমাদের জানা নেই। তবে মার্কেটে ব্যবসা থাকার কারণে অনেকের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার প্রয়োজন হতে পারে। এসব বিষয়ে মোজাম্মেল হক ভালো বলতে পারবেন। তবে মোজাম্মেল হক মজুর মোবাইলে একাধিকবার কল দেওয়া হলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
