ভোগান্তি দিয়ে সরলেন শিক্ষার্থীরা

দাবি পূরণে তিতুমীর শিক্ষার্থীদের ৭ দিনের আলটিমেটাম

বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের যৌক্তিকতা নেই : শিক্ষা মন্ত্রণালয়

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৪:৫৯ এএম

নিজেদের কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর দাবিতে দফায় দফায় আন্দোলন করছেন রাজধানীর সরকারি তিতুমীর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষার্থীরা। এবারের দফায় গতকাল সোমবার রাত পর্যন্ত টানা পাঁচ দিন রাস্তায় অবস্থান করেন কলেজটির কয়েকশ শিক্ষার্থী। ‘বারাসাত ব্যারিকেড টু নর্থ সিটি’ নামে গুলশান মোড় এলাকায় সড়ক অবরোধের পর গতকাল বিকেল থেকে মহাখালী রেলগেট অবরোধ করেন তারা। এতে ঢাকা-টঙ্গী-ঢাকা সেকশনে ট্রেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে রাত সাড়ে ৯টার দিকে দাবি পূরণের জন্য আলটিমেটাম দিয়ে সাত দিনের জন্য আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিত করেন তিতুমীর শিক্ষার্থীরা। এ সময়ের মধ্যে দাবি মেনে নেওয়া না হলে তারা ফের রাস্তায় নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

আগামী ৭ দিনের মধ্যে ‘তিতুমীর বিশ্ববিদ্যালয়’ ইস্যুতে সরকার পদক্ষেপ নেবে এমন আশ্বাসে আন্দোলন প্রত্যাহার করেন কলেজটির শিক্ষার্থীরা। রাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. নুরুজ্জামান এবং তিতুমীর কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক শিপ্রা রানী মন্ডলের উপস্থিতিতে তারা আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। এ সময় অধ্যক্ষ অনশনরত শিক্ষার্থীদের প্যাকেটজাত আমের জুস পান করান। আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণার পর মহাখালী এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

এদিকে সড়কে নেমে তিতুমীর শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কর্মসূচির কারণে গত কয়েক দিন রাজধানীবাসীকে পোহাতে হচ্ছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। এতে শিক্ষার্থীদের প্রতি বিভিন্নভাবে আক্রোশ প্রকাশ করতে দেখা গেছে নগরবাসীকে।

তিতুমীর শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে ঢাকা-টঙ্গী-ঢাকা সেকশনে বিকেল ৩টা ৪০ মিনিট থেকে গতকাল রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশনমাস্টার মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় এখনো দিনের ১৮টি আন্তঃনগর ট্রেনের ঢাকা থেকে ছাড়ার শিডিউল রয়েছে। এসব ট্রেনের মধ্যে ১৭টি ঢাকা থেকে ছাড়তে বিলম্ব হতে পারে।’

এর আগে বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে রেলপথ অবরোধ করেন। তাৎক্ষণিকভাবে উপস্থিত রেলকর্মীরা লাল পতাকা দেখিয়ে রেললাইন ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যান। পরে লাইনে উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনের চালক লাল পতাকা দেখে ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে মহাখালী রেলগেটের কাছাকাছি জায়গায় ট্রেনটি থামাতে সক্ষম হন।

ট্রেনটির লোকোমাস্টার (চালক) লতিফ বলেন, ‘ট্রেন আটকে দেওয়ার ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবেই ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে আমরা জানিয়েছি। তারা আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন ট্রেনটি পেছনের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সে অনুযায়ী এখন ট্রেন পেছানো হচ্ছে। এটি সম্ভবত তেজগাঁও রেলস্টেশনে রাখা হবে। বিষয়টি আমি নিশ্চিত নই। আমাকে যে জায়গায় সিগন্যাল দেওয়া হবে, সেখানেই থামব।’

গণভোগান্তিতে গণআক্রোশ : তিতুমীর শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে মহাখালী, বনানী ও গুলশান এলাকায় সড়কে বাস চলাচল না করায় ভোগান্তিতে পড়তে হয় নগরবাসী এবং চিকিৎসাসহ বিভিন্ন কাজে ঢাকার বাইরে থেকে আসা মানুষকে। তেমনই দুজন ভুক্তভোগী রজ্জব আলী ও রাশেদা বেগম দম্পতি। রাশেদা বেগমের বাঁ হাত কনুইয়ের নিচে ব্যান্ডেজে মোড়ানো ছিল। সেই হাত সাবধানে ধরে নিয়ে ধীর গতিতে হাঁটছিলেন তারা। অসুস্থ শরীরে দীর্ঘ পথ হেঁটে তারা ক্লান্ত ও ত্যক্তবিরক্ত। তিতুমীর কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে ভোগান্তির বিষয়ে রজ্জব আলী বলেন, ‘কোনো গাড়ি নেই। রিকশাভাড়া তিন-চার গুণ বেশি চায়। হাঁটা ছাড়া কোনো গতি নেই। তাদের (তিতুমীর শিক্ষার্থী) তো মানুষের কষ্ট বোঝা উচিত। তারাই যদি মানুষের কষ্ট না বোঝে আর কারা বুঝবে।’

মহাখালী থেকে গুলশানের রাস্তায় গতকাল যানবাহন সরাসরি না চললেও মহাখালী থেকে তিতুমীর কলেজের সামনে পর্যন্ত এবং তিতুমীর কলেজের পর থেকে আবার গুলশান পর্যন্ত রিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশা চলতে দেখা গেছে। কিন্তু যাত্রীদের ভাড়া গুনতে হচ্ছিল দ্বিগুণের বেশি। মহাখালী থেকে তিতুমীর কলেজের সামনে পর্যন্ত রিকশায় জনপ্রতি ৩০ টাকা নেওয়া হয়। সে হিসেবে দুজন যাত্রীর ভাড়া ৬০ টাকা। স্বাভাবিক সময়ে এই ভাড়ায় গুলশানে যাওয়া যায়। ভাড়া নিয়ে রিকশাচালক ও সাধারণ মানুষদের বাগ্বিতণ্ডায় জড়াতে দেখা গেছে। এ সময় শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধে বিরক্ত হয়ে কেউ কেউ গালমন্দও করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবির যৌক্তিকতা নিয়েও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অনেককেই তর্কে জড়াতে দেখা গেছে। গুলশান-১ নম্বর এলাকায় এই প্রতিবেদকের কাছে নিজের ক্ষোভের কথা জানান বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী শাহজাহান উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘যখন মন চাইছে, রাস্তায় নেমে সড়ক অবরোধ করছে। প্রশাসনও কিছু করছে না। যত কষ্ট, সব সাধারণ মানুষের। আর দুর্ভোগের সুযোগে রিকশাচালকরা ভাড়া বেশি নিচ্ছেন। সরকার কি মানুষের দুর্ভোগ দেখে না?’

সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভের আঁচ পাওয়া গেছে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর কথাতেও। তিনি গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা তো লোকজনকে অতিষ্ঠ করে ফেলছে। দিনের পর দিন কিন্তু তাদের এ দাবি-দাওয়া বেড়েই চলছে। এটার পেছনে কারা জড়িত, সেটাও কিন্তু আপনারা জানেন, এটা কিন্তু আপনারা প্রচার করেন না।’

গতকাল সকাল থেকেই তিতুমীর কলেজের মূল ফটকের সামনে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে মিছিল করেন দফায় দফায়। এ সময় শিক্ষার্থীদের ‘অ্যাকশন টু অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘তিতুমীর আসছে, রাজপথ কাঁপছে’, ‘টিসি না টিউই, টিউই টিউই’, ‘আমার ভাই অনশনে, প্রশাসন কী করে’, ‘প্রশাসনের সিন্ডিকেট, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য, চলবে না চলবে না’, ‘অধ্যক্ষের সিন্ডিকেট, মানি না মানব না’, ‘আমাদের সংগ্রাম, চলছে চলবে’ ইত্যাদি স্লোগান এবং বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করতে দেখা গেছে। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সতর্ক অবস্থানে ছিল পুলিশ। মহাখালীর আমতলী মোড় ও রেলগেট এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। একই সঙ্গে পাশেই পুলিশের একটি জলকামানও প্রস্তুত ছিল। এ ছাড়া রেললাইন অবরোধের কারণে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিকেল ৪টার দিকে মহাখালী এলাকায় চার প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়।

শিক্ষার্থীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান তথ্য উপদেষ্টার : সরকারি তিতুমীর কলেজের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে সরস্বতী পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই যেকোনো যৌক্তিক দাবির প্রতি ইতিবাচক এবং সংবেদনশীল। চাইলেই এই মুহূর্তে হয়তো অনেক কিছু করা সম্ভব না, তবে আশা করি, সবার জন্য ভালো কিছু হবে। তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীদের ধৈর্যধারণ করতে হবে। তাদের শিক্ষাজীবন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে এ সরকার দায়িত্বশীল। এই মুহূর্তে হয়তো অনেক কিছু করা সম্ভব নয়। এজন্য জনভোগান্তি যেন না হয়, সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। আশা করি ভালো কিছু হবে।’

যদিও সরকারি তিতুমীর কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের এই আন্দোলনের কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেজন্য আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্যধারণের অনুরোধ করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সরকারি তিতুমীর কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবিতে চলমান আন্দোলনের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তথা সরকার অবহিত রয়েছে। এই মর্মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো যাচ্ছে যে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাতটি কলেজের সমন্বয়ে একটি পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের লক্ষ্যে ইউজিসির চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি তিতুমীর কলেজের বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।’ ইতিমধ্যে এই কমিটি তিতুমীর কলেজসহ সাতটি কলেজের শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। এই কলেজগুলোর শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা ও মানোন্নয়নই বর্তমানে সরকারের প্রধান লক্ষ্য এবং এ ক্ষেত্রে করণীয় সব বিকল্পই সরকারের বিবেচনায় থাকবে। এমনটা উল্লেখ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘এ অবস্থায় তিতুমীর কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের ঘোষণা আদায়ে সময় বেঁধে দিয়ে আন্দোলন করার যৌক্তিকতা নেই। সেজন্য আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্যধারণ করার অনুরোধ করা হলো। জনজীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয় বা কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়, এমন কর্মসূচি থেকে বিরত থাকার জন্য আন্দোলনকারীদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত