মেয়াদ ফুরালেও শেষ হয় না কাজ

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৫, ০৮:৩২ এএম

বহু প্রতীক্ষিত এবং প্রত্যাশিত ভৈরব সেতুর নির্মাণকাজ সমাপ্তে মেয়াদ ছিল মাত্র দুবছর। দুবছরের মেয়াদ গড়িয়েছে সাড়ে পাঁচ বছরে। তবে ৬১৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ব্যয়ের এ কাজে মোট অগ্রগতি মাত্র ৩৫ শতাংশ। শুধুই ভৈরব সেতু না, সাড়ে ৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে গল্লামারী সেতু ও ৭৪৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে চুনকুড়ি সেতু নির্মাণকাজের একই করুণ দুর্দশা। দুই দফার মেয়াদ শেষ হতে গেলেও গল্লামারী সেতু নির্মাণকাজে অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ। অন্যদিকে প্রায় আড়াই বছরেও চুনকুড়ি সেতু নির্মাণকাজই শুরু হয়নি। এভাবে তিনটি সেতু নির্মাণকাজে মেয়াদ ফুরিয়ে মেয়াদ বাড়ছে। কিন্তু নদীর দুই তীরে জোড়া লাগছে না সেতু। যা নিয়ে ক্ষুব্ধ ও হতাশ খুলনাবাসী।

ভৈরব সেতু : খুলনা শহর থেকে দীঘলিয়া, গাজীরহাট ও তেরখাদা উপজেলাকে পৃথক করেছে ভৈরব নদ। তাই নদের দুই প্রান্তের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে ভৈরব সেতু নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করে খুলনা সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর। ২০১৯ সালে ১৭ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। ১৩১৬ দশমিক ৯৬ মিটার দীর্ঘ ও ১০ দশমিক ২৫০ মিটার প্রস্থের এ সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৬১৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। প্রকল্পে কাজের অংশগুলো ছিল জমি অধিগ্রহণ ও সেতু নির্মাণকাজ। সেতু নির্মাণ প্যাকেজে ছিল ১২১৬ দশমিক ৯৬ মিটার সেতু, ১০০ মিটার স্টিল সেতু, ১৩৭৬ মিটার অ্যাপ্রোচ সড়ক, ২ কিলোমিটার নতুন সড়ক, ৩৭৬০ মিটার বিভাজক, রক্ষাপ্রদ ৬ হাজার বর্গমিটার, দুটি ইন্টার সেকশন ও টোল প্লাজা নির্মাণ।

সূত্রটি জানায়, তিনটি প্যাকেজে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মধ্যে সেতু নির্মাণ করছে করিম গ্রুপের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০২২ সালের ২৫ নভেম্বর কাজ শেষ হওয়া কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। তবে কাজে ধীরগতির কারণে তৃতীয় দফায় দুবছর সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে অর্থাৎ ২০২৬ সালের ৩০ জুন। কিন্তু গেল চার বছরে সেতুর নির্মাণকাজের মোট অগ্রগতি মাত্র ৩৫ শতাংশ।

দীঘলিয়ার বাসিন্দা শেখ আহাদ আলীসহ কয়েকজন জানান, প্রতিদিনই ট্রলারে পারাপারে ভোগান্তি হয়। খরচ আর দুর্ভোগ দুটোই বাড়ে। তাই সেতুটি নিয়ে অনেক আশা ছিল যে কৃষিপণ্য নিয়ে সহজে পারাপার হওয়া যাবে। তবে কাজের গতি খুবই মন্থর। বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে কিন্তু কাজ এগোচ্ছে না। গত চার বছর ধরে দেখছি কখনো একটু কাজ হয় আবারও বন্ধ হয়ে যায়।

এ প্রসঙ্গে ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশনের প্রকল্প ব্যবস্থাপক এস এম নাজমুল বলেন, কার্যাদেশ পাওয়ার পরই কাজ শুরু করা হয়। তবে সড়ক বিভাগ থেকে জমি ঠিকভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। কয়েক দফায় তাদের কাছে দীঘলিয়া উপজেলা অংশের জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। শহর প্রান্তে এখনো উঁচু উঁচু বিল্ডিং দাঁড়িয়ে আছে। ফলে দীর্ঘ এ সময়ে ঠিকভাবে কাজ করা যায়নি।

তবে সড়ক ও জনপদের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানিমুল হক বলেন, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ইতিমধ্যে সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রস্তাবে সেতুর ১০০ মিটার স্টিলের অংশ বাড়িয়ে ১৬০ মিটার, ১৪০টি পিসি গার্ডার পরিবর্তে স্টিলের গার্ডার এবং প্রস্থ ১০ দশমিক ২৫০ মিটারের পরিবর্তে ১৩ দশমিক ৩০ মিটারের কথা বলা হয়েছে। সংশোধিত প্রকল্পের ব্যয় কিছুটা বাড়বে। তবে প্রস্তাব অনুমোদন হয়ে আসেনি। তবে সম্প্রতি ফের অন্যান্য কাজ শুরু হয়েছে।

গল্লামারী সেতু : গল্লামারীতে ময়ূর নদের ওপর দুটি সেতু ছিল। পুরনো সেতুটি নির্মাণ করা হয় পাকিস্তান আমলে। সেটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় এর পাশে ২০১৩ সালে নতুন একটি সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। পিসি গার্ডার পদ্ধতির সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয় ৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ২০১৫ সালে সেতুটি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। কিন্তু মাত্র সাত বছরে এই সেতুটিও পরিণত হয় ভঙ্গুর দশায়। এর নিচ দিয়ে কোনো নৌযানও চলাচল করতে পারে না। তাই এখন দুটি সেতু ভেঙে নতুন আঙ্গিকে দৃষ্টিনন্দনভাবে স্টিল অবকাঠামোর সেতু নির্মাণ হচ্ছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ১ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় খুলনা জোনের আওতাধীন মহাসড়কে বিদ্যমান সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ পুরনো কংক্রিট সেতু বা বেইলি সেতুর কংক্রিট সেতু নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্প অনুমোদন পায়। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় চার বছর। গত বছর ৩০ জুন মেয়াদ শেষ হয়। তবে নির্ধারিত মেয়াদে কাজ শেষ না হওয়ায় দ্বিতীয় দফায় এ প্রকল্পে মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ। এ প্রকল্পের আওতায় গল্লামারী ময়ূর নদের আগের সেতুর স্থলেই দুটি সেতু নির্মিত হচ্ছে। সাড়ে ৬৭ কোটি টাকা চুক্তি মূল্যে কাজ বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জানায়, দ্বিতীয় দফার বাড়তি মেয়াদের সময় ফুরিয়ে বাকি রয়েছে মাত্র আড়াই মাস। কিন্তু কাজে ভৌত অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ। এখন নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।

এ ব্যাপারে প্রজেক্ট ম্যানেজার অপূর্ব কুমার বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রথমে দুটি সেতুর মধ্যে বেশি পুরনো সেতুটি ভেঙে সেখানে নতুন সেতুর নির্মাণ শুরু করা হয়। সেখানে নদের দুপাশে কংক্রিটের সাব-কনস্ট্রাকশনের কাজ শেষ হয়েছে। এখন স্টিলের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য কারখানায় কাজ চলছে। কারখানায় স্টিল মালামাল ফেব্রিকেট হচ্ছে। সেগুলো আসতে সময় লাগচ্ছে।

চুনকুড়ি সেতু : দাকোপ উপজেলার সঙ্গে উপকূলবর্তী পাঁচটি ইউনিয়নকে বিচ্ছিন্ন করেছে চুনকুড়ি নদী। বাজুয়া, দাকোপ, লাউডোব, কৈলাশগঞ্জ ও বানীশান্তা ইউনিয়নের বাসিন্দাদের চুনকুড়ি নদীর ওপর সেতু নির্মাণে দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় সেই দাবি পূরণে ২০২১ সালে কুনকুড়ি নদীর ওপর সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৭৪৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি হয়। ২০২২ সালের ১৬ আগস্ট একনেকে অনুমোদন হয় প্রকল্পটি। প্রকল্পের আওতায় ৪৫৪ মিটারের মূল সেতু এবং ৭৮০ মিটার ভায়াডাক্ট নির্মাণ হবে। ২০২২ সালের জুলাই থেকে শুরু হয়ে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে সেতু নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পে ৭৪৫ কোটি টাকার মধ্যে ১৭০ কোটি টাকা সরকার এবং ৫৭৪ কোটি টাকা দেবে আবুধাবি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এডিএফডি) এবং কুয়েত ফান্ড ফর আরব ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট (কেএফএইডি)। কিন্তু অনুমোদনের দুবছর ৪ মাস অতিবাহিত হলেও সেতুর কাজ শুরু হয়নি।

এ প্রসঙ্গে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শিশির কান্তি দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে বৈদেশিক ঋণ সহায়তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। কারণ লোন চুক্তির আগেই ডিপিপি অনুমোদন হয়। তবে এখন এডিএফডি ও কেএফএইডির সঙ্গে ফান্ডের ব্যাপারে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে দ্রুতই সেতু নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত