একই দিনে জন্ম তবু ভিন্ন দুই ভাগ্য, রোনালদো আর নেইমারের গল্প

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০৬ এএম

ফুটবল আকাশের দুই নক্ষত্র, একসঙ্গে জন্মেছিলেন ৫ ফেব্রুয়ারির ভোরে। একজন স্বপ্নকে রূপ দিয়েছেন কিংবদন্তির ছাঁচে, অন্যজন স্বপ্নের মোহে ডুবে হারিয়ে গেছেন পথে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও নেইমার— আজ তাদের জন্মদিন। পর্তুগিজ মহাতারকা পা রাখছেন ৪০ বছরে আর ব্রাজিলিয়ানের ৩৩। তবে একই দিনে জন্ম হলেও কত আলাদা দুজনের পথচলা!

রোনালদো ও নেইমার—ফুটবলের দুই মহাতারকা। একজন পরিণত হয়েছেন পরিশ্রমের প্রতিমূর্তিতে, অন্যজন প্রতিভার এক স্বতঃস্ফূর্ত ঝলকে। দুজনই এক সময় ইউরোপ শাসন করেছেন, দুজনই পরে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছেন রেকর্ড বেতনে। তবে জীবন ও ক্যারিয়ারের দৌড়ে দুজনের ভাগ্য ভিন্ন পথে মোড় নিয়েছে। রোনালদো পেয়েছেন প্রায় সবকিছু, কিন্তু তবুও তার চোখে এক অপূর্ণতার খরা। আর নেইমার সেই পূর্ণতার স্বাদ পেতে ফিরে গেছেন শুরুতে—শৈশবের ক্লাব সান্তোসে, বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে।

রোনালদো: অর্জনের পর্বতমালা, কিন্তু এক শিখরে পা রাখা হয়নি

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ক্যারিয়ারের সাফল্যের মুকুট এতটাই সমৃদ্ধ যে, তা ফুটবল ইতিহাসে কালজয়ী হয়ে থাকবে। পাঁচটি ব্যালন ডি’অর, পাঁচটি চ্যাম্পিয়নস লিগ, ইউরো জয়ের গৌরব, উয়েফা নেশন্স লিগসহ একাধিক ক্লাব ও ব্যক্তিগত শিরোপায় ভরা তার ঝুলি। রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, জুভেন্টাস—সবখানেই তিনি সফল। আল নাসরের হয়ে সৌদিতে গেলেও নিজের ফিটনেস ও গোলক্ষুধায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। তার লক্ষ্য এখন ক্যারিয়ারে ১০০০ গোল পূর্ণ করা, যা ফুটবলে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হতে পারে।

তবে এত সাফল্যের মাঝেও এক অপূর্ণতা রোনালদোর হৃদয়ে রয়ে গেছে—বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নপূরণ না হওয়া। ইউরো ও নেশন্স লিগ এনে দিলেও দেশের হয়ে বিশ্বকাপ জিততে পারেননি তিনি। ২০০৬ থেকে ২০২২—প্রতিটি বিশ্বকাপেই ছিলেন পর্তুগালের তুরুপের তাস, কিন্তু দল নিয়ে যেতে পারেননি শেষ শিখরে। সেই এক অতৃপ্তি নিয়েই হয়তো ফুটবলকে বিদায় বলবেন এই মহাতারকা।

সৌদি আরবে রেকর্ড বেতন ও হাজার গোলের স্বপ্ন

২০২৩ সালে ইউরোপ ছেড়ে সৌদি আরবে আসার মধ্য দিয়ে রোনালদো দেখিয়ে দেন, ফুটবলের বাণিজ্যিকীকরণে তিনি কতটা বড় নিয়ামক। আল নাসরের সঙ্গে করা তার চুক্তি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ধনী চুক্তি—প্রতি বছরে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ইউরো পারিশ্রমিক! আরব ক্লাবগুলোর প্রতি ইউরোপিয়ান ফুটবলারদের আকৃষ্ট করার পেছনে তিনিই ছিলেন পথপ্রদর্শক। তবে সৌদিতে গিয়ে রোনালদোর হাতে উঠেছে শুধু আরব ক্লাব কাপ, বড় কোনো প্রতিযোগিতার শিরোপা নয়। কিন্তু তার লক্ষ্য এখন ব্যক্তিগত—১ হাজার গোলের মাইলফলক ছোঁয়া, যাতে তাকে ছাড়িয়ে যেতে হয়তো আর কেউ কখনো পারবে না।

নেইমার: প্রতিশ্রুতির বিস্ফোরণ, কিন্তু অতৃপ্তি বেশি

নেইমারের ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল এক মহাতারকা হওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। সান্তোসে ১৯ বছর বয়সেই কোপা লিবের্তাদোরেস জিতে বুঝিয়ে দেন, তিনি ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের নতুন রাজপুত্র। এরপর বার্সেলোনায় গড়ে তোলেন এক অবিস্মরণীয় আক্রমণত্রয়ী—মেসি, সুয়ারেজ ও নেইমার (এমএসএন)। কাতালান ক্লাবের হয়ে ২০১৫ সালে জেতেন চ্যাম্পিয়নস লিগ, যা তার ক্যারিয়ারের সেরা অর্জন।

কিন্তু এরপর থেকেই শুরু হয় ব্যর্থতার অধ্যায়। পিএসজিতে গেলেও ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্ব স্পর্শ করতে পারেননি। চোটের ধাক্কায় বিশ্বকাপেও নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি। ২০২৩ সালে আল হিলালে গিয়ে রেকর্ড বেতনের চুক্তি করলেও মাত্র ৭ ম্যাচ খেলেই ছিটকে যান ইনজুরিতে। চুক্তির দেড় বছর না যেতেই সম্পর্কের ইতি টেনে ফিরেছেন ব্রাজিলে, সান্তোসে।

বিশ্বকাপ জয়ের জন্য চাপমুক্ত নেইমার

নেইমার জানেন, তার ক্যারিয়ারে একটাই অপূর্ণতা—ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ এনে দিতে না পারা। ২০১৪ সালে ইনজুরিতে পড়ে, ২০১৮-২০২২ সালে ব্যর্থ হয়ে এখনও স্বপ্ন দেখছেন তিনি। মেসির দেখানো পথে হাঁটতে গিয়ে নিজ দেশের ক্লাবে ফিরে চাপমুক্ত জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ, এখানে তিনি খেলবেন শুধুই বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুতি নিতে, ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের চাপে জর্জরিত না হয়ে।

কে পেলেন সবকিছু, কে পেলেন না?

রোনালদো তার ক্যারিয়ারের প্রায় সব কিছুই পেয়েছেন, কিন্তু বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন রয়ে গেছে অধরা। নেইমার পেরেছেন প্রতিভার ঝলক দেখাতে, কিন্তু তার ক্যারিয়ারকে সাফল্যে ভরিয়ে দিতে পারেননি। দুজনেরই জন্মদিন ৫ ফেব্রুয়ারি, কিন্তু ভাগ্য যেন তাদের জন্য দুই ভিন্ন গল্প লিখেছে—একজন অতৃপ্ত হয়েও প্রায় সব পেয়েছেন, আরেকজন সব পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন, একটি বিশ্বকাপ হাতে ওঠার আশায়।

দুজনই ফুটবলকে যা দেওয়ার ছিল, তা কি দিতে পেরেছেন? রোনালদোর ক্ষেত্রে উত্তর হ্যাঁ। তিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন, যা সম্ভব সবই করেছেন। তবে নেইমারের ক্ষেত্রে উত্তরটা ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। প্রতিভার বিস্ফোরণ ঘটিয়েও তিনি কি সত্যিই ফুটবলকে তার সর্বোচ্চটা দিতে পেরেছেন?

সময়ই বলবে, শেষ বাঁশি বাজার আগে নেইমার হারানো অধ্যায়কে নতুন করে লিখতে পারেন কি না!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত