পাতা জালে ‘সরষের ভূত’ ধরা

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৫, ০২:৩৪ এএম

চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গোয়েন্দারা যতই জাল পাতুক না কেন, তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বারবার পালিয়ে যায় সোনা পাচারকারীরা। সন্দেহ, সরষের ভেতরেই কি ভূত আছে? বিমানবন্দরের কেউ না কেউ পাচারকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ‘তার’ সাহায্যেই কি কাঁড়ি কাঁড়ি সোনা বিমানবন্দর পার হচ্ছে? শেষ পর্যন্ত সন্দেহ সত্যি হলো।

২০২১ সালের ৯ অক্টোবর সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে ওমান এয়ারের ফ্লাইটে স্বর্ণের বড় একটি চালান আসার গোপন সংবাদ পায় কাস্টমস গোয়েন্দারা। তারা এও জানতে পারে বিমানবন্দরে নিয়োজিত কোনো এক কর্মচারী পাচারকারীর কাছ থেকে চালান বুঝে নিয়ে পার করে দেবেন। খবর পেয়ে জাল পাতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত সার্কেল টিম। উড়োজাহাজ থেকে নেমে এক যাত্রী শৌচাগারে ঢুকে ৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকার ৮০ পিস সোনার বার সিভিল অ্যাভিয়েশন নিরাপত্তাকর্মী মো. বেলাল উদ্দিনের (৪০) কাছে হস্তান্তর করেন। এরপর বিমানবন্দরের অ্যাপ্রন এলাকা অতিক্রম করার সময় ৮০ পিস সোনার বারসহ বেলালকে আটক করে কাস্টমস গোয়েন্দারা।

এ ঘটনায় নগরের পতেঙ্গা থানায় মামলা করে বিমানবন্দরে নিয়োজিত কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। মামলা তদন্তের একপর্যায়ে তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি জানতে পারে শৌচাগারে ঢুকে বেলাল উদ্দিনকে সোনার চালান হস্তান্তরকারী যুবকের নাম রায়হানুল ইসলাম চৌধুরী সবুজ (২৮)। তিনি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার জুঁইদ-ির ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোস্তাক আহমদের ছেলে। রায়হানুল আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের সক্রিয় সদস্য। এ ছাড়া এই ঘটনায় আবদুর রহিম (৪০) নামে আরও এক ব্যক্তির জড়িত থাকার তথ্য পায় সিআইডি। আবদুর রহিম কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জুপুয়া দক্ষিণপাড়ার মো. ফজলে রহমানের ছেলে। বেলাল চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও বাড়ইপাড়ার হাজী রমজান আলী বাড়ির বাদশা মিয়ার ছেলে।

তদন্ত শেষে গত ১৫ জানুয়ারি বেলাল উদ্দিনসহ ওই তিনজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন সিআইডির পরিদর্শক প্রকাশ প্রণয় দে। ঘটনার পর থেকে রায়হানুল পলাতক। প্রকাশ প্রণয় দে জানান, বিমানবন্দরের সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আবদুর রহিমকে শনাক্ত করা হয়। ২০২২ সালের ১ মার্চ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

শুধু ৮০ পিস সোনার বার উদ্ধার মামলা নয়, নগরের পতেঙ্গা থানায় হওয়া আরও একটি মামলা তদন্তে গিয়ে স্বর্ণ পাচারে মূলহোতাসহ সিভিল অ্যাভিয়েশনের কর্মচারীদের সংঘবদ্ধ চক্রের তথ্য পেয়েছে সিআইডি। জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে কাস্টমস গোয়েন্দাদের পাশাপাশি সিআইডিও জাল বিস্তার করেছে।

জানা গেছে, ২০২২ সালের ৭ জুলাই সকাল ৭টা ২০ মিনিটে এয়ার এরাবিয়ার ফ্লাইট (জি৯-৫২৬) শারজা থেকে আসা যাত্রী মিজান উদ্দিনের মানিব্যাগ থেকে ১ কেজি ৩৯৮ গ্রাম ওজনের ১২ পিস সোনার বার উদ্ধার করে কাস্টমস গোয়েন্দারা।

এ ঘটনায় নগরের পতেঙ্গা থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করেন সংস্থাটির সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আবদুল জলিল। তদন্ত শেষে গত বছর ১৬ অক্টোবর মূলহোতাসহ চারজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন সিআইডি চট্টগ্রাম মেট্রো ও জেলা শাখার পরিদর্শক মাইন উদ্দিন।

অভিযুক্তরা হলেন ১২ পিস সোনার বার পাচার চক্রের মূলহোতা চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির সুন্দরপুর ইউনিয়নের ছাদেক নগর গ্রামের গোলাফ রহমান চৌধুরী বাড়ির গোলাম হোসেন চৌধুরীর ছেলে জুয়েল হোসেন চৌধুরী রনি (৩৬), ওই সোনার চালানের বাহক চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের মানিকপুর কাজীপাড়ার নুর মোহাম্মদের ছেলে মিজান উদ্দিন, একই উপজেলার মধ্যম কাঞ্চন নগরের মো. ইয়াকুবের ছেলে মঞ্জুরুল ইসলাম চৌধুরী (৩৪) এবং একই উপজেলার লেলাং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত ইমদাদুল হকের ছেলে মো. আনোয়ার হোসেন ছোটন (৩৫)।

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, বিদেশি মুদ্রা পাচার দ্বন্দ্বে গত ১১ ডিসেম্বর রাতে শাহ আমানত বিমানবন্দর আবাসিকে সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্মচারী ওসমান সিকদার খুনের ঘটনা ঘটে। মামলা তদন্তে গিয়ে চোরাচালানের ‘গডফাদারদের’ সঙ্গে চুক্তিতে স্বর্ণবার ও বিদেশি মুদ্রাপাচারে সিভিল অ্যাভিয়েশনের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা জড়িত থাকার তথ্য পায় পুলিশ। বিমানবন্দরকেন্দ্রিক ওই চক্রে অন্তত দশজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সংস্থাটির দুজন কর্মচারী ওসমান খুনে গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন পতেঙ্গা থানার ওসি (তদন্ত) ফরিদুল আলম।

সিআইডি চট্টগ্রাম মেট্রো ও জেলা শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শাহনেওয়াজ খালেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরষের মধ্যেই রয়েছে ভূত। সেটা মাথায় রেখে ৮০ পিস সোনার বার উদ্ধার মামলার তদন্ত তদারক করেছি। সিভিল অ্যাভিয়েশনের নিরাপত্তাকর্মী বেলাল উদ্দিনের কাছ থেকে মূল পাচারকারীর তথ্যসহ বিমানবন্দরে কর্মরত তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির একাধিক কর্মচারীর নাম তদন্তে উঠে এসেছে। ইতিমধ্যেই কয়েকজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত