জাতীয় নির্বাচনের আগে ছাত্র সংসদ নির্বাচন

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৫, ০২:২৩ এএম

গত ৩০ বছরে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি (শাকসু ও ডাকসুর একটি নির্বাচন ছাড়া)। ফলে ছাত্রছাত্রীরা কোনো ছাত্র সংসদে প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পায়নি। প্রত্যেকটি ক্যাম্পাসে পেশিশক্তির জোরে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের আধিপত্য দেখা গেছে। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকে এ দাবিতে আন্দোলন করছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি জোরালো হয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে।

ইতিমধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে প্রশাসন। ডাকসু নির্বাচন নিয়েও ঢাবি প্রশাসনের উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের নীতিমালার খসড়া অনুমোদন হয়েছে। অন্যান্য ক্যাম্পাসেও এ নিয়ে তোড়জোড় দেখা গেছে। ছাত্র সংগঠনগুলোও সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে বলেও জানা গেছে।

২৮ বছর অচল থাকার পর ২০১৯ সালের মার্চে নির্বাচনের মাধ্যমে সচল হয় ডাকসু। ওই কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ২০২০ সালের মার্চে। এরপর করোনা মহামারী ও প্রশাসনের অনীহার কারণে চার বছর ধরে বন্ধ ডাকসুর দুয়ার। বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীরা দাবি জানালেও কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দাবি উঠেছিল ছাত্র সংসদ নির্বাচনের। গত পাঁচ মাসে শিক্ষার্থী এবং ছাত্র সংগঠনগুলো একাধিকবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এ দাবি জানিয়েছে। দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ফেব্রুয়ারির মধ্যে ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে গঠনতন্ত্র সংস্কার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে পরামর্শদান, নির্বাচনের আচরণবিধি প্রণয়ন/সংশোধন এবং ডাকসু ও হল সংসদের গঠনতন্ত্র সংশোধন/পরিমার্জন করার বিষয়ে পৃথক তিনটি কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কমিটিগুলো ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধি প্রণয়ন/সংশোধনের জন্য প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি তাদের প্রথম সভা শেষ করেছে। এ ছাড়া ডাকসু ও হল সংসদের গঠনতন্ত্র সংশোধন/পরিমার্জন করার বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকরামুল হককে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন এবং সব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে সংশোধন প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে এবং বেশ কিছু প্রস্তাব পাওয়া গেছে।

ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দিকে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে গেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। গত ৩০ ডিসেম্বর ছাত্র সংসদ নির্বাচন তথা জাকসুর রোডম্যাপ দিয়ে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। নির্বাচন আয়োজনে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট নির্বাচন কমিশনও গঠন করা হয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে খসড়া ভোটার তালিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে। জাকসু নির্বাচনের ব্যাপারে পরামর্শ নিতে সোমবার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন উপাচার্য। জাকসু নির্বাচনের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় যদি চায়, তাহলে তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজন করতে পারে।’

গত ৩০ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এবিএম আজিজুর রহমানের সই করা এক অফিস আদেশে বলা হয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) গঠনতন্ত্রের ৮(৬) ধারা অনুযায়ী ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামানকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং তার সভাপতিত্বে জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ মাফরুহী সাত্তার, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. খো. লুৎফুল এলাহী, বেগম সুফিয়া কামাল হলের প্রভোস্ট ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধাকে সদস্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম রাশিদুল আলমকে সদস্য সচিব করে নির্বাচন কমিশন নিয়োগ করা হলো। রোডম্যাপ অনুযায়ী ২৫ জানুয়ারি নির্বাচনী আচরণ বিধি প্রণয়ন এবং ১ ফেব্রুয়ারি তফসিল ঘোষণা করা হবে।

এদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নীতিমালার চূড়ান্ত খসড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৯তম সিন্ডিকেটে অনুমোদিত হয়েছে। অনুমোদিত নীতিমালা মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রপতির আদেশ পাওয়ামাত্রই জকসু নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন সিন্ডিকেটের সভাপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম।

ড. মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটাই আমার প্রথম সিন্ডিকেট ছিল। আলহামদুলিল্লাহ খুব সফলভাবে সব এজেন্ডা কার্যকর করতে সক্ষম হয়েছি। গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডার মধ্যে একটি ছিল জকসুর নীতিমালা প্রণয়ন। যেহেতু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন-২০০৫-এ ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে কোনো ধারা বা বিধি নেই, তাই অনুমোদিত নীতিমালাটি এখন আমাদের আইন উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয় হয়ে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে অধ্যাদেশ জারি হলে এটি আইন হিসেবে গৃহীত হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি শিগগির রাষ্ট্রপতি জকসু নীতিমালা অধ্যাদেশ আকারে জারি করবেন। এটা আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা জকসু নির্বাচনের একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করতে পারব ইনশাআল্লাহ।’

