বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড যদি তাদের গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করে ঢাকার ক্লাবগুলোর কাউন্সিলর সংখ্যা কমিয়ে আনে এবং বিসিবির পরিচালকদের মধ্যে ক্লাবের প্রতিনিধি আনুপাতিক হারে হ্রাস করে, তাহলে ধর্মঘটে যাবে ক্লাবগুলো। মঙ্গলবার ঢাকার একটি হোটেলে ক্রিকেট কমিটি অব ঢাকা মেট্রোপলিস (সিসিডিএম) এর সদস্য ক্লাবগুলোর সদস্যদের অংশগ্রহণে মুক্ত আলোচনা এবং মতবিনিময় সভা শেষে এ আলটিমেটামের কথা জানিয়েছেন ক্লাব সংগঠকরা। নবগঠিত সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ক্রিকেট ক্লাব অফিশিয়ালস অব ঢাকা’-এর ব্যানারে ক্লাব কর্মকর্তারা এই দাবি জানিয়েছেন, একই সঙ্গে তারা বিসিবি পরিচালক নাজমুল আবেদীন ফাহিমের পদত্যাগও দাবি করেছেন।
বিসিবির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রিমিয়ার লিগ, প্রথম বিভাগ লিগ, দ্বিতীয় বিভাগ লিগ ও তৃতীয় বিভাগ লিগে অংশ নেওয়া প্রতিটি ক্লাবের একজন করে প্রতিনিধি বিসিবিতে থাকবেন। এই প্রতিনিধিরা বা কাউন্সিলরদের ভোটে ১২ জন পরিচালক নির্বাচিত হবেন। বিসিবির সর্বমোট পরিচালক সংখ্যা ২৫, যাদের ভেতর ক্লাবের কাউন্সিলরদের ভোটে নির্বাচিত হবেন এই ১২ জন। আঞ্চলিক ও জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলো থেকে আসবেন মোট ১০ জন। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ মনোনীত পরিচালক হবেন ২ জন ও সাবেক খেলোয়াড় এবং বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে পরিচালক হিসেবে আসবেন ১ জন। ৩১ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে বিসিবি পরিচালকদের সভা শেষে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়, নাজমুল আবেদীন ফাহিমকে প্রধান করে একটি গঠনতন্ত্র সংশোধন কমিটি করা হয়েছে। পরে এই কমিটিতে সদস্য সচিব করা হয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব মো. সাইফুল ইসলামকে। কমিটির বাকি তিন সদস্য হচ্ছেন- বিসিবির লিগ্যাল অ্যাডভাইজার মো. কামরুজ্জামান, ব্যারিস্টার শেখ মাহদি ও এ কে এম আজাদ হোসেন।
ক্লাব সংগঠকদের দাবি, এই কমিটিতে ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের সঙ্গে কাউকে না রাখার মাধ্যমে তাদের অপমান করা হয়েছে। বিসিবির সাবেক পরিচালক আলি আহসান বাবু, সাবেক পরিচালক জিএস হাসান তামিম, লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জ দলের মালিক লুৎফর রহমান বাদল, সিসিডিএম-এর সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মাসুদুজ্জামান, ধানম-ি ক্লাব লিমিটেডের প্রতিনিধি শানিয়ান তানিমসহ অনেকেই বক্তব্য রাখেন। আওয়ামী সরকারের আমলে মামলার ভয়ে দেশের বাইরে থাকা লুৎফর রহমান বাদল বলেন, ‘আপনারা জানেন আমার মামলা ছিল। দেশের বাইরেও ছিলাম। এরপরও ক্রিকেট দল গড়েছি। ঢাকার সব পর্যায়ের ক্লাবগুলো বছরে ১০০ কোটি টাকা খরচ করে। এর বিপরীতে এই প্রস্তাবনা রীতিমতো আমাদের জন্য অপমান। আমাদের এই দাবি পূরণ না হলে আমরা প্রিমিয়ার লিগে কোনো খেলোয়াড়ের সঙ্গে দলবদল নিয়ে কথা বলব না। আমরা কার্যক্রম স্থগিত রাখব।’ সিসিডিএমের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মাসুদুজ্জামান বলেন, ‘সিসিডিএমের পদের আগে আমি একজন ক্লাবের কাউন্সিলর ও ক্লাব সংগঠক। বাংলাদেশের ক্রিকেটের মূল ভিত্তি ক্লাব। ক্রিকেটের অবদানে যেখানে পরিচালক সংখ্যা ১২ থেকে বৃদ্ধি করে ১৫ হওয়া উচিত সেখানে তারা কমিয়ে মাত্র ৪ করছে এবং কাউন্সিলরশিপও কমিয়ে রাখছে যেটা আসলেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ ক্লাব কর্মকর্তারা অনেকেই মুক্ত আলোচনায় নিজেদের মত প্রকাশ করলেও তাদের সুর একই।
বিসিবির গঠনতন্ত্র সংস্কারের প্রস্তাবনায় ক্লাবের কাউন্সিলরদের সংখ্যা ৭৬ জন থেকে কমিয়ে ৩০ জনে নামিয়ে আনা, পরিচালকের সংখ্যা ১২ জনের বদলে ৪ জন করা এবং ক্লাবের প্রতিনিধি কমিয়ে জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার প্রতিনিধি বাড়ানোর যে খসড়া রূপরেখা প্রণয়ন করেছে বিসিবির গঠনতন্ত্র সংশোধন কমিটি; ক্লাব কর্তারা সেটা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি ফাহিম অনির্বাচিত বোর্ড পরিচালক, তার পক্ষে সংবিধান সংশোধন কমিটির প্রধান থাকা অনুচিত। ক্লাব কর্তারা আরও জানিয়েছেন যে স্বাধীনতার আগে এবং পরে থেকে, বাংলাদেশের ক্রিকেটের মেরুদন্ড হচ্ছে ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট। ঢাকায় ক্লাব ক্রিকেট খেলেই ক্রিকেটাররা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এসে খেলে বড় হয়েছেন, তারকা হয়েছেন। ক্লাব কর্তারা নিঃস্বার্থ ভাবে খেলাকে ভালোবেসে বাড়ি, জমি, গহনা বন্ধক রেখে বা বিক্রি করে ক্লাবের খরচ চালিয়েছেন। বিনিময়ে কিছুই পাননি। ক্রিকেট বোর্ডে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ কমিয়ে দিয়ে তাদের এই দীর্ঘদিনের নিরলস পরিশ্রমকে অপমান করা হয়েছে। বিসিবির সাবেক পরিচালক আলী আহসান বাবু বলেন, ‘তিনি (ফাহিম) ক্রিকেট কোচ হিসেবে অনন্য কিন্তু সংগঠক হিসেবে এখনো সেই পর্যায়ে যাননি।’ এক দশকের বেশি সময় দেশের বাইরে ছিলেন লালমাটিয়া ক্লাবের দীপন। সম্প্রতি আবার দেশে ফিরেছেন এই ক্রীড়া সংগঠক। তিনি নাজমুল আবেদীন ফাহিমকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘তাকে ক্রিকেট ছাড়তে হবে। বোর্ড সভাপতি ও ক্রীড়া উপদেষ্টাকে বিষয়টি দেখতে হবে।’
মতবিনিময় সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে রফিকুল ইসলাম বাবু জানান, বিসিবি এই সংশোধন প্রক্রিয়া থেকে সরে না এলে ঢাকার কোনো লিগেই অংশ নেবে না ক্লাবগুলো, ‘গঠনতন্ত্র সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্রিকেটকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা ঢাকার সব ক্লাবের পক্ষ থেকে বিসিবিকে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিলাম। এই সময়ের মধ্যে তারা যদি এই সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেয় তাহলে আমরা শনিবার বোর্ড সভাপতির সঙ্গে বসব। সেখানেও কোনো সমাধান না হলে ঢাকার ক্লাবগুলো খেলায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকব।’
ক্লাব কর্মকর্তারা জানান, তারা বিসিবি সভাপতি এবং ক্রীড়া উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি দেবেন, শনিবার বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদের সঙ্গে তারা বৈঠক করবেন। সেখানে যদি আশানুরূপ ফল না আসে তাহলে ১৯ জানুয়ারি শুরু হতে যাওয়া প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে অংশগ্রহণে বিরত থাকবে ক্লাবগুলো। এমনকি দল বদল বা দল গঠন নিয়ে প্রিমিয়ার লিগের দলগুলোও ক্রিকেটারদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করবে না। বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে বেশিরভাগ ক্রিকেটারের আয়ের প্রধান উৎস ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, যার নিচের ধাপ হচ্ছে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগ। ক্লাবগুলো খেলা থেকে বিরত থাকলে সমস্যায় পড়বেন ক্রিকেটাররা, বিশেষ করে উঠতি এবং অনামি ক্রিকেটাররা।
বিসিবির গঠনতন্ত্র সংশোধন প্রক্রিয়া এখনো খসড়া পর্যায়ে আছে। কমিটি তাদের প্রতিবেদন বোর্ড পরিচালকদের সভায় অনুমোদিত হলে তারপর বিশেষ সাধারণ সভায় কাউন্সিলরদের অনুমতি সাপেক্ষে এই সংশোধন চূড়ান্ত রূপ নিতে পারবে। অনুমোদনের বেশ কিছু ধাপ এখনো বাকি থাকলেও প্রতিনিধিত্ব কমিয়ে আনার ‘নীলনকশা’ দেখে শুরুতেই প্রতিবাদমুখর হয়েছেন ক্লাব কর্তারা।