সংস্কারে ঐকমত্য শেষে অতিদ্রুত নির্বাচনের আশা করছে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল। অবশ্য কিছু রাজনৈতিক দল বলছে, আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার তার পরে নির্বাচন। এছাড়া জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে কিছুটা দ্বিমত রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। তবে জুলাই গণহত্যার দ্রুত বিচার এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধে সব রাজনৈতিক দল একমত পোষণ করেছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমি মিলনায়তনে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বৈঠকে এসব আলোচনা হয়।
বিকাল ৩টায় শুরু হয়ে বৈঠকটি চলে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত। এতে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীসহ ২৬টি রাজনৈতিক দল ও জোটের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটে থাকা কোনো দল এবং জাতীয় পার্টিকে এই বৈঠকে ডাকা হয়নি।
ঐকমত্য শেষে ‘অতিদ্রুত’ নির্বাচনের আশা বিএনপির : সংস্কার বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি করে অতিদ্রুত জাতীয় নির্বাচন হবে- এমন প্রত্যাশার কথা আবারও তুলে ধরেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর তিন ঘণ্টার বেশি সময়ের যৌথ সভা শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।
বৈঠক থেকে বেরিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ঐকমত্য কমিশনের প্রথম সভায় প্রধান উপদেষ্টা সংস্কার কমিশনগুলোর প্রতিবেদন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিটির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করার কথা বলেছেন। এরপর একটা ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে। সেটাই বৈঠকের মূল কথা।’
তিনি বলেন, ‘আমরা (বিএনপি) আশা করি যে, খুব দ্রুত এই সংস্কারের যে ন্যূনতম ঐকমত্য তৈরি হবে এবং সেটার ওপরে ভিত্তি করে অতিদ্রুত জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
জাতীয় নির্বাচন আগে না স্থানীয় সরকার নির্বাচন- এমন প্রশ্নের উত্তরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমরা পরিষ্কার বলেছি যে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন সবার আগে হতে হবে। তারপরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আজ শুধুমাত্র প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে, বলতে পারেন আলোচনাটা ছিল পরিচিতিমূলক। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিভিন্ন কথা বলেছে, সেটা ছিল তাদের নিজস্ব মতামত। একেবারে পজেটিভ কনস্ট্রাকটিভ কোনো আলোচনা আজ হয়নি, কারণ সুযোগও ছিল না। আজ পরিচিতির একটা ব্যাপার ছিল আরকি।’
বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব দলটির ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে দেন। তার সঙ্গে ছিলেন জমির উদ্দিন সরকার, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সালাহ উদ্দিন আহমেদ ও হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চায় না বিজেপি : জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের পর বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে কিছু কথা ছিল- স্থানীয় সরকার নির্বাচন আমরা আগে চাই না। আর কোনো সংস্কার যেন নির্বাচনকে বিলম্বিত না করে, সে বিষয়েও বলেছি।’
জাতীয় নির্বাচন আগে দেওয়ার যুক্তি হিসেবে তরুণ এই নেতা বলেন, ‘অনেকেই বলেছেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা হোক। আবার অনেকে চেয়েছেন স্থানীয় নির্বাচন যেন আগে হয়। তবে আমরা মনে করি, সাড়ে ৪ হাজার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আয়োজন অনেক সময়সাপেক্ষ। পাশাপাশি স্থানীয় নির্বাচনে সংঘাতের সংখ্যা এবং প্রাণহানিও অনেক বেশি হয়। তাই আমরা চাই, এসব কারণে যেন নির্বাচন আয়োজনে দেরি না হয়। সে জন্য স্থানীয় নির্বাচনের আগে জাতীয় নির্বাচনের দাবি জানিয়েছি।’
বৈঠকে ফ্যাসিস্টদের ষড়যন্ত্র রুখে দিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য ধরে রাখার বিষয়ে কথা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিজেপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘ফ্যাসিস্টদের যে ষড়যন্ত্র ছিল, জাতিসংঘের প্রতিবেদনের পর তা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। আমরা সরকারের পাশে আছি। আমি মনে করি এটা জনগণের সরকার।’
সংস্কারে ঐকমত্যে পৌঁছানোর পর নির্বাচন চায় জামায়াত : প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছানোর পরই জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে বৈঠকে মত দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বৈঠক শেষে বেরিয়ে দলটির কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সাংবাদিকদের এ কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছি, যে সংস্কার প্রয়োজন, সে বিষয়ে সবাই ঐকমত্য হলে যথাশিগগির সম্ভব নির্বাচন হবে। প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে তারা জাতীয় নির্বাচন করবেন। আমরা দেখছি, কীভাবে সেটা এগিয়ে যায়।’
ডা. তাহের বলেন, ‘সব ইতিবাচক সিদ্ধান্তকে জামায়াতে ইসলামী স্বাগত জানাবে। সংস্কার কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলো আসার পর যথাশিগগির যাতে নির্বাচন হয়, সেই প্রস্তুতি গ্রহণের কথা বলেছি। আলোচনার মূল ছিল এটিই। আর তারা সংস্কার প্রস্তাবের বই দেওয়ার পর সেটা পর্যালোচনা করে জামায়াতে ইসলামী ও সরকারের আলাদা মতবিনিময় হবে। সেখানে আমরা আমাদের মূল সিদ্ধান্ত জানাব।’
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলে ছিলেন দলের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য মশিউল আলম।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি : জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রথম বৈঠকে বিষয়ভিত্তিক কোনো আলোচনা হয়নি উল্লেখ করে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের এটি একটি উদ্বোধনী সভার মতো।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী এ সরকারের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর যেমন সমর্থন রয়েছে, তেমনি দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থনও রয়েছে। ঐকমত্য কমিশনের প্রথম বৈঠকে উপস্থিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এ কথা বলেছেন।
সাইফুল হক বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা পরিষ্কারভাবে বলেছেন, আলাপ-আলোচনা করে, একটি বোঝাপড়া তৈরি করে যে প্রশ্নে আমরা একমত হতে পারব, সেই ভিত্তিতে একটি জাতীয় সনদ তৈরির চেষ্টা হবে। জাতীয় সনদের ভিত্তিতে পরে জাতীয় নির্বাচন বা সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে আলোচনা হবে। আরেকটা বিষয় অধ্যাপক ইউনূস পরিষ্কার করে বলেছেন, ভারতের বাংলাদেশবিরোধী নীতি একটা বিপর্যয়ে ফেলছে। সর্বশেষ ট্রাম্পের কাছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী দৌড়ঝাঁপ করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তার কোনো নালিশ ট্রাম্প প্রশাসন আমলে নেয়নি।’
সাংবাদিকদের তিনি আরও বলেন, ‘বৈঠকে আমাদের দিক থেকে সরকারের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা উল্লেখ করেছি। একটি হচ্ছে (জুলাই-আগস্টের) গণহত্যার বিচার, প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন এবং এ বছরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন করে দেশকে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার দিকে নিয়ে যাওয়া।’
যে নৌকা ডুবে গেছে সে নৌকা আর ভাসবে না : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে একটা বিষয় স্পষ্ট করে বলেছি, যে নৌকা ডুবে গেছে সে নৌকা বাংলাদেশে আর কখনোই ভাসবে না। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতা জানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এখন অপ্রাসঙ্গিক।’
ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক শেষে সন্ধায় ফরেন সার্ভিস একাডেমির সামনে সাংবাদিকদের তিনি আরও বলেন, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী যেসব রাজনৈতিক দল ছিল প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে তারা সবাই এসেছিল। সবাই একটা জায়গায় একমতে পৌঁছেছি যে, পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ অপ্রাসঙ্গিক। আপনারা দেখেছেন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দল যেভাবে মানুষ থেকে হারিয়ে যায়, যেভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় ঠিক একইভাবে আওয়ামী লীগও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে।’
‘আমরা আহ্বান জানিয়েছি, সরকার যেন উদ্যোগ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে। যেন পরে রাজনৈতিকভাবে বা কোনোভাবেই আওয়ামী লীগ ফাংশনাল না হতে পারে, সেই বিষয়টি প্রস্তাব দিয়েছি’, যোগ করেন হাসনাত।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতিত সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দোসররা রাজপথের আন্দোলনকারীদের ছাড়বে না বলে মন্তব্য করে জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, ‘আমাদের দেশে একটা ট্র্যাডিশন হচ্ছে খুনি হাসিনার মতো সবাই দ্রুত সেইফ এক্সিটটা পেয়ে যায়। জুলাই অভ্যুত্থানে যারা রাজপথে আন্দোলনে ছিল, হাসিনা ও তার দোসররা কিন্তু তাদের ছাড়বে না। সেই জায়গায় আমরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কোনো নেগোসিয়েশনের চিহ্ন দেখতে চাই না।’
জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক বলেন, যারা দোষী যারা খুনি, যারা তাদের দোসর, তারা যেই দল-মতেরই হোক-না কেন, তাদের শাস্তি হতে হবে। এই বিচারিক প্রক্রিয়ায় আমরা কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করি না। এটা আমাদের জায়গা থেকে স্পষ্ট করে দিয়েছি। এমন কিছু যদি দেখি, তাহলে আমরা আমাদের জায়গা থেকে, জাতীয় নাগরিক কমিটি বলেন আর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বলেন আমরা আবারও প্রতিবাদ করব।’
এছাড়া বৈঠকে মোস্তফা জামাল হায়দারের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), অলি আহমেদের নেতৃত্বে এলডিপি, মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বে নাগরিক ঐক্য, এসএম আলতাফ হোসেন ও সুব্রত চৌধুরীর নেতৃত্বে গণফোরাম, জোনায়েদ সাকির নেতৃত্বে গণসংহতি আন্দোলন, সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানীর নেতৃত্বে ইসলামী আন্দোলন, আবদুল বাছিদ আজাদ ও আহমেদ আবদুল কাদেরের নেতৃত্বে খেলাফতে মজলিশ, নুরুল হক নূরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ গণঅধিকার পরিষদ, খন্দকার লুৎফর রহমানের নেতৃত্বে জাগপা, ফরিদুজ্জামান ফরহাদের নেতৃত্বে এনপিপি, নুরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাসদ, মজিবুর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে এবি পার্টি এবং নাসিরদ্দীন পাটওয়ারীর নেতৃত্বে জাতীয় নাগরিক কমিটিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন।
