ম্যাটস শিক্ষার্থীদের পুলিশের লাঠিপেটা, আহত ১৭

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৭:৩০ এএম

চার দফা দাবিতে লংমার্চ নিয়ে সচিবালয় অভিমুখে রওনা হওয়া মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (ম্যাটস) শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করেছে পুলিশ। গতকাল রবিবার বিকেলে শিক্ষা ভবনের সামনে এই ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১৭ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।

এর আগে শাহবাগ থেকে সচিবালয় অভিমুখে রওনা দেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষা ভবনের সামনে গেলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। পরে সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে পুলিশ তাদের লাঠিচার্জ করে। পুলিশের তাড়া খেয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা কদম ফোয়ারা ও মৎস্য ভবন হয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের দিকে চলে যান।

ঢাকা মেডিকেল সূত্রে জানা যায়, রবিবার বিকেল সাড়ে ৫টায় আহত শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। আহতরা হলেন জাহিদুল হাসান নাইম (২১), আরাফাত ইসলাম (২১), নাইম (২২), সিহাব আহমেদ (২০), মো. আমানুল্লাহ (২১), সুমাইয়া খাতুন (২০), রায়হান গাজি (২১), তাহমিনা আক্তার (২০), রাসেল (২৩), জাহিদুল ইসলাম (২২), এরশাদুল হক (৩০), মেহেরাব হোসেন (২০), সায়মা আক্তার (২১), সোহাগ হোসেন (২২), ইশরাত জাহান (২০), আসিফুল ইসলাম (২৩), কাকন আক্তার (২৩)। ঢামেক হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক জানান, সচিবালয়ের সামনে থেকে আহত অবস্থায় ১৭ শিক্ষার্থীকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে আনা হয়েছে। জরুরি বিভাগে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়।

অনতিবিলম্বে ১০ম গ্রেডে শূন্য পদে নিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে নতুন পদ সৃজন, কোর্স কারিকুলাম সংশোধন ও প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে মেডিকেল ইনস্টিটিউট করা, প্রস্তাবিত ‘অ্যালাইড-হেলথ প্রফেশনাল বোর্ড’ বাতিল করে স্বতন্ত্র ‘মেডিকেল এডুকেশন বোর্ড অব বাংলাদেশ’ বোর্ড গঠন এবং আন্তর্জাতিক মানদ- ও বিএমঅ্যান্ডডিসি স্বীকৃত ক্লিনিক্যাল বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ প্রদান করার দাবিতে দীর্ঘ তিন মাস একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রেখে আন্দোলন করছেন ম্যাটস শিক্ষার্থীরা। গত ২২ জানুয়ারি শাহবাগে সড়ক অবরোধ করেন তারা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে সাত দিনের মধ্যে দাবি পূরণের আশ্বাসের পরও তা বস্তবায়ন না হওয়ায় গতকাল সকাল ১১টায় আবারও শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনের সড়ক অবরোধ করেন তারা। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার রাস্তাটি বন্ধ হয়ে যায়।

দুপুর ২টায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি পাঠানোর প্রস্তাব নিয়ে শাহবাগে আসেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টার ব্যক্তিগত সহকারী তুহিন ফারাবী। এ সময় তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবির আলোকে শূন্য পদে নিয়োগের সার্কুলারের বিষয়ে আগামীকাল বা পরশুই সার্কুলার দেওয়া হবে। মোট ৮০০ শূন্য পদে ক্রমান্বয়ে নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের দশম গ্রেডের দাবির বিষয়টি ইতিমধ্যে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। শাহবাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আন্দোলনকে ঘিরে কোনো কুচক্রী মহল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে বলেও জানান তুহিন ফারাবী।

পরে বিকেল ৩টায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলতে শিক্ষার্থীদের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল স্বাস্থ্য উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা তুহিন ফারাবীর সঙ্গে সচিবালয়ে যান। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলতে থাকে। প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রাখেন তারা।

মৌলভীবাজার থেকে আসা ম্যাটস শিক্ষার্থী মো. মোস্তাকিম মিয়া বলেন, চার দফা দাবিতে এর আগে গত ২২ জানুয়ারি শাহবাগে সড়ক অবরোধ করেছি। সে সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে দাবি পূরণের আশ্বাস পেয়ে অবরোধ তুলেছি। কিন্তু দাবি আর পূরণ হয়নি। চট্টগ্রাম থেকে আগত ম্যাটস শিক্ষার্থী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে লিখিত আশ্বাস দিয়ে বলা হয়েছে, সাত দিনে দাবি পূরণ হবে। কিন্তু এরপর থেকে আমাদের কোনো প্রতিনিধি নানা চেষ্টা করেও মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করতে পারেননি।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে সচিবালয় অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। শাহবাগে পুলিশ ব্যারিকেড ভেঙে আগাতে থাকেন তারা। এ সময় পুলিশ তাদের বাধা দিলেও কোনো বলপ্রয়োগ করেনি। মিছিলটি শাহবাগ, মৎস্য ভবন হয়ে শিক্ষা ভবন মোড়ে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের ধাক্কাধাক্কির এক পর্যায়ে পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শিক্ষার্থীরা পুলিশি বাধা ও ব্যারিকেড ভেঙে সচিবালয়ের সামনে যেতে চাইলে শিক্ষা ভবনের সামনে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে হাতাহাতি হয়। এরপর লাঠিচার্জ শুরু করে পুলিশ। এ সময় সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দও শোনা যায়। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. মাসুদ আলম গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, ম্যাটস শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সচিবালয়ে আলোচনা চলাকালেই শাহবাগে থাকা শিক্ষার্থীরা সচিবালয়ের দিকে মিছিল নিয়ে আসেন। শিক্ষা ভবনের সামনে এলে তাদের পুলিশ বাধা দেয়। পরে হাতাহাতির এক পর্যায়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করা হয়।

এদিকে পুলিশের ধাওয়ার পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এসে অবস্থান নেন। শিক্ষার্থীরা জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের ফেরার অপেক্ষায় আছেন তারা। প্রতিনিধিরা ফিরলে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করবেন বলেও জানান।

দাবি আদায়ে আজ থেকে আমরণ অনশন : চার দফা দাবি আদায়ে নতুন কর্মসূচি দিয়েছেন ম্যাটস শিক্ষার্থীরা। কর্মসূচি অনুযায়ী আজ সোমবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন তারা। এর মধ্যে দাবি আদায় না হলে দুপুর থেকে একযোগে আমরণ অনশনে যাবেন। গতকাল রাতে রাজু ভাস্কর্য এলাকায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন সাধারণ ম্যাটস শিক্ষার্থী ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মুজাহিদুল ইসলাম।

এ সময় তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আমাদের নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে তিন দিন সময় নিয়েছে। তবে আমাদের অন্য তিনটি দাবির বিষয়ে কোনো সুরাহা দেয়নি। কোনো নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়নি। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমাদের অবস্থান কর্মসূচি থেকে সরে যাব না। আমরা রাতেও (গতকাল রাতে) শহীদ মিনারে অবস্থান করব এবং আগামীকাল (আজ) দুপুর ১২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করব। যদি এই সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হয় তাহলে আমরা আমরণ অনশনে যাব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত