আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন অভিযোগে প্রায় ২ হাজার ২০০ জন পুলিশ সদস্য বরখাস্ত ও চাকরিচ্যুত হয়েছেন। বরখাস্ত ও চাকরিচ্যুত এসব পুলিশ সদস্যের অনেকেই চাকরিতে পুনর্বহালের জন্য আবেদনও করেছেন। আবেদন করা পুলিশ সদস্যদের চাকরিতে পুনর্বহাল না করলে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার দ্বারস্থ হবেন বলে জানিয়েছেন চাকরিচ্যুত পুলিশ সদস্যরা। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় এ তথ্য জানান তারা।
ভুক্তভোগী পুলিশ পরিবারের সমন্বয়ক চাকরিচ্যুত এসআই রহমত উল্লাহ নাওসাদ বলেন, আগামীকাল বৃহস্পতিবার (আজ) আমরা আবারও অবস্থান কর্মসূচি পালন করব। বিকেলে পুলিশ সদর দপ্তরে বরখাস্ত ও চাকরিচ্যুত হওয়াদের আবেদন পর্যালোচনার জন্য সভা রয়েছে। সেই সভায় কোনো সিদ্ধান্ত না এলে আমরা চাকরিতে পুনর্বহালের দাবিতে নির্বাহী আদেশের জন্য স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার দ্বারস্থ হব।
এর আগে গতকাল দুপুর ১২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত রাজধানীর ফুলবাড়িয়ায় পুলিশ সদর দপ্তরের সামনে চাকরিচ্যুত কয়েকশ পুলিশ সদস্যরা অবস্থান নেন। বিগত সরকারের আমলে ‘অবৈধভাবে চাকরিচ্যুত’ সব পুলিশ সদস্যকে পুনর্বহালের দাবিতে ভুক্তভোগী পুলিশ পরিবার এর ব্যানারে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করেন তারা।
আন্দোলনরত পুলিশ সদস্যরা বলেন, গত ছয় মাস ধরে চাকরি ফিরে পাওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে চাকরিচ্যুত পুলিশ কনস্টেবল, এসআই ও পরিদর্শকরা। আন্দোলনের শুরুর দিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য পুলিশ সদর দপ্তরকে আদেশও দিয়েছিলেন। কিন্তু ছয় মাসেও তা বাস্তবায়ন না করে উল্টো টালবাহানা করা হচ্ছে।
তারা বলেন, বুধবার সকাল থেকে আন্দোলন শুরু করলে সমাধানের জন্য পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এক ঘণ্টা সময় নেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের পরও ইতিবাচক কোনো আশ্বাস দেওয়া না হলে রাস্তায় নেমে সড়ক অবরোধ করেন। নির্বাহী আদেশে চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানা তারা।
আন্দোলনকারী চাকরিচ্যুত কনস্টেবল জাহিদ হাসান বলেন, পারিবারিক ঝামেলা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা কিংবা ডিউটিতে উপস্থিতি জটিলতার কারণে অনেককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। পরবর্তীকালে আদালত থেকে চাকরিচ্যুত সদস্যদের পক্ষে রায় আসলেও পুলিশ সদর দপ্তর তাদের নিয়োগ দিচ্ছে না। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চাকরি না থাকায় পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। অনেকে রাস্তায় হকারি করছেন। কেউ গাড়িতে-লঞ্চে ফেরি করে পানি বিক্রি করছেন। আর সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
চাকরিচ্যুত এসআই রহমত উল্লাহ নাওসাদ বলেন, ছয় মাস ধরে আমরা দাবি জানিয়ে এলেও বিষয়টির সুরাহা করা হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত পুনর্বহালের বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। ফলে সবাই আবারও রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, বেলা ১১টা থেকে পুলিশ সদর দপ্তরের সামনে জড়ো হতে থাকেন চাকরিচ্যুত পুলিশ কনস্টেবল, এসআই ও পরিদর্শকরা। তারা প্রথমে পুলিশ সদর দপ্তরের উল্টো দিকের ফুটপাতে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেন। এ সময় অনেকে ফুটপাতে শুয়ে পড়েন। বিষয়টি সুরাহা করতে এক ঘণ্টা সময় নেওয়া হলেও কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় দুপুর ২টায় পুলিশ সদর দপ্তরের সামনের রাস্তা অবরোধ করেন। তারা রাস্তায় শুয়ে ও বসে নানা ধরনের সেøাগান দেন। সড়ক অবস্থানের সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে আন্দোলনরত পুলিশ সদস্যদের চাকরি ফেরত পেতে আইন অনুযায়ী আসার আহ্বান জানান ডিআইজি ড. শোয়েব রিয়াজ আলম। বিকেলে তার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল আন্দোলনরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা শেষে তাদের এমন কথা বলেন তিনি। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা সবার সম্মতি নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এদিন সকাল ৯টা থেকে পুলিশ সদর দপ্তরের সামনে স্ত্রী-সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিক্ষোভ ও অবস্থান করবেন ভুক্তভোগীরা।
ডিআইজি শোয়েব রিয়াজের সঙ্গে আলোচনা শেষে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলনকারী একাধিক সদস্য বলেন, গত ৫ আগস্টের পর পুলিশ সদর দপ্তরের সামনে আন্দোলন শুরু করলে তখন তাদের আবেদন করতে বলা হয়েছিল। এতে পুনর্বহালের জন্য বারবার আবেদন করেন তারা। কিন্তু এখন তাদের আইন অনুযায়ী আসতে বলছেন।
তারা বলেন, আমাদের অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এখন নতুন করে হয়রানি করা হচ্ছে। আমরা আর কোনো কথা শুনতে চাই। এবার স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আমরা রাস্তায় নামব।
এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভের কারণে রাস্তার দুই পাশে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে বঙ্গবাজারসহ আশপাশের ব্যবসায়ী এবং সাধারণ নগরবাসীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বিকেল সাড়ে ৫টার পর আন্দোলনকারীরা রাস্তা ছেড়ে ফিরে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
ডিএমপির রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদ আলম বলেন, চাকরি ফিরে পাওয়ার জন্য চাকরিচ্যুত পুলিশ সদস্যরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। বিকেলে তারা রাস্তা ছেড়ে চলে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
