জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে গত ১৬ জানুয়ারির সংলাপে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, গত জুলাই-আগস্টে ছাত্রদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশবাসী যে ঐক্য দেখিয়েছিল, এই অন্তর্বর্তী সরকার তারই ফলাফল। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের উদ্দেশে বলেছিলেন আপনাদের দেখে আমার ভালো লাগছে এই ভেবে, আমরা এক আছি। এই সরকারের জন্ম ঐক্যের মাধ্যমে এবং ঐক্যই আমাদের শক্তি। যখন আমরা একা একা কাজ করি এবং হঠাৎ দেখি আপনারা আমাদের পাশে নেই, তখন আমরা দুর্বল মনে করি। যখন সবাই একসঙ্গে হন, তখন সাহস পাই। প্রধান উপদেষ্টার এই বক্তব্যের এক সপ্তাহ না যেতেই রাজনৈতিক দল ও উপদেষ্টা সমন্বয়কদের বিভিন্ন বক্তব্যে অনৈক্যের সুর বাজছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন সংস্কারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে ঐক্যে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় কি না। ঐক্যে চিড় ধরলে বিগত ফ্যাসিবাদীদের রাজনীতিতে আবার সক্রিয় হওয়ার পথ তৈরি হতে পারে।
গত মঙ্গলবার বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘যদি অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ণ নিরপেক্ষতা পালন করে, তাহলেই তারা নির্বাচন কন্ডাক্ট (পরিচালনা) করা পর্যন্ত থাকবেন। তা না হলে তো নিরপেক্ষ সরকারের প্রয়োজন হবে।’ বিএনপি মহাসচিবের ওই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লেখা স্ট্যাটাসে উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ফেসবুকে বলেছেন, ‘বিএনপি মহাসচিবের নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মূলত আরেকটা এক-এগারো সরকার গঠনের ইঙ্গিত বহন করে। এক-এগারোর বন্দোবস্ত থেকেই আওয়ামী ফ্যাসিজমের উত্থান ঘটেছিল। বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্যে সামনে আরেকটা এক-এগারো সরকার, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও নতজানু পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা এবং গুম-খুন ও জুলাই হত্যাকা-ের বিচার না হওয়ার আলামত রয়েছে।’
মির্জা ফখরুল আরও বলেছিলেন, ছাত্র আন্দোলনের নেতারা কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করলে সরকার থেকে বেরিয়ে এসে সেটা করা উচিত। মহাসচিবের এই বক্তব্যের জবাবে অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, ‘উপদেষ্টাদের কেউ রাজনীতি করলে সরকার থেকে বের হয়েই করবে। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে সজীব ভূঁইয়া আরও বলেন, ‘একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের ও সরকারের কাজে হস্তক্ষেপ করা অনুচিত। বিভিন্ন সরকারি বা সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগে তদবির বা চাপ প্রয়োগ করা অনুচিত।’
এখানেই শেষ নয় মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের রেশ ধরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস গতকাল শুক্রবার নয়াপল্টনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর দশম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত মিলাদ ও দোয়া মাহফিলে অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আজকে অনেকে স্বাধীনতা পেয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে কথা বলছেন। কেউ কেউ বলছেন বিএনপি আবারও এক-এগারো আনার পাঁয়তারা করছে। আরে এক-এগারোর ভয়াবহ পরিণতি বিএনপির চেয়ে কেউ বেশি শিকার হয়নি। খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে দলের এমন কোনো নেতাকর্মী এ থেকে রেহাই পায়নি। যদি এ ধরনের কথাবার্তা বলতে থাকেন, তাহলে বাংলাদেশ গণতন্ত্রের মুখ দেখবে না।’
এ ছাড়া দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘আমরা শুনতে পাচ্ছি, উপদেষ্টার পক্ষ থেকে কিংস পার্টি করা হবে। আমরা এ-ও শুনতে পাচ্ছি, বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলকে উপদেষ্টাদের পক্ষ থেকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এজন্য কি রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে না? মানুষের ধারণা, অন্তর্বর্তী সরকার একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন করবে। অনন্তকাল ধরে তারা সংস্কার করবে, এটা হতে পারে না।’
এদিকে সবাইকে গণপরিষদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেছেন, ‘বর্তমান রাজনৈতিক যে ক্রাইসিসগুলা চলছে, সেখানে লালসন্ত্রাস-গ্রিনসন্ত্রাস আসবে। আমরা ২৪ গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে জাতিগত বিদ্বেষ চাই না, কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রম চাই না। যে আদর্শিক বিভাজন বাংলাদেশে রয়েছে, সেখান থেকে আমরা সরে আসতে চাই। বিভিন্ন যে বাদ আছে জিয়াবাদ বলুন, মুজিববাদ বলুন আমরা কোনো বাদ বাংলাদেশে চাই না। আমরা বাংলাদেশে শুধু একটি বিষয় বুঝি, সেটা হলো জনগণ।’
তার এমন বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘আমি বলব, ভাই আপনাকে কে দেখতে বলেছে? কে ঠিকাদারি দিয়েছে আপনাকে? চোখ নাই, মাথা নাই, বুদ্ধি নাই, বিবেচনা নাই! মুজিব আর জিয়া এক জিনিস নয়। মুজিব গণতন্ত্র হত্যা করেছেন আর জিয়া গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছেন। মুজিব মুক্তিযুদ্ধের সময় পালিয়ে গেছেন, আর জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন এবং যুদ্ধ করেছেন। মুজিব বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ এনেছেন, আর শহীদ জিয়া বাংলাদেশ থেকে দুর্ভিক্ষ দূর করেছেন। শহীদ জিয়া আর মুজিবের মধ্যে যে পার্থক্য বুঝে না, সে নাকি আবার রাজনৈতিক দল গঠন করবে! এটা দুঃখজনক।’
এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘মানুষ খুন করে তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে চেয়েছিল। ফ্যাসিস্টরা যেন ফের ফিরে না আসে এবং আমরা যেন তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় না দিই। বাংলাদেশে যত অন্যায়ভাবে, যত মানুষকে খুন করা হয়েছে, আমরা তার প্রতিটির বিচার চাই।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সামনের দিনগুলোতে ভালো কিছু বয়ে আনবে না। গত ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হলেও তাদের দোসররা এখনো আমাদের সমাজেই ঘাপটি মেরে আছে। তারা সুযোগের অপেক্ষা করছে। সুযোগ পেলেই ফিরে আসতে চাইবে। তাই রাজনৈতিক দল, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের আরও সচেতনতার সঙ্গে কথা বলা উচিত।
পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৫ আগস্টের আগে সরকার পতনের জন্য সরকারের বাইরে সবার মধ্যে একটা ঐক্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু এখন ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। আর এ কারণে একটা অনৈক্য লক্ষ করা যাচ্ছে। এর কারণ দায়িত্বশীল মানুষ দায়িত্বশীল আচরণ করছেন না। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকার নিরপেক্ষ থাকতে না পারলে নির্বাচনের আগে নিরপেক্ষ সরকার লাগবে। এটি না বলে বলতে পারতেন, যে যারা পার্টি করবেন তারা সরকার থেকে চলে যান। তাহলে যে বিতর্ক উঠেছে, তা উঠত না। অন্যদিকে বিএনপি মহাসচিব আরেকটা ওয়ান-ইলেভেনে চাইছে বলে যে বক্তব্য সরকারের একজন উপদেষ্টা করেছেন তা ঠিক হয়নি।’
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর জাতীয় ঐক্য, নির্বাচন ও সংস্কার ইস্যুতে ক্রিয়াশীল সব পক্ষকে যুক্ত করে একটি জাতীয় সংলাপ করেছিল। ঐক্য, সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে ‘ঐক্য কোন পথে’ শীর্ষক এই জাতীয় সংলাপের আয়োজন করে ফোরাম ফর বাংলাদেশ নামে একটি বেসরকারি সংস্থা। সেখানে ড. ইউনূস ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছিলেন। পাঁচ মাস পর সেই ঐক্য ধরে রাখার প্রত্যাশাই করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
