পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে উঠে আসা ফুটবলারদের মধ্যে তারকাখ্যাতি পেয়েছেন কে? রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ির ২২ বছরের মিতুল মারমা প্রশ্নটা শেষ করতে দিলেন না। চট করে বলে উঠলেন, দুই সহোদর অরুণ বিকাশ দেওয়ান আর বরুণ বিকাশ দেওয়ানের নাম। এই দুই তারকা দূর রাঙ্গামাটি থেকে এসে ঢাকার মাঠ মাতিয়ে গেছেন বহু বছর আগে। অরুণ-বরুণের তারকাখ্যাতিকে পেছনে ফেলে মহাতারকা রূপে বিস্ফোরিত হওয়ার সেই স্বপ্ন এখন মিতুল মারমার চোখে। সে পথেই হাঁটছেন এই গোলকিপার। এর মধ্যেই জাতীয় দলের কোচ হাভিয়ের কাবরেরার প্রথম পছন্দে পরিণত হয়েছেন। বড় ক্লাবগুলোরও দৃষ্টি কেড়েছেন। ক্লাব ফুটবলে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের সুবাদেই তিনি এখন জাতীয় দলে অটোমেটিক চয়েজ। সদ্য শেষ হওয়া বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের প্রথম পর্ব শেষে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন পারফরম্যান্স দিয়েই। আবাহনীর জার্সিতে রীতিমতো চীনের প্রাচীরে রূপ নিয়েছেন, প্রথম পর্বের ৯ ম্যাচে তার কৃতিত্বেই আবাহনী একটি মাত্র গোল হজম করেছে! এই মৌসুমে খেলা ১০ ম্যাচের ৯টিতেই ক্লিন শিট! যা রীতিমতো অবিশ্বাস্য ফুটবলবোদ্ধাদের কাছে।
পয়েন্ট টেবিলে শতভাগ স্থানীয়দের নিয়ে গড়া আবাহনীর অবস্থান দুইয়ে, শীর্ষের মোহামেডানের চেয়ে চার পয়েন্ট কম। এই অবস্থান থেকে লিগ জেতা আবাহনীর জন্য অসম্ভব নয়। মিতুল যেভাবে অর্ধেক পথটা পাড়ি দিয়েছেন, এটার পুনরাবৃত্তি ঘটলে সে সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। লিগে আবাহনীর খেলা ৯ ম্যাচের আটটিতেই তেকাঠির নিচে ছিলেন বিশ্বস্ত মিতুল। একটি ম্যাচে শুধু এক গোল হজম করেছেন। বাকি আট ম্যাচই ক্লিনশিট। ফেডারেশন কাপে খেলা তিন ম্যাচেও এখন পর্যন্ত গোল হজম করেনি আবাহনী। এর মধ্যে মিতুল খেলেছেন দুই ম্যাচ। পুরো প্রথম পর্বে ক্লিনশিটের পরিসংখ্যানে চোখ রাখলে মিতুলের ধারেকাছেও নেই কেউ। শীর্ষে থাকা মোহামেডানের সাকিব আল হাসান ও ফর্টিস এফসির সারোয়ার জাহান দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তিনবার ক্লিনশিট রাখতে পারেন।
যদিও মিতুল এই কৃতিত্ব একা নিতে চান না। তিনি এর ভাগ দিচ্ছেন পুরো দলকে। মিতুল আলাপের শুরুটা করলেন এভাবে, ‘ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল আবাহনীতে খেলা। এ বছর আবাহনীতে খেলতে পারছি, এটা আমার কাছে ভীষণ গর্বের। শুরু থেকেই আমরা বিদেশিবিহীন একটা দল। যখন প্রথম ক্লাবে আসি, তখন থেকেই আমরা প্রত্যেকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম। আমরা স্থানীয়রা মিলেই দলকে এগিয়ে নেব, এই প্রতিজ্ঞা সবার মধ্যে কাজ করেছে। ফলে মাঠে সবাই শতভাগ দিতে পেরেছে। এই কৃতিত্ব শুধু আমার একার নয়। আমরা শুরু থেকেই দলবদ্ধ হয়ে খেলার চেষ্টা করেছি। কোচ আমাদের সেটাই বলেছেন। প্রতিটি পজিশনে ডিফেন্ডার, লেফট-রাইটব্যাক, মিডফিল্ডার, ফরোয়ার্ড আমরা সবাই সবাইকে সমর্থন দিয়ে খেলছি। কৃতিত্ব তাই আমাদের সবার। দলের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকেরই অবদান আছে। বিশেষ করে আমাদের কোচ (মারুফুল হক)। তিনি আমাদের অনেক মোটিভেটেড করেন। তিনি বলেছেন, তোমাদের জন্য প্রতিটি ম্যাচ ফাইনাল, প্রতিটি ম্যাচ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। কারণ আমাদের খেলতে হচ্ছে বিদেশি ফুটবলারদের নিয়ে গড়া প্রতিপক্ষের বিপক্ষে।’
আন্তঃস্কুল ফুটবল দিয়ে প্রথম নজর কেড়েছিলেন মিতুল। সেখান থেকে তাকে মোহামেডান জুনিয়র দলে খেলতে ঢাকায় পাঠান রাঙ্গামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ মনিরুল আলম। এরপর পাইওনিয়র লিগে খেলেন নোয়াখালী একাডেমির হয়ে। সেখান থেকে ডাক পান অনূর্ধ্ব-১৮ দলে। ২০১৮ সালে এই দলটি সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়। ২০১৯-২০ মৌসুমে তাকে দলে নেয় উত্তর বারিধারা। এরপর শেখ জামাল, ফর্টিস হয়ে শেখ রাসেলে খেলেন সর্বশেষ লিগ। এবার নিজের স্বপ্নের দলে খেলার সুযোগ পেয়েই নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়। জাতীয় দল ও বিভিন্ন ক্লাব দলে বেশ কজন কোচের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা হয়েছে মিতুলের। তাই গুরুদের ভোলেননি তিনি, ‘আমি যখনই যে কোচের সঙ্গে কাজ করেছি, চেষ্টা করেছি সবার কাছ থেকে সর্বোচ্চটা নেওয়ার। দুবছর আমি বিদেশি কোচের অধীনে কাজ করেছি (ফ্যাবিও রোসা)। এ ছাড়া নুরুজ্জামান নয়ন ভাইয়ের কাছ থেকেও মাঝেমধ্যে টিপস নিয়েছি। সর্বশেষ শেখ রাসেলে মাসুদ আহমেদ উজ্জ্বল ভাইয়ের অধীনে ছিলাম। ওনাকে জাতীয় দলেও পেয়েছি। উজ্জ্বল ভাইয়ের সঙ্গে আমার দুর্বলতাগুলো নিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করেছি, যা আমাকে অনেক হেল্প করেছে।’
জাতীয় দলে নিয়মিত খেলছেন, নজর কাড়ছেন ক্লাব ফুটবলেও। এখনই সময় নিজের লক্ষ্য নির্ধারণের। সেটা ঠিকই করেছেন ছোটখাটো আকৃতির হয়েও পোস্টের সামনে ভীষণ সাবলীল মিতুল, ‘আমি নিজেকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই, যাতে মানুষ সারা জীবন আমাকে মনে রাখে। আর দেশকে শিরোপা এনে দিতে পারলে মনে করব আমার খেলোয়াড়ি জীবন স্বার্থক।’
শেষ পর্যন্ত সবার হৃদয়ে চিরস্থায়ী হতে পারবেন কি না, সেটা সময় বলে দেবে। তবে এই লিগের অর্ধেকটা পথ যে কীর্তি গড়েছেন মিতুল সেটা অন্তত আবাহনীর সমর্থকরা মনে রাখবে বহুদিন।
