টঙ্গীর তুরাগ তীরে ইজতেমা ময়দান লাখ লাখ মুসল্লির পদভারে পরিপূর্ণ। আজ শুক্রবার থেকে তাবলিগ জামাত বাংলাদেশ শুরায়ি নেজামের ছয় দিনব্যাপী ৫৮তম বিশ্ব ইজতেমা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাদ মাগরিব ভারতের মাওলানা ইব্রাহিম দেওলার আমবয়ানের মাধ্যমে ইজতেমার কার্যক্রম শুরু হয়।
বুধবার (২৯ জানুয়ারি) রাতেই ইজতেমা ময়দানের বেশিরভাগ অংশ মুসল্লিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। বৃহস্পতিবারও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দল বেঁধে মুসল্লিরা আসেন ইজতেমা ময়দানে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ইজতেমা ময়দানে গিয়ে দেখা গেছে, বিভিন্ন খিত্তা অনুযায়ী অবস্থান নেওয়া মুসল্লিরা তাদের আমিরের দেওয়া দ্বীনের বয়ান শুনছেন। যদিও কেন্দ্রীয়ভাবে মূল বয়ান শুরু আজ বাদ ফজর থেকে। ইজতেমায় আসা সব মুসল্লি তাদের নিজ নিজ দলের আমিরের মাধ্যমে ইজতেমার যাবতীয় ইমান, আদব, আখলাক ও শৃঙ্খলা নিয়ে কথা বলেন। ইজতেমায় তাদের দলের সদস্যদের কার কী কাজ, কে কী দায়িত্ব পালন করবেন, তা ভাগ করে দেওয়া হয়।
বুধবার রাত থেকেই দেশ-বিদেশের মুসল্লিরা জামাতবদ্ধ হয়ে দলে দলে ইজতেমা মাঠের নির্ধারিত স্থানে (খিত্তায়) প্রয়োজনীয় মালামাল ও ব্যাগ নিয়ে অবস্থান করছেন। প্রথম পর্বে দুই ধাপে ছয় দিনব্যাপী বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব ২ ও ৫ ফেব্রুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে।
ইজতেমায় আসা মুসল্লিদের সুবিধার্থে এবারও গাজীপুর জেলা প্রশাসন, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস, জেলা সিভিল সার্জন, সিটি করপোরেশন, ডেসকো, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সমন্বয় করে ইজতেমা ময়দানের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এ ছাড়া ইজতেমায় অংশগ্রহণকারী মুসল্লিদের অজু, গোসলের জন্য সুপেয় খাবারের পানি সরবরাহ, রান্নার জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করে দেওয়া হয়েছে।
মুসল্লিদের বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগও নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছ। টঙ্গী আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে অতিরিক্ত শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া ইজতেমা ময়দানের পাশে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও সেবা সংস্থা বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবার জন্য অর্ধশতাধিক ক্যাম্প স্থাপন করেছে।
ইজতেমা মাঠের মুরব্বিরা জানান, তাবলিগ জামাতের উদ্যোগে প্রতি বছর বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। মাঠের সব কাজ করা হচ্ছে পরামর্শের মাধ্যমে। এখানে বিদ্যুৎ, পানি, প্যান্ডেল তৈরি, গ্যাস সরবরাহ প্রতিটি কাজই আলাদা আলাদা গ্রুপের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। বিশ্বের প্রায় সব মুসলিম দেশ থেকেই তাবলিগ জামাতের অনুসারী মুসলমানরা অংশ নেন। তারা এখানে তাবলিগ জামাতের শীর্ষ আলেমদের বয়ান শোনেন এবং ইসলামের দাওয়াতি কাজ বিশ্বব্যাপী পৌঁছে দেওয়ার জন্য জামাতবদ্ধ হয়ে বেরিয়ে যান।
বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের মিডিয়া সমন্বয়কারী হাবিবুল্লাহ রায়হান বলেন, বুধবার থেকে দেশি-বিদেশি মুসল্লিরা ময়দানে এসে ইজতেমায় যোগ দেওয়া শুরু করেন। বিদেশিরা ইজতেমা ময়দানের উত্তর-পশ্চিম পাশে তাদের জন্য উন্নত তাঁবুতে এসে অবস্থান নিচ্ছেন। পাশাপাশি একই সময়ে দেশের প্রায় সব জেলা থেকে লাখো মুসল্লি এসে ময়দানে নির্ধারিত খিত্তায় এসে হাজির হয়েছেন।
তিনি আরও জানান, আল্লাহর অশেষ রহমতে সভাপতিহীন বিশ্ব ইজতেমার এত বড় আয়োজন প্রতি বছরই অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করা হয়। এজন্য আমাদের কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পুরো ইজতেমা ময়দানকে মুরুব্বিদের পরামর্শে সাজানো হয়। ময়দানে জেলাওয়ারি মুসল্লিদের অবস্থান, রান্নাবান্না করার স্থান, টয়লেট, অজুখানা, গোসলখানা সবই সুনির্দিষ্ট করা থাকে।
বৃহত্তম জুমার নামাজ
আজ দেশের সর্ববৃহৎ জুমার নামাজ হবে ইজতেমা ময়দানে। এতে প্রায় ১০ লাখ মুসল্লি এক জামাতে শরিক হয়ে নামাজ আদায় করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাজধানী ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন উপজেলা এবং আশপাশের জেলা থেকে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি এ জুমার নামাজে শরিক হবেন। বাংলাদেশের কাকরাইল মসজিদের ইমাম মাওলানা জুবায়ের জুমার নামাজের ইমামতি করবেন বলে জানা গেছে।
টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই
র্যাবের মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান বলেছেন, টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে নিরাপত্তাজনিত কোনো ঝুঁকি নেই। দু’পক্ষের অন্তর্কোন্দল ছাড়া আপাতত অন্য কোনো ঝুঁকি আমরা দেখছি না। ময়দানের সার্বিক নিরাপত্তায় যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার দরকার তার সবই এরই মধ্যে নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা ময়দান পরিদর্শন শেষে র্যাবের কন্ট্রোলরুমে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় র্যাব-১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ জাহিদুল করিমসহ র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এএসএম সফিউল আজম জানান, ইজতেমা মাঠের অভ্যন্তরে বেশ কিছু রাস্তা তৈরি ও প্রশস্ত করা হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার জন্য প্যান্ডেল, ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিদিন বিশ্ব ইজতেমায় আসা মুসল্লিদের অজু, গোসল, পয়ঃনিষ্কাশন ও সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য ইজতেমা মাঠে স্থাপিত গভীর নলকূপ দ্বারা পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ ও দিনরাত বর্জ্য অপসারণ করা হবে। মশা নিয়ন্ত্রণে ইজতেমা মাঠের চাহিদা অনুযায়ী ফগার মেশিনও দেওয়া হয়েছে। বৈদ্যুতিক কেবল ও লাইট সরবরাহ করা হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্তসংখ্যক লোকবল ও যানবাহন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এবার ইজতেমায় আসা বিদেশি মুসল্লিদের বাসস্থান নির্মাণের জন্য দেড় হাজার বান্ডেল ঢেউটিন প্রদান করা হয়েছে।
ইজতেমায় ১৪টি বিশেষ ট্রেন
প্রতি বছরের মতো এবারও বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ১৪টি বিশেষ ট্রেন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ট্রেনগুলো ইজতেমা চলাকালে মুসল্লিদের বহন করবে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট কার্যালয় থেকে দেওয়া চিঠিতে বিষয়টি জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শুক্রবার জুমা স্পেশাল নামে এক জোড়া ট্রেন চালানো হবে। জুমা স্পেশাল-১ ঢাকা থেকে সকাল সাড়ে ৯টায় ছেড়ে টঙ্গী পৌঁছাবে সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে। জুমা স্পেশাল-২ বিকেল ৩টায় টঙ্গী স্টেশন থেকে ছেড়ে ঢাকায় পৌঁছাবে বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে।
বিশেষ ট্রেন হিসেবে জামালপুর ও টাঙ্গাইল থেকে আগামী শনিবার (১ ফেব্রুয়ারি) দুটি ট্রেন চালানো হবে। এর মধ্যে প্রথম ট্রেনটি জামালপুর থেকে সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে টঙ্গী স্টেশনে পৌঁছাবে দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে। দ্বিতীয় ট্রেনটি টাঙ্গাইল থেকে দুপুর ১২টায় ছেড়ে টঙ্গী পৌঁছাবে দুপুর ১টা ২০ মিনিটে। এ ছাড়া আখেরি মোনাজাতের দিন রবিবার পরিচালনা করা হবে ১০টি ট্রেন। এর মধ্যে ঢাকা-টঙ্গী স্পেশাল-১ ঢাকা ছাড়বে ভোররাত ৪টা ৪৫ মিনিটে, ঢাকা-টঙ্গী স্পেশাল-২ ঢাকা ছাড়বে ভোররাত ৫টায়, ঢাকা-টঙ্গী স্পেশাল-৩ ঢাকা ছাড়বে ভোররাত ৫টা ২৫ মিনিটে, ঢাকা-টঙ্গী স্পেশাল-৪।
অন্যদিকে টঙ্গী স্টেশন থেকে ফেরার পথে টঙ্গী-ঢাকা স্পেশাল-১ টঙ্গী স্টেশন ছাড়বে সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে, টঙ্গী-ঢাকা স্পেশাল-২ টঙ্গী স্টেশন ছাড়বে সকাল ৯টা ৪২ মিনিটে, টঙ্গী-ঢাকা স্পেশাল-৩ টঙ্গী স্টেশন ছাড়বে সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে, টঙ্গী-ঢাকা স্পেশাল-৪ টঙ্গী স্টেশন ছাড়বে বেলা ১১টা ৭ মিনিটে, টঙ্গী-ময়মনসিংহ স্পেশাল-১ টঙ্গী স্টেশন ছাড়বে দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে এবং সর্বশেষ টঙ্গী-টাঙ্গাইল স্পেশাল-২ টঙ্গী স্টেশন ছাড়বে দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে।
