শীতকালে আবহাওয়া ঠান্ডা থাকে, কুয়াশাও থাকে। তারপরও আগুন লাগার ঘটনা বেশি ঘটে এই শীতেই। ফায়ার সার্ভিস এবং বিশেষজ্ঞরা বলছে, শীতের ঠান্ডাবা কুয়াশা আগুন ঠেকাতে বিশেষ ভূমিকা রাখে না। উল্টো শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়ায়। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, দেশে গড়ে প্রতি মাসে দুই হাজারের বেশি অগ্নিকান্ড ঘটে। তবে বছরের ডিসেম্বর থেকে মার্চ, চার মাসে অগ্নিকান্ড বেড়ে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শীতে বাতাসে জলকণা কম থাকে। এ কারণে ফায়ার জেনারেটিং ফিল্ড তৈরি হয়। ভবন রক্ষণাবেক্ষণে সিটি করপোরেশন, রাজউক এবং ফায়ার সার্ভিসের মনিটরিংয়ের কথা থাকলেও এতে সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। আবার আগুন লাগার অন্যতম কারণ হিসেবে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের প্রসঙ্গ উঠে আসে অনেক সময়। এ ব্যাপারে জনগণকে সচেতন করার উদ্যোগও চোখে পড়ে না। বিশেষ করে শীতে অনেকে রুম হিটার চালান। ওভেনও বেশি চালানো হয়। এ সময় মাল্টিপ্লাগের কাজ শেষ হওয়ার পর সুইচ অফ করেন না অনেকে। এতে সামান্য অসাবধানতাতেই শুরু হতে পারে অগ্নিকান্ড। আর ইমারত বিধিমালা অগ্রাহ্য করে অনেকে একটি ভবনের গা ঘেঁষে নতুন ভবন বানাচ্ছে। খরচ বাঁচাতে ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের ওয়্যারিং ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম। আগুন যখন লাগে তখন এসব সরঞ্জাম ও গা ঘেঁষে ভবন থাকার কারণে দ্রুত ছড়ায়। সরকারের নজরদারিরও ঘাটতি আছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর হাজারীবাগ বাজারের ফিনিক্স লেদারের গোডাউনে অগ্নিকা-ে ভবনের পাঁচ, ছয় ও সাততলা পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিস বলছে, ধারণা করা হচ্ছে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে ইলেকট্রিক শর্ট সার্কিট কিংবা সিগারেটের আগুন থেকে। পাশাপাশি ভবন ও গিঞ্জি এলাকা এবং দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। এ ছাড়া ভবনটিতে ছিল না কোনো সেফটি প্ল্যান। তবে এ অগ্নিকান্ডে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
গত ২৫ ডিসেম্বর জনপ্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে ভয়াবহ অগ্নিকা- ঘটেছে। আগুনে ৭ নম্বর ভবনের চারটি ফ্লোরে একাধিক মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের বহু গুরুত্বপূর্ণ নথি ও আসবাব পুড়ে গেছে। শুরু থেকে আগুনের নেপথ্যে ‘নাশকতা’ সন্দেহ করা হলেও ‘দুর্বল বিদ্যুৎ সংযোগ’র কথা বলা হয়েছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে। শুধু হাজারীবাগ বা সচিবালয় নয়, ডিসেম্বরে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে নিট এশিয়া লিমিটেড কারখানার গুদামে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটেছে। একই মাসে শ্রীপুরে বোতাম তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে পুড়ে মারা যায় তিনজন। থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন করতে গিয়ে আতশবাজি ও ফানুস থেকে আগুন লেগে শিশুসহ পাঁচজন দগ্ধ এবং মিরপুরে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে একই পরিবারে পাঁচজন মারা যায়। এমন একটি বা দুটি নয়, শীত শুরুর পর রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ভয়াবহভাবে বেড়েছে অগ্নিদুর্ঘটনা।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য বলছে, গত বছর (২০২৪ সালে) জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে সারা দেশে অগ্নিকান্ডঘটেছে ২৪ হাজার ৪৭৮টি। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে দুই হাজারের বেশি আগুন লেগেছে। মাসভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ৩৭২টি। ফেব্রুয়ারিতে ৩ হাজার, মার্চে ৩ হাজার ৫১৯, এপ্রিলে ৩ হাজার ৪২৭, মে’তে ৩ হাজার ৬১১, জুনে ১ হাজার ৯৪৭, জুলাইয়ে ১ হাজার ৩৭৬, আগস্টে ১ হাজার ৮৯৭, সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ২৯১, অক্টোবরে ১ হাজার ১৮৯ ও নভেম্বরে ১ হাজার ৩৮৯টি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে।
সাধারণত ডিসেম্বর থেকে মার্চ এ চার মাসে অগ্নিদুর্ঘটনা বেশি ঘটে। গত বছর ডিসেম্বর ও চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের প্রকৃত হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে এ দেড় মাসের অগ্নিকা-ের হিসাব যোগ হলে এ সংখ্যা আরও বাড়বে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে সারা দেশে মোট অগ্নিকান্ড ঘটেছিল ২৭ হাজার ৬২৪টি। ২০২২ সালে ২৪ হাজার ১০২টি। ২০২১ সালে ২১ হাজার ৬০১টি। ২০২০ সালে ২১ হাজার ৭৩টি। ২০১৯ সালে ২৪ হাজার ৭৪টি ও ২০১৮ সালে ছিল ১৯ হাজার ৬৪২টি।
শীতে বেশি অগ্নিকান্ড হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (মিডিয়া) শাহজাহান শিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণত ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত চার মাসে বেশি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে। এর কারণ শীতকালে সব ধরনের দাহ্য বস্তু শুকিয়ে যায়। এ প্রাকৃতিক শুষ্কতা আগুন লাগার পরিবেশ তৈরি করে। এ ছাড়া শীতের সময়ে চুলা জ্বালিয়ে রাখা, লাকড়ি জ্বালিয়ে আগুন পোহানো, বেশি ধূমপান করাসহ নানা কারণে আগুন বেশি লাগে। ফলে শীতসহ অন্তত চার মাস অধিক সতর্ক ও সাবধান থাকলে আগুনের ঘটনা অর্ধেকের বেশি কমে যাবে। শীতের আগে আগে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে দেশের সব মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের কাছে সতর্কতামূলক বার্তা পাঠানো হয়ে থাকে।’
