আমাদের অর্থনীতি বর্তমানে খুব একটা ভালো অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না। দেশের অর্থনীতি, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দরকার নির্বাচিত সরকার। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তারিক আবেদীন ইমন
দেশ রূপান্তর : পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা কেমন আছেন?
আবদুল আউয়াল মিন্টু : আগে যে রকম ছিল, কথা বলতেই খুন, গুম, অ্যারেস্ট করা হতো। এগুলো তো এখন নেই। সেদিক থেকে যেকোনো লোকেরই সেফটি সিকিউরিটি এখন ভালো। এই একটা দিক। তবে যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করেন, আমার মনে হয় না তারা খুব ভালো আছেন। এখানে বিভিন্ন সমস্যা আছে। একটা হলোÑ যারা আমদানি করে, এখানে এক্সচেঞ্জ রেট অলরেডি বেড়ে গেছে। যারা কাঁচামাল আমদানি করে, যারা উৎপাদন করে, তাদেরও দাম বেড়ে গেছে। তারপর যারা সাধারণ কাজকর্ম করে খান, উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে তাদের ওপর একটা প্রেশার পড়ছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাচ্ছে। আবার অনেকগুলা নতুন পণ্যে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। আবার বলছে এনার্জি কস্ট বাড়াবে। তাহলে তো পণ্য উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাবে। বর্তমানে একেকজনের একেক ধরনের সমস্যা।
দেশ রূপান্তর : বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
আবদুল আউয়াল মিন্টু : বর্তমানে অর্থনৈতিক অবস্থা দুভাবে ভাগ করা যায়। একটা হলো আর্থিক খাত, আরেকটি অর্থনৈতিক। আর্থিক খাতের অবস্থা আমি খুব ভালো বলব না এজন্য যে, অনেক ব্যাংক আছে, যারা বিভিন্ন সমস্যায় আছে। বিগত সরকারের সময়ের অনিয়ম এবং দুর্নীতির মাধ্যমে লেনদেন ও লোন দেওয়ার ফলে অনেক ব্যাংকই সমস্যায় আছে। ব্যাংকগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সাহায্য করছে। এতে আমি আশা করি, হয়তো আর্থিক খাত ভালোর দিকে যাবে চলতি বছরের শেষের দিকে। তবে বড় সমস্যা, সেটা হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এটি কমানোর একটা হাতিয়ার, যেটা আমরা বলি সংকুচিত মুদ্রানীতি। যখনই আপনি সংকুচিত মুদ্রানীতি ফলো করবেন, তখন দু-তিনটা জিনিস হয়, একটা হলো ইন্টারেস্ট বেড়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, ক্রেডিট সংকুচিত করবে। এ দুটির ফলে বিনিয়োগ স্বাভাবিকভাবে কমে যায়, কারণ বিনিয়োগ করলে যে ইন্টারেস্ট রেট হাই হয়, এতে একধরনের সমস্যা তৈরি হয়। আরেকটা হলো সংকুচিত মুদ্রানীতি ফলো। এমনিতেই ক্রেডিট কম পাবে। এজন্য বিনিয়োগ কমে যায়। বিনিয়োগ কমে গেলে কর্মসংস্থানের একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ বিনিয়োগের সঙ্গে আবার কর্মসংস্থার জড়িত। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমি বলতে পারি, অর্থনৈতিক দৈনন্দিন অবস্থা যদি ধরি তাহলে আর্থিক খাতের অবস্থা বেশি ভালো না।
আরেকটা বিষয় হলো, আমাদের জিডিপি দিন দিন কমে যাচ্ছে। যেখানে আগে বলা হচ্ছিল ৫ থেকে ৭ শতাংশ জিডিপির গ্রোথ, এটা এখন গত কোয়াটারে ২ শতাংশের নিচে নেমেছে। এটা যদি ভালো না হয়, প্রবৃদ্ধি যদি না হয়, তবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে না। কারণ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটা সম্পর্ক আছে। অর্থাৎ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। প্রবৃদ্ধি কম মানে হলো বিনিয়োগ কমে যাবে। কর্মসংস্থান কমে যাবে। সংকুচিত মুদ্রানীতির ফলে মূল্যস্ফীতি কতটুকু কমবে, তা এখনো বলা যাচ্ছে না। চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে আমি মনে করি, বাংলাদেশসহ যেসব দেশ উৎপাদন ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যধিক কাঁচামালনির্ভর তাদের দেশে সংকুচিত কতটুকু কাজ করবে, এটা একটু চিন্তার বিষয়। সংকুচিত মুদ্রানীতির ফলে সুদহার বেড়ে গেছে। তাহলে বাংলাদেশে এমন কোনো খাদ্য নেই, যেটা আমরা আমদানি করি না। শুধু আমি দেখছি, আমরা লবণ আর শাকসবজি আমদানি করি না। এখন এ মাসে একটু শাকসবজির দাম কমাতে মূল্যস্ফীতি একটু কম মনে হচ্ছে, কিন্তু এটা তো সাময়িক। শুধু জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখ পর্যন্ত। এরপর শাকসবজির সরবরাহ কমে যাবে। তখন দামও বেড়ে যাবে। সেজন্য আমি বলছি, সংকুচিত মুদ্রানীতি সব দেশের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য না। কিন্তু এটা একটা হাতিয়ার।
দেশ রূপান্তর : মূল্যস্ফীতি বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে অসাধু সিন্ডিকেট চক্রকে দায়ী করা হয়, সিন্ডিকেট কারা করছে?
আবদুল আউয়াল মিন্টু : সিন্ডিকেট তো আমি জানি যারা সরকারের মন্ত্রী থাকেন, যারা আমলা আছেন আর কিছু দুর্বৃত্তায়িত ব্যবসায়ী করে থাকেন। যারা ব্যবসার নাম করে একধরনের চুরি-দুর্নীতি করেন। এ ছাড়া তো আমি কোনো সিন্ডিকেট দেখি না। আরেকটা সিন্ডিকেট বাংলাদেশে হতে পারে। বাংলাদেশে কিছু কিছু পণ্য আছে, যেগুলো গুটিকয়েক ব্যবসায়ী আমদানি করেন। যেমন ভোজ্য তেল ও চিনি। এটা সবাই কিন্তু চাইলেও আমদানি করতে পারবেন না। কারণ ভোজ্য তেল আমদানি করতে গেলে এক জাহাজ যদি তেল আনেন, যদি পাঁচ হাজার টনও হয়, তাহলে হয়তো ১০০ কোটি টাকা এলসি করতে হবে। এখন ১০০ কোটি টাকা তো সবাইকে ব্যাংক দেবে না। এজন্য কিছু বড় ব্যবসায়ী কয়েকটা পণ্য যেমন ভোজ্য তেল, চিনি, গম, ভুট্টা ইত্যাদি আমদানি করে থাকেন। এ জায়গায় কতটুকু সিন্ডিকেট কাজ করে, তা আমার জানা নেই। কিন্তু খবরের কাগজে যেগুলো আসে, ম্যাজিস্ট্রেট গিয়ে দোকানে হানা দিচ্ছেন, এতে আরও পণ্যের সরবরাহ ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতি বাড়ায়। সুতরাং সিন্ডিকেট বলে আমি কিছু বিশ্বাস করি না। আমাদের প্রতিবেশী দেশ থেকে চাল ও গম আসে। সেখানে তো এত বড় জাহাজ লাগে না। ট্রাকে করে আসে।
দেশ রূপান্তর : মূল্যস্ফীতির আরেকটি কারণ হিসেবে চাঁদাবাজিকে দায়ী করা হয়। চাঁদাবাজির একটা বড় অভিযোগ আপনার দলের কিছু অসাধু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে, এটাকে কীভাবে দেখছেন?
আবদুল আউয়াল মিন্টু : এটাকে আমি দুভাবে দেখি। চাঁদাবাজি জিনিসটা তো খারাপ। একটা দেশে যদি রাজনৈতিক দলের কর্মীরা চাঁদাবাজি করেন, তাহলে সে দেশের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে, সেটা আপনি-আমি সবাই বুঝি। আমাদের দলের লোকরা যে চাঁদাবাজি করেননি বা করছেন না, তা আমি বলব না। তবে দল থেকে প্রায় হাজারের ওপর নেতাকর্মী বহিষ্কার করা হয়েছে। একটা রাজনৈতিক দল এর থেকে বেশি কী করতে পারে। কেউ যদি চাঁদাবাজিতে জড়ান আর সরকার যদি এটা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তাহলে সরকার থেকে লাভ কী? সরকারের উচিত যারা চাঁদাবাজি করছেন, যারা দুষ্কৃতকারী, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা।
দেশ রূপান্তর : আপনি একটা ব্যাংকের দায়িত্বে আছেন, যা বর্তমানে দুর্বল অবস্থায় আছে। এই ব্যাংক কবে নাগাদ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?
আবদুল আউয়াল মিন্টু : আমি যে ব্যাংকের দায়িত্বে আছি, ন্যাশনাল ব্যাংক। এই ব্যাংকের সমস্যাটা একটু বেশি। অন্য ব্যাংকে অনিয়ম-দুর্নীতি যেটা হয়েছে, সাধারণত ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে। ন্যাশনাল ব্যাংকে ঋণ দেওয়া, ঋণ মাফ করা, সুদ মাফ করা, কেনাকাটা, এমনকি ম্যানেজমেন্টেও কোনো জেলার বেশি আবার কোনো জেলার কম অর্থাৎ মেরিট বেইজ হয়নি। এ কারণে ন্যাশনাল ব্যাংকের সমস্যাটা বহুমাত্রিক। তবে নতুন বোর্ড আসার পর চেষ্টা করছি, প্রথমত অনিয়মগুলো যেন আর না হয়। আর পুরনো অনিয়মের জন্য যা যা ক্ষতি হচ্ছে, সেটা আমরা ঠিক করার চেষ্টা করছি। হয়তো আরেকটু সময় লাগবে। চার থেকে ছয় মাস পর হয়তো ইমপ্রুভমেন্টটা ভালো দেখতে পারবেন। বিগত সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় যত অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে, সেগুলো যে বাংলাদেশ ব্যাংক জানত না বা সহযোগী ভূমিকা পালন করেনি, এটা বলা যাবে না। যদি ন্যাশনাল ব্যাংকের কথা বলি, অনেক বড় সুদ মাফ করে দেওয়া অথবা লোনকে দীর্ঘস্থায়ী করে রি-পেমেন্ট ঠিক করা এগুলো কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের ইমপ্রুভ করা। সেজন্য আমি মনে করি, বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও কঠোর হওয়া উচিত ছিল। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক আবার অতিমাত্রায় কঠোর।
দেশ রূপান্তর : দেশ এখন স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছে, তারেক রহমান এখনো দেশে ফিরছেন না কেন?
আবদুল আউয়াল মিন্টু : তারেক রহমানের দেশে ফেরার ব্যাপারে কয়েকটা ইস্যু আছে। আমার অভিমত, প্রথম যেটা বিষয়, তার সেফটি সিকিউরিটি দরকার। বাংলাদেশে বর্তমানে যে রং অর্ডার পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলার যে বর্তমান অবস্থা, এগুলো কিন্তু যা হওয়া দরকার, তা হয়নি। দ্বিতীয়ত, তার মাথার ওপর অনেক মিথ্যা মামলা রয়েছে। তিনি বলেছেন, আমার সব মামলার ফয়সালা হওয়ার পর আসব। আমার কোনো নেতাকর্মীকে জেলে রেখে বা মামলা মাথায় রেখে, আমি বাংলাদেশে ঘুরে বেড়াব, তা হবে না। এটা একটা ইস্যু। আরেকটা ইস্যু হলো ওনার মা, আমাদের দলের নেত্রী তিন -তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, ওনার তো কোনো মেয়ে নেই। ওনার বর্তমানে এক ছেলে। ওনাকে ফেলে তো তিনি আসতে পারেন না। আমি মনে করি, তার দায়িত্ব মায়ের যতদিন চিকিৎসা লাগে, সেটার বন্দোবস্ত করা এবং পাশে থাকা। মায়ের চিকিৎসা শেষে ওনার সঙ্গেও আসতে পারেন বা পরেও তিনি আসতে পারেন। আর একটা লোক ১৭ বছর দেশের বাইরে। এত দিন দেশের বাইরে থাকা একটা মানুষ যে ৭০ দিনে দেশে চলে আসবেন, এটা স্বাভাবিক না। তিনি তো এখন প্রযুক্তির সহযোগিতায় প্রতিদিন বিভিন্ন মিটিং করছেন। তিনি একদিকে মায়ের চিকিৎসায় ব্যস্ত, অন্যদিকে ভার্চুয়ালি জেলাপর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
দেশ রূপান্তর : জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কী ভাবছেন?
আবদুল আউয়াল মিন্টু : আমরা ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশে একটা গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছি। আমাদের লাখ লাখ নেতাকর্মীর নামে হাজার হাজার মামলা। অত্যাচার-নির্যাতন, লাঞ্ছনা-বঞ্চনা, জেল-জুলুম সহ্য করা হয়েছে। এখন দেশের ভবিষ্যৎ ভালো হওয়া উচিত। দেশের যদি ভালো করতে চাই, তাহলে দেশে একটা নির্বাচিত সরকার দরকার। যে সরকার নির্বাচিত হবে, অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। যাকে আমরা গণতান্ত্রিক সরকার বলতে পারি। যার একটা জবাবদিহি থাকবে জনগণের কাছে। দেশের ভবিষ্যৎ যদি উজ্জ্বল হয়, তবে দেশের ভবিষ্যৎ এমনিতেই উজ্জ্বল হবে। আর পার্টি হিসেবে একটা অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে, সেই নির্বাচনে যেই পার্টিই সরকার গঠন করুক, এটা যদি আমার পার্টি সরকার গঠন করতে না পরে, কোনো দুঃখ থাকবে না। কিন্তু আমি চাই, দেশে নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকার। আমরা চেষ্টা করব, একটা উদার রাজনৈতিক দল হিসেবে সরকার গঠন করব। সেটা আমাদের লক্ষ্যে আছে, থাকবে। এজন্য চাচ্ছি তাড়াতাড়ি দেশে একটা অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন যদি হয়, তবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে। ক্ষমতায় যাওয়া আমাদের মূল লক্ষ্য না, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই হলো আমাদের মূল লক্ষ্য।
