কক্সবাজার-টেকনাফের তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারবারি সৈয়দ হোসেন। চোরাকারবারিদের গডফাদারখ্যাত আবদুর রহমান বদির সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে তিনি এলাকায় পরিচিত। ইয়াবা কারবার চালিয়ে শতকোটি টাকার মালিক। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত হওয়ায় বছর-পাঁচেক আগে টেকনাফে তার বসতভিটা গুঁড়িয়ে দেয় প্রশাসন। পালিয়ে যান এলাকা ছেড়ে। একপর্যায়ে আত্মসমর্পণ করেন পুলিশের কাছে। সম্প্রতি তিনি এলাকায় ফিরে এসে গুঁড়িয়ে দেওয়ায় ওই বসতভিটা মেরামত করে গেড়েছেন আস্তানা।
শুধু সৈয়দ হোসেনই নন; তার মতোই অর্ধশত ইয়াবা কারবারি গুঁড়িয়ে দেওয়া বসতভিটায় একইভাবে চালাচ্ছেন কারবার। তাদের ‘গুরু’ কারাগারে থাকলেও মাদক কারবার চালাতে কোনো সমস্যাই হচ্ছে না। প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব অপকর্ম করলেও যেন দেখার কেউ নেই। স্থানীয় প্রশাসন জেনেও না জানার ভান করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি কক্সবাজার ও টেকনাফে সরেজমিনে গিয়ে এসব তথ্য মিলেছে দেশ রূপান্তরের কাছে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের কাছে ১০২ ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করে। তারা প্রায় এক বছর কারাগারে থাকলে ছিলেন অনেকটা রাজারহালে। এমনকি কারাগারের ভেতরই চালাতেন শলাপরামর্শ। প্রশাসনের মাধ্যমে একজন বাদে সবাই জামিনে বের হয়ে যান। তার মধ্যে রাসেল নামের একজন কারাগারে মারা যান।
এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন, কারাগার থেকেই বের হয়ে তারা চলে গেছেন আগের পেশায়। তারা প্রকাশ্যে মাদক কারবার চালাচ্ছেন। যারা কারাগার থেকে বের হয়েছেন, তারা আলোচিত সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির স্বজন ও ঘনিষ্ঠ। গত সপ্তাহে এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। তা ছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও একই ধরনের তথ্য পেয়েছে। তবে পুলিশ ও র্যাবের তৎপরতা বাড়ানোর কথা বলা হলেও টহল কম রয়েছে এলাকায়। প্রতিদিনই সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবার চালান নিয়ে আসছেন তারা।
ইয়াবা বেচাকেনা বেড়ে যাওয়ায় খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও অনেকটা চিন্তিত। বছর-চারেক আগে তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারবারিদের বসতভিটা গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। টেকনাফসহ আশপাশ এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গুঁড়িয়ে দেওয়া বসতভিটাগুলো সংস্কার করে দিব্যি কারবার চালিয়ে আসছেন তারা।
মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা টেকনাফসহ আশপাশ এলাকার মানুষের দৈন্যদশা ছিল। মাছ ও লবণ চাষই ছিল সবার কাজ। আবার কেউ কেউ বাস বা ট্রাকের হেলপার অথবা চালক ছিলেন। এক যুগ আগে হঠাৎ করেই বেশিরভাগ লোকের হাতে ধরা দেয় ইয়াবা।
আর ওই ইয়াবা ধরা দেওয়ার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক সাবেক সাংসদ আবদুর রহমান বদি। রাতারাতি বড়লোক হওয়ার আশায় গড়ে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ লোকই যোগ দেয় ইয়াবা কারবারে। ইয়াবার ছোঁয়ায় রাতারাতিই কোটিপতি বনে যান অনেকে। পরিবর্তন আসে জীবন মানে। আর ইয়াবার টাকায় বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠে দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় ওইসব অট্টালিকা থাকলেও কিছুই হয়নি।
সরেজমিনে আরও দেখা গেছে, টেকনাফের মৌলভীপাড়া, নাজিরপাড়া, শীলবনিয়াপাড়া, মিঠাপানিরছড়া, লম্বরিপাড়া, জালিয়াপাড়া, শাহপরীরদ্বীপসহ কয়েকটি স্থানে ইয়াবা কারবারিদের বসতভিটা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। সেগুলো আবার মেরামত করে ইয়াবার আস্তানা গড়ে তুলেছে। কারবারিদের মধ্যে মনির হোসেন ভয়ংকর প্রকৃতির। তার বিরুদ্ধে আটটি মামলা আছে। তিনি বদির দূরসম্পর্কের আত্মীয়। বদির ডান হাত হিসেবে পরিচিত শাহ আজমও বসতভিটা মেরামত করেছেন। মীর কাশেম পুুলিশের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি। টেকনাফের লম্বরিপাড়ায় তার আছে একটি দোতলা আলিশান বাড়ি। মাদক কারবারি করেই অঢেল ধন-সম্পদের মালিক। রাতের আঁধারে ওই বাড়িটি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেয় পুলিশ। অভিযোগ ছিল, ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার সময় পরিবারের সদস্যদের জোর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মালামাল সরানোর কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি। কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে আবার বিশাল অট্টালিকাটি মেরামতের পর মাদক কারবার চালাচ্ছেন।
নাজিরপাড়া গ্রামের অন্যতম তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারবারি সৈয়দ হোসেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকার প্রধান ফটক ও চার পাশের দেয়াল গুঁড়িয়ে দেওয়া ভবনটি আগের মতোই করা হয়েছে। বাড়িটির মধ্যে পাওয়া গেল হোসেনের স্ত্রী ও ছেলেকে। তাদের এক স্বজন জানান, সৈয়দ হোসেন, জামাল হোসেন, সৈয়দ আলী, আছাদ হোসেন, নূর হোসেন ও জাহিদ হোসেন নামের ছয় সন্তান আছে। একসময় তারা দুবাই থাকতেন। ওই সময় টাকা দিয়ে এই বাড়িটি করা হয়েছিল। সৈয়দ হোসেন ও জামাল হোসেনসহ চার ভাই দেশে এসে রাজনীতিতে নাম লেখান। এরপরই ইয়াবার তালিকায় তাদের নাম চলে আসে। তারা কিন্তু কখনো ইয়াবা কারবার করতেন না। তারপরও বাড়িটি ভেঙে দেয় পুলিশ।
তিনি আরও বলেন, পুলিশ বাড়িটি ভেঙেছে। গভীর রাতে পুলিশ বুলডোজার নিয়ে হামলে পড়ে। ওই সময় সবাই বাড়ির ভেতরে ছিলেন। টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশের উপস্থিতিতেই বাড়িটি ভাঙে ৩০-৪০ জনের একটি দল। বুলডোজার দিয়ে প্রথমে গেট ভেঙে ভেতরে ভাঙচুর করা হয়। বাসা থেকে কোনো মালামাল বের করতে পারেননি। সৈয়দ হোসেন পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। বছরখানেক কারাবাস শেষে বের হয়ে আসেন। বাড়িটি আবার মেরামত করা হয়েছে। শিলখালী বানিয়াপাড়া এলাকার শীর্ষ ইয়াবা কারবারি হাজি সাইফুলের বাড়িটিও ভেঙে ফেলা হয়েছিল। বছর-তিনেক আগে তিনি ক্রসফায়ারে মারা যান।
সাইফুল করিমের এক আত্মীয় বলেন, ‘চার বছর আগে বাড়ি ভাঙতে এলে থানার ওসিকে আমি জানাই এটা আমাদের বাড়ি। সাইফুল চট্টগ্রাম শহরে বাড়ি বানিয়েছেন। এখানে থাকেন না তিনি। ভাঙতে হলে তার বাড়ি ভাঙেন। তারপরও পুলিশ ভেঙে দেয়। এলাকার সবাই জানেন আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো। তারপরও কেন বাড়ি ভাঙা হলো। কেউ যদি প্রমাণ করতে পারে ইয়াবার টাকার বাড়ি, তাহলে পুলিশ পুরো বাড়িই নিয়ে নিক। তাহলে মন শান্তি পাবে।’
দবির মিয়া নামের এক ব্যক্তি জানান, পুলিশ তারও বাড়িটি ভেঙে দেয়। জালিয়াপাড়া এলাকার সালমান ও জিকুর তিনটি বাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। এগুলো মেরামত করা হয়েছে। টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার শামসুল আলম, সাবরাং বাজারপাড়ার বাসিন্দা ও শামসুলের শ্বশুর হাজি নূরুল আমিন, সদর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য এনামুল হক, ইউপি সদস্য আবদুল্লাহ, হ্নীলা ইউপি সদস্য নূরুল হুদা, সাইফুল করিমের ভাগ্নি জামাই ও টেকনাফ পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নূরুল বশর নুরশাদ, মৌলভীপাড়ায় আবদুর রহমান, নাজিরপাড়ার জিয়াউর রহমান, নুর মোহাম্মদের আলিশান বাড়ির একাংশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হলেও এগুলো মেরামত করা হয়। তারা সবাই ইয়াবা কারবারি। আগের মতোই একই কারবার চালিয়ে আসছেন বলে অভিযোগ করেছেন এলাকার লোকজন।
নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন এলাকাবাসী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বদি না থাকলেও তার সাঙ্গপাঙ্গরা আছেন বহাল তবিয়তে। প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করছে। বদির সহযোগীরা ইয়াবা কারবার চালিয়ে আসছেন। একসময় গুঁড়িয়ে দেওয়া বসতভিটাগুলো আবার ওরা মেরামত করেছেন। সেখানে বসবাস করে তাদের কারবার চালাচ্ছেন। তাদের ভয়ে আমরা কথা বলতে পারি না।’
কক্সবাজার জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পটপরিবর্তনের পরও বদির সহযোগীরা বহাল তবিয়তে আছেন তা সত্য। টেকনাফে এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে দালানকোঠা নেই। সবাই ইয়াবা কারবার চালিয়ে কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। বছর-পাঁচেক আগে পুলিশ ইয়াবা কারবারিদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দিলেও এগুলো আবার মেরামত করা হয়েছে। সেখানেই বসবাস করে তারা কারবার চালাচ্ছেন বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতনদের অবহিত করা হয়েছে। তাদের নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে।’