১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রথম চাকসু নির্বাচন হয় ১৯৭০ সালে। প্রতি শিক্ষাবর্ষে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। এখন পর্যন্ত মাত্র ছয়বার নির্বাচনের আয়োজন করতে পেরেছে কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ নির্বাচন হয় ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর ছাত্র সংগঠনগুলোর মুখোমুখি অবস্থান, কয়েক দফা সংঘর্ষ ও উপযুক্ত পরিবেশ না পাওয়ায় আর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।

গত তিন মাসে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার বিষয়ে নানা দাবিদাওয়া চিঠি আকারে কর্তৃপক্ষের কাছে দিয়েছে। প্রায় সব ছাত্র সংগঠনই চাকসু নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের সভায় চাকসু নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়। নির্বাচনের বিষয়ে সিন্ডিকেটের সদস্যরা ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসার মত দেন। এর আগে গত ১০ ডিসেম্বর ছয় সদস্যের চাকসু নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি গঠন করে কর্তৃপক্ষ। নির্বাচন কখন, কীভাবে হবে; শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে একটি রূপরেখা তৈরি করবে এ কমিটি। ২৬ জানুয়ারি কমিটির প্রতিবেদন দেওয়ার কথা রয়েছে।

চাকসু নির্বাচনসহ ৯ দফা দাবিতে কর্মসূচি পালন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার আন্দোলনের’ ব্যানারে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা এ কর্মসূচি পালন করে। শিক্ষার্থীরা জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে বিগত প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক চর্চার সুযোগ নিয়ে নানা অপকর্মে জড়িয়েছে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলো। এখন দ্রুত নির্বাচনের আয়োজন করে ক্যাম্পাসে সুষ্ঠু রাজনৈতিক চর্চা ফিরিয়ে আনা জরুরি।

ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি নিয়ে একটি প্রজন্মের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি হয়েছিল। আমরা একমত হয়েছি, জানুয়ারি অথবা ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ডাকসুসহ সারা দেশে ছাত্র সংসদ শুরু হয়ে যাক। কারণ মার্চে রোজা।’

তিনি বলেন, ‘এর আগে ডাকসু দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল, এরপর ২০১৮ সালে একটি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হয়েছে। সেই চর্চা থেকে বেরিয়ে এসে জাতীয় নির্বাচনের আগে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে কিংবা ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে একমত হয়েছে সব ছাত্র সংগঠন।’

ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, ‘আমরা ডাকসুর পক্ষে। কোনো দলীয় সংগঠন ডাকসুর বিকল্প হতে পারে না। আমরা ২০১০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ক্যাম্পাসে কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারিনি। সুতরাং ডাকসুর আগে আমাদের একটা যৌক্তিক সময় পর্যন্ত ক্যাম্পাসে স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। ন্যাচারাল জাস্টিস অনুসারেও এ সুযোগ পাওয়া দরকার।’

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না বলে মন্তব্য করেছেন গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি ও সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের নির্বাচন হয়, শিক্ষকদের নির্বাচন হয় প্রতি বছর; তাহলে ছাত্রদের নির্বাচন কেন হবে না? ছাত্র সংসদ নির্বাচন কেন হবে না? রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্ব তৈরিতে ছাত্র সংসদের বিকল্প নেই।’

এর আগে এক অনুষ্ঠানে জাতীয় নির্বাচন বা অন্য কোনো নির্বাচনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হবে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ছাত্রদের তাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া আমাদের সর্বপ্রথম কর্তব্য। আমি মনে করি, অন্তর্বর্তী সরকার সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজন করবে, জাতীয় বা অন্য যেকোনো নির্বাচনের আগে।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার বলেন, ‘চাকসু নির্বাচন নিয়মিত হলে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবিদাওয়াও উঠে আসবে।’ তিনি নির্বাচনী রূপরেখা তৈরির জন্য কমিটি গঠন করেছেন। কমিটি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে।

ডাকসু নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনের বিষয়ে আমরা প্রস্তুতি শুরু করেছি। আমরা কয়েকটি কমিটি গঠন করে দিয়েছি। ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে প্রস্তাব পাওয়া গেছে। সবমিলিয়ে আমরা নির্বাচনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব। আশা করি দ্রুত রোডম্যাপ ঘোষণা করতে পারব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত