বাবা কেন যে আমাকে হকি খেলোয়াড় বানালেন

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৫, ০৮:৪৭ এএম

৩২-৩৩ বছর বয়সীদের আর বিবেচনা করা হবে না হকি ফেডারেশনের এই অদ্ভুত নিয়মে জাতীয় দলের ফিটনেস টেস্টে ডাক পাননি হকি তারকা রাসেল মাহমুদ জিমি। ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে পৌঁছে এই অসম্মান মেনে নিতে পারছেন না। মনের কষ্টগুলো উগরে দিয়েছেন দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ’র কাছে

কেমন আছেন? কেমন কাটছে দিনকাল?

রাসেল মাহমুদ জিমি: এমনিতে ভালোই আছি আলহামদুলিল্লাহ। তবে মানসিকভাবে ভালো নেই।

কেন?

জিমি: জানেনই তো জাতীয় দল গঠনের জন্য কুপার টেস্টে আমাকে ডাকা হয়নি। একজন খেলোয়াড় বাদ পড়তেই পারে। যদি সে খারাপ পারফরম্যান্স করে কিংবা চোট থাকে, তাকে বাদ দিতেই পারে। তবে যে কারণে আমাকে বাদ দেওয়ার কথা শুনছি সেটা হলে তো ভালো থাকার কথা না। দুনিয়ার কোথাও কোনো খেলায় কি দেখেছেন একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর জাতীয় দলে খেলার দরজা বন্ধ হয়ে যায়? সত্যি যদি এই কারণে বাদ পড়ি সেটা মেনে নেওয়া কষ্টের।

ফেডারেশন সাধারণ সম্পাদক ৩২-৩৩ বছরের বেশি বয়সীদের জাতীয় দলে না নেওয়ার কথা বলেছেন। হকিতে কি এ রকমটা আগে কখনো হয়েছে?

জিমি: আমার জানা মতে দেশের হকিতে এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি। এমনকি বিশ্ব হকিতেও এ রকম কোনো নজির নেই। শুধু হকি নয়, অন্য কোনো খেলায় কখনো শুনিনি বয়স নির্দিষ্ট করা হয় জাতীয় দলে খেলার ক্ষেত্রে। এমনিতেই বাংলাদেশ খুব বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পায় না। সর্বশেষ ২০২৩ সালে এশিয়ান গেমসে আমরা খেলেছিলাম। এএইচএফ কাপ, এশিয়া কাপ আর এশিয়ান কাপেই আমাদের খেলার সুযোগ থাকে। এগুলো আবার হয় চার বছর পরপর। ফলে আপনি কিন্তু এমনিতেই খেলার সুযোগ পাচ্ছেন না। তাছাড়া লিগটাও হয় না নিয়মিত। খেলাই যদি না হয় খেলোয়াড়রা ফিটনেস কী করে ধরে রাখবে। আমি আমার সামর্থ্য বুঝি। ফিটনেস যদি খারাপই থাকে, তবে কেন গত লিগের ১৬টা ম্যাচেই মোহামেডান পুরো সময় আমাকে খেলাবে? নৌবাহিনী দলেই বা কীভাবে নিয়মিত খেলছি? একজনের পারফরম্যান্স যদি ভালো হয় এবং ফিটনেস যদি উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তবে আপনি কী করে বাদ দেবেন? তাছাড়া আমাকে ফিটনেস প্রমাণের সুযোগটাই তো দেওয়া হচ্ছে না। তার আগেই বাতিলের খাতায় ঠেলে দেওয়া হলো।

আপনার হতাশার জায়গাটা বুঝতে পারছি। তারপরও নিশ্চয় অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে?

জিমি : আমি কোনো কারণ খুঁজতে চাই না। কাউকে দোষারোপও করতে চাই না। দেখুন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিম-লে একেবারেই নিয়মিত নয়। একেকটা খেলার ফাঁকে কয়েক বছরের ধুলো জমে যায়। এই খেলা না পাওয়ার দোষ তো খেলোয়াড়দের দেওয়ার সুযোগ নেই।

এখন আপনার বয়স কত?

জিমি : অরিজিনাল বলেন আর পাসপোর্ট আবার সব জায়গায় বয়স ৩৭। ১৯৮৭ সালে আমার জন্ম। এখন আমি চাইলেই তো বয়স কমাতে পারব না। আপনি আমার বাবা-মাকে দোষারোপ করতে পারেন এক্ষেত্রে। তারা যদি কয়েক বছর পর আমাকে পৃথিবীতে আনতেন, এই দিনটা অন্তত দেখতে হতো না। আচ্ছা বলেন তো, আমি কি দোষ করে ফেলেছি ভালো হকি খেলে? আমার কারও প্রতি কোনো ক্ষোভ নেই। সব ক্ষোভ আমার নিজের ওপর। প্রথমত আমার বাবা কেন হকি খেললেন। দ্বিতীয়ত আমার বাবা কেন যে আমাকে হকি খেলোয়াড় বানালেন। এখন আমার মেয়েকে দেখি হকিস্টিক নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে। চিন্তা করেছি হকিস্টিকটা ওর কাছ থেকে লুকিয়ে রেখে দেব। যাতে এই খেলাটা খেলতে না পারে।

আপনার অভিষেকটা কবে যেন?

জিমি : ২০০৩ সালে আমার আন্তর্জাতিক অভিষেক। তখন আমার বাবা কোচ ছিলেন। তখন অনেকেই বলেছিলেন বাবা কোচ বলেই খেলার সুযোগ পেয়েছি। পরে তো আর বাবা ছিলেন না। মারাও গেছেন। এরপর দেশি-বিদেশি সব কোচই আমাকে দলে নিয়েছেন, খেলিয়েছেনও। টানা খেলেছি নিজেকে প্রমাণ করে। দলের অধিনায়কত্বও করেছি বহু বছর। নিশ্চয় কোচরা আমার মুখ দেখে খেলায়নি, অধিনায়কত্বও দেননি।

সর্বশেষ জাতীয় দলের হয়ে দেড় বছরের বেশি সময় আগে আপনি এশিয়ান গেমস খেলে এসেছেন। তখন কি ভেবেছেন খেলা থেকে এভাবে বঞ্চিত হবেন?

জিমি : আমরা এশিয়ান গেমসে অংশ নিয়েছিলাম যখন তখন একজন অভিজ্ঞ কোরিয়ান কোচের অধীনে খেলি। উনি কিন্তু আমাকে দলে নিয়েছিলেন আমার পারফরম্যান্স দেখেই। আমার ফিটনেস দেখেই উনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আমার সঙ্গে কিন্তু কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল না। এমনকি কখনো তাকে কোনো উপঢৌকন দিইনি।

শুধুই কি বয়স, নাকি নেপথ্যে আরও কিছু আছে?

জিমি : আমি তো সেটা বলতে পারব না। তাছাড়া বর্তমান ফেডারেশন কর্তাদের সঙ্গে তো আমার সেভাবে কোনো পরিচয়ই নেই। সমস্যা হওয়া তো দূরের কথা। সাধারণ সম্পাদক যিনি, তাকে তো আমি চিনিই না। এত বছরেও তাকে কখনো ফেডারেশনে দেখিনি। তিনি এখন কেন এটা করলেন, তিনিই ভালো বলতে পারবেন।

তার মানে কি জিমি অধ্যায়ের এখানেই শেষ?

জিমি : আমি তো এখনই শেষ দেখছি না। আমি খেলা চালিয়ে যাব। দীর্ঘ ২২ বছর ধরে দেশের জন্য খেলছি। টাকার জন্য যে খেলিনি সেটা তো জানেন। দেশকে কিছু দেওয়ার জন্যই খেলছি। ২২ বছরে ছয়টা এশিয়া কাপ খেলেছি। শেষটা যখন খেলি, তার আগে বিশ্ব হকি সংস্থার কর্তা তৈয়ব ইকরাম অবাক হয়ে বলেছিলেন তুমি এই বয়সে কীভাবে খেলবা? অথচ সেই আসরে আমি সব ম্যাচ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খেলেছিলাম। আসলে সবাই তো আজীবন খেলতে পারে না। একটা জায়গায় গিয়ে থামতেই হয়। আমারও থামতে হবে, সেটা আমি জানি। তবে সেটা আমারই সিদ্ধান্তে হওয়া উচিত। আমি যদি মনে করি জাতীয় দলে আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে, এক মুহূর্তও থাকব না। কিন্তু এভাবে কালাকানুন করে বাদ দেওয়াটা আমাকে ভীষণ ব্যথিত করেছে। আমি চাই জাতীয় দলে আমার চেয়েও ভালোমানের খেলোয়াড় আসুক। আমি নিজে তাদের জায়গা ছেড়ে দিয়ে চলে যাব। তবে এখনই না। আমি খেলা চালিয়ে যাব। আমি জানি কী করে নিজের ফিটনেস ঠিক রাখতে হয়, সেরা পর্যায়ে নিয়ে যেতে হয়। আমি গত ১০ বছরে খুব কম বেলা ভাত খেয়েছি। অনেকের ফিটনেস আনতে এক মাস লাগে, আমার সেটা আসে ১০ দিনে। কারণ আমি জানি আমাকে কী করতে হবে।

তার মানে এখন সার্ভিসেস দল আর ক্লাব হকি খেলবেন?

জিমি : আমি নৌবাহিনীতে আছি। তারা আমার মতো ২৮ জন জাতীয় দলের সাবেক ও বর্তমান খেলোয়াড়কে চাকরি দিয়েছে, ভবিষ্যতের একটা নিশ্চয়তা দিয়েছে। তাদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আমি আমার সামর্থ্যরে শেষ বিন্দু দিয়ে হলেও বাহিনীর জন্য খেলব। আর ক্লাব হকি কি আর নিয়মিত হয়? হলে যদি ক্লাবগুলো আমাকে নিতে চায়, তবে অবশ্যই খেলব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত