‘ছোট’ মামলার বড় ভোগান্তি

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৫, ০৪:১৩ পিএম

২০০১ সালের ১১ নভেম্বর রাজধানীর দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর ‘কৃষ্ণা ফিলিং স্টেশন’-এর পক্ষে এর ব্যবস্থাপক মো. শাহজাহান এনআই অ্যাক্ট-এর (নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট) ১৩৮ ধারায় রফিকুল ইসলাম কিরণ নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে চেক প্রতারণার মামলা করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, বাদীপক্ষ আসামির কাছে দেড় লাখ (১০ হাজার টাকা পরিশোধিত) টাকা পান। ২০০৪ সালের ২৯ মার্চ ঢাকার একটি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত রায়ে আসামিকে ছয় মাসের কারাদন্ড- ও পাওনার তিনগুণ (৪ লাখ ২০ হাজার টাকা) অর্থদন্ড দেয়। 

পরে আসামি ঢাকা মহানগর বিশেষ জজ আদালতে আপিল করলে ২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর মহানগর বিশেষ জজ আদালত-২ তার রায়ে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের রায়টি সংশোধন করে বাদীকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং মামলার খরচ বাবদ ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু ২০১৭ সাল থেকে আসামি, বাদী ও আইনজীবী কারোর কোনো হদিস নেই। ফলে ২৩ বছরেও দেড় লাখ টাকা সংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি। এ ধরনের মামলায় সর্বোচ্চ সাজা এক বছরের কারাদ- অথবা চেকে লিখিত অর্থের তিনগুণ অর্থদ- বা উভয় দন্ড।

ঘটনার তারিখ ২০০৬ সালের ২৮ আগস্ট উল্লেখ করে রাজধানীর শ্যামপুর থানায় একটি মামলা করেন মো. খালেক নামের এক ব্যক্তি। পূর্ব জুরাইনের একটি পেট্রল পাম্পের ঠিকানা উল্লেখ করে বাদী তার ৭ লাখ টাকা মূল্যের রড আত্মসাতের ঘটনায় দন্ডবিধির ৪০৭ ও ১০৯ ধারায় মামলাটি করেন। এ ধারার অভিযোগে সাত বছর পর্যন্ত সাজার কথা বলা আছে দ-বিধিতে। ২০০৭ সালের ১৭ জানুযারি অভিযোগপত্র দাখিলের পর সাক্ষ্যগ্রহণের নির্দেশ দেয় সংশ্লিষ্ট আদালত। তবে, সাক্ষ্য শুরুর আগেই আসামিপক্ষ অভিযোগ গঠনের বিরুদ্ধে মহানগর দায়রা আদালতে আবেদন করলে ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর আদালত এক আদেশে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অভিযোগ গঠনের আদেশ বহাল রাখে। তবে, মহানগর আদালত থেকে অধস্তন আদালতে নথি যায় ২০২০ সালের ১১ অক্টোবর। সংশ্লিষ্টরা জানান, নানা কারণে ১৮ বছরেও এ মামলার বিচারে কোনো সাক্ষীকে হাজির করানো যায়নি। মামলার তিন আসামি আদালতে হাজির হননি। বাদীও মামলার খোঁজ নেননি।

উল্লিখিত দুটি মামলা বিচারাধীন লাখ লাখ অনিষ্পন্ন মামলা এবং বিচারকাক্সক্ষীদের ভোগান্তি ও হয়রানির উদাহরণ মাত্র। আইনজীবীরা বলেন, খুন, ধর্ষণ, অস্ত্র, মাদক, এসিড সন্ত্রাস, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধের বিচারে যেমন দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে তেমনি চুরি, ছিনতাই, মারামারি, প্রতারণা, অপরাধজনক বিশ^াসভঙ্গ, হুমকির মতো লঘু অপরাধের মামলাতেও তা রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলেন, বিচারকের অপ্রতুলতা, অভিযোগপত্র দিতে বিলম্ব, অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের বিরুদ্ধে আপিল, বিগত ১৫ বছরে রাজনৈতিক মামলায় আদালতগুলোকে ব্যস্ত রাখা, সাক্ষীর গড়হাজিরা, সাক্ষী সুরক্ষা আইন না থাকা, ঘন ঘন শুনানি মুলতবি, সাক্ষীর উদ্দেশে সমন কার্যকর না হওয়া প্রভৃতি কারণে অপেক্ষাকৃত লঘু অপরাধের মামলাতেও ভোগান্তি বাড়ছে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুরো সিস্টেমটাই ব্লক হয়ে আছে। সাধারণ মানুষের মামলা ট্র্যাকেই উঠতে পারে না। মামলা কবে শেষ হবে তা অনিশ্চিত। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কোনো চেষ্টা চোখে পড়ে না।’

সুপ্রিম কোর্ট থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ ও অধস্তন আদালতে দেওয়ানি, ফৌজদারি ও অন্যান্য বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫১০।  অধস্তন আদালতে ৩৮ লাখ ৩৭ হাজার ৩২৯ মামলার মধ্যে দেওয়ানি ১৬ লাখ ৫ হাজার ৮০২ এবং ফৌজদারি ২২ লাখ ৩১ হাজার ৫২৭ মামলা বিচারাধীন। সংশ্লিষ্টদের ধারণা অধস্তন আদালতে বিচারাধীন ৩৮ লাখ মামলার বড় অংশই লঘু অপরাধের।

সাক্ষী হাজিরের হার নগণ্য:  

অপেক্ষাকৃত লঘু অপরাধের ফৌজদারি মামলার বিচার হয় ঢাকার এমন চারটি আদালতে গত বছরের ১ আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সাক্ষী হাজিরার নথি পর্যালোচনা করেছে দেশ রূপান্তর। তাতে সাক্ষী হাজিরার নগণ্য হার ও গড়হাজিরার করুণ চিত্রই দেখা গেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-৮ আদালত থেকে পাঁচ মাসে ৫০০ সাক্ষীকে সমন পাঠানো হয়। হাজির হয়েছেন মাত্র ৩৫ জন। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-১৩ আদালত থেকে পাঁচ মাসে ৫৩৫ জনকে সমন পাঠানো হলেও হাজির হয়েছেন মাত্র ৪৮ জন। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-৩২ আদালত থেকে ৫৪৮ জনকে সমন পাঠানো হলেও হাজির হয়েছেন ৬০ জন। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-১৬ আদালত থেকে ৫২৩ জনকে সমন পাঠানো হয়। হাজির হয়েছেন ৫১ জন। সাক্ষী হাজিরের হার ১০ শতাংশের কিছু বেশি।

ঢাকার আদালতে নিয়মিত শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত কুমার কর্মকার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, মামলা করা হয় হয়রানির উদ্দেশ্যে। একটা পর্যায়ে উভয়পক্ষই ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হয়। ফলে সময় যত গড়াতে থাকে মামলায় উৎসাহ তত কমতে থাকে।’ তিনি বলেন, ‘সরকারি সাক্ষীদের হাজির করা গেলেও ভাসমান সাক্ষী অর্থাৎ যাদের ঠিকানা পরিবর্তন হয় তাদের বছরের পর বছর খোঁজ মেলে না।’ 

ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিচারের দীর্ঘসূত্রতা একটি বড় কারণ হলো গত ১৫ বছরে আদালতগুলোকে ব্যস্ত রাখা হয়েছে রাজনৈতিক মামলার সমন আর শুনানিতে। এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে। তবে, রাজনৈতিক মামলাগুলো এখন শেষ হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মামলাগুলো এখন দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘সাক্ষীদের সুরক্ষা এবং তাদের খরচ না দিলে তো সংগত কারণেই তারা আদালতে আসবে না। সাক্ষী সুরক্ষা আইন খুব জরুরি। আর এমন ব্যক্তিদের সাক্ষী করতে হবে যাদের সমন দিলেই পাওয়া যাবে।’    

ভরসা হতে পারছে না এডিআর :  

দেশে গুরুতর অপরাধের বিচারের জন্য কঠোর আইন রয়েছে। অপেক্ষাকৃত লঘু অপরাধের মামলায় মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসার সুযোগ রয়েছে। ২৪ বছর আগে ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’ প্রণয়ন করে সরকার। গরিব, অসচ্ছল বিচারকাক্সক্ষীদের আইনি অধিকার নিশ্চিত করাই ছিল এ আইনের উদ্দেশ্য। অন্যদিকে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল মামলার জট ও বিরোধ কমিয়ে আনা। তবে, নিখরচার এ পদ্ধতি সফল হচ্ছে না। কার্যবিধি আইনের ৩৪৫ ধারা অনুযায়ী, ৫০টির বেশি লঘু অপরাধের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা বা এডিআরের মাধ্যমে আপস-মীমাংসার বিধান রয়েছে। দেওয়ানি আইনের ৮৯ (ক) ধারায় মধ্যস্থতা, ৮৯ (খ) ধারায় সালিশি ও ৮৯ (গ) ধারায় আপিলে মধ্যস্থতার বিধান রয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে বিরুদ্ধ পক্ষগুলোর আগ্রহ কম।

জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১৬ বছরে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৭৯টি বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। নিষ্পত্তি হয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৪২৭টি বিরোধ। ১৬ বছরে বিরোধ নিষ্পত্তির এ পরিসংখ্যানকে নগণ্য বলে মনে করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। এর জন্য পক্ষগুলোর মধ্যে ছাড় না দেওয়ার মানসিকতা, আদালতকে নির্ভরযোগ্য মনে করা এবং মামলার প্রবণতা দায়ী বলে মনে করেন তারা। এ প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘সমস্যা পক্ষদের মানসিকতায়। মীমাংসা একটি চেতনাগত ব্যাপার। দুপক্ষের ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে এটি তৈরি হয়। কিন্তু দেখা গেছে কেউ ছাড় দিতে চায় না। ফলে বিরোধ গড়ায় মামলাতে। এক কাঠা জায়গার মামলা চলে বছরের পর বছর। একটা পর্যায়ে জমির দামের চেয়ে বেশি টাকা খরচ হয় মামলাতেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত