ঋণের টাকা ওড়ে ঢাকায়

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৫, ০৮:৫৩ এএম

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা। কোটি মানুষের বাস এ শহরে। প্রবাদ আছে ঢাকা শহরে টাকা ওড়ে। টাকা ধরার জন্য সারা দেশের মানুষ ঢাকা শহরে এসে ভিড় করেন; এ কথা সবার জন্য সত্য না হলেও কারও কারও জন্য সত্য বটে। বাস্তবেও সবচেয়ে বেশি ‘টাকার খেলা’ এ শহরেই হয়ে হয়ে থাকে; অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কারণে।

ঢাকা ছাড়াও টাকা চালাচালির বড় আরেকটি কেন্দ্র হচ্ছে চট্টগ্রাম, যা দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যকেন্দ্র। ব্যাংকের বিনিয়োগ ও আমানতের বড় অংশই ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। এ দুই বিভাগের দখলেই ব্যাংকগুলোর ৮৫ শতাংশেরও বেশি ঋণ বা বিনিয়োগ। দেশের বাকি অংশের ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ১৫ শতাংশেরও কম। শুধু ঋণের ক্ষেত্রেই নয়, আমানতেরও ৬০ শতাংশের বেশি ঢাকার মানুষের। তারপর চট্টগ্রামের মানুষের। অর্থনীতির সিংহভাগ এ দুই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হওয়ায় পিছিয়ে থাকছে দেশের অন্যান্য অঞ্চল। ফলে তৈরি হচ্ছে উন্নয়নবৈষম্য।

সারা দেশের বিভাগ, জেলা ও থানাপর্যায়ে ব্যাংগুলোর আমানত এবং বিনিয়োগ বা ঋণ বিতরণের পরিসংখ্যান প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে ব্যাংক খাতে মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা, জুনের শেষে আমানতের মোট স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। এ হিসাবে তিন মাসে ব্যাংক খাতে আমানত কমেছে ১৩ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা বা দশমিক ৭৩ শতাংশ; শহরে কমেছে দশমিক ৭৪ এবং গ্রামে কমেছে দশমিক ৭ শতাংশ। সেপ্টেম্বরের শেষে ব্যাংকগুলোয় মোট ঋণ বিতরণের স্থিতি ছিল ১৬ লাখ ১৯ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা আর জুন প্রান্তিকে ছিল ১৫ লাখ ৯৭ হাজার ১০১ কোটি টাকা। এ হিসাবে তিন মাসে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ২২ হাজার ৮১৬ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। বরাবরের মতো ঋণ বিতরণ গুরুত্ব পেয়েছে শহরাঞ্চলে। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয় ঋণ বিতরণে অনীহা বেড়েছে।

তথ্যানুযায়ী ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে ব্যাংক খাতে আমানতকারীদের জমাকৃত ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকার মধ্যে শুধু ঢাকা বিভাগেই আমানতের পরিমাণ ১১ লাখ ১৩ হাজার ৯৯ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের ৬০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এ আমানতের মধ্যে ঢাকা বিভাগের শহরকেন্দ্রিক আমানত ১০ লাখ ১৭ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা আর প্রান্তিক অঞ্চলের ৯৫ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। শুধু ঢাকা জেলায় আমানতের পরিমাণ ৯ লাখ ৪১ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা।

গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিতরণ করা ১৬ লাখ ১৯ হাজার ৯১৭ কোটি টাকার মধ্যে ঢাকা বিভাগে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১০ লাখ ৬৪ হাজার ৩১২ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৬৬ শতাংশ। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগের শহরাঞ্চলে বিতরণ হয়েছে ১০ লাখ ৬৪ হাজার ৩১২ কোটি আর প্রান্তিক অঞ্চলে বিতরণ করা হয়েছে ৩৮ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। শুধু ঢাকা জেলাতেই বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ ১০ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সবকিছুই ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। সব তৎপরতা এ দুই অঞ্চলকেন্দ্রিক হওয়ার কারণে উন্নয়নবৈষম্য তৈরি হচ্ছে। এটা ভারসাম্যহীন উন্নয়নের একটা প্রতিফলন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়ার কারণে অন্যান্য ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ছে। এ কারণে মানুষ ঢাকা ও চট্টগ্রামের দিকেই ছুটে। ঢাকায় অচলাবস্থা তৈরি হচ্ছে। অন্যান্য জায়গায়ও ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন হচ্ছে না। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বলছি, ছোট একটা দেশে এ দুই অঞ্চলের মধ্যে সব কাজ হওয়া কোনো যুক্তির মধ্যে পড়ে না। বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কর্মকান্ড যেন সারা দেশেই পরিচালিত হয়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা নিতে হবে।’

ঢাকার ব্যাংকের আমানতে মতিঝিল এগিয়ে থাকলেও সম্প্রতি মতিঝিল ও গুলশান এলাকার গ্রাহকরা কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন। মতিঝিলের চেয়ে গুলশানের গ্রাহকদের আমানত ২০ হাজার কোটি টাকা কম। ব্যাংকাররা বলছেন, এখন দেশের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও করপোরেট হাউজগুলোও গুলশানমুখী। এ ধারা অব্যাহত থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে আমানতের দিক থেকে মতিঝিলকে ছাড়িয়ে যাবে গুলশান। ঢাকায় আমানতের দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বনানী।

গত সেপ্টেম্বরের শেষে অভিজাত এ এলাকার ব্যাংক গ্রাহকদের আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট ব্যাংক আমানতের ২ দশমিক ৯ শতাংশ। বনানীর পর আমানতের শীর্ষে রাজধানীর আরেক অভিজাত এলাকা ধানমন্ডি এলাকা। গত সেপ্টেম্বরের শেষে এ এলাকার ব্যাংক গ্রাহকদের আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। ধানমন্ডির পর রয়েছেন পল্টন এলাকার গ্রাহকরা। গত সেপ্টেম্বরের শেষে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে পল্টনের গ্রাহকদের আমানতের পরিমাণ ছিল ৪২ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা, যা ব্যাংকের মোট আমানতের ২ দশমিক ৩ শতাংশ। পল্টনের পর রয়েছে তেজগাঁও এলাকার ব্যাংক গ্রাহকরা। গত সেপ্টেম্বরের শেষে এ এলাকার গ্রাহকদের আমানতের পরিমাণ ছিল ৪১ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা।

ঢাকার পর আমানতে ও ঋণ বিতরণে অবস্থান করছে চট্টগ্রাম। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে চট্টগ্রাম বিভাগে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের ২১ দশমিক ২৪ শতাংশ। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের শহরকেন্দ্রিক আমানত ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি আর প্রান্তিক পর্যায়ে রয়েছে ৯১ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। শুধু চট্টগ্রাম জেলাতেই আমানতের পরিমাণ ২ লাখ ৯ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। অন্যদিকে এ বিভাগে ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যা মোট ঋণের ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ। শুধু চট্টগ্রাম জেলাতেই বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৪৫ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা।

আমানত ও ঋণ বিতরণে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে খুলনা বিভাগ। সেখানে আমানতের পরিমাণ ৭৭ হাজার ১৯২ কোটি, ঋণ বিতরণের পরিমাণ ৬১ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা। পরের অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ। আমানতের পরিমাণ ৭৫ হাজার ২৭৬ কোটি, ঋণ বিতরণের পরিমাণ ৬৩ হাজার ৬০ কোটি টাকা।

এ ছাড়া সিলেট বিভাগে আমানতের পরিমাণ ৭১ হাজার ৬০ কোটি, ঋণ বিতরণের পরিমাণ ১৮ হাজার ১০২ কোটি টাকা, বরিশাল বিভাগে আমানতের পরিমাণ ৩৫ হাজার ৫৫৮ কোটি, ঋণ বিতরণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৩৭৫ কোটি, ময়মনসিংহ বিভাগে আমানতের পরিমাণ ২৯ হাজার ৭৯৫ কোটি, ঋণ বিতরণের পরিমাণ ২১ হাজার ৪ কোটি ও রংপুর বিভাগে আমানতের পরিমাণ ৩৫ হাজার ৬৪৮ কোটি ও ঋণ বিতরণের পরিমাণ ৩৮ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের জিডিপির বৃহদাংশই ঢাকায় হয় আর বড় একটা অংশ চট্টগ্রামে হয়। অর্থনৈতিক কর্মকান্ড এ দুই বিভাগেই বেশি। তবে সারা দেশের উন্নয়ন যাতে সুষম হয়, প্রান্তিকপর্যায়ে যাতে উদ্যোক্তা তৈরি হয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যাতে উদ্যোক্তা তৈরি হয়, ব্যাংকগুলোকে সেদিকে নজর দেওয়া উচিত। ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে অন্যান্য বিভাগের একটা পার্থক্য থাকবে। তবে এত বড় পার্থক্য যেন না হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের ঋণ বিতরণ প্রবাহ বাড়াতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত