ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে দোলাচলে বিশ্ব

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৪:১৮ এএম

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিশ্ব জুড়ে টালমাটাল এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন। গত ২০ জানুয়ারি শপথগ্রহণ করেই ঝড় বইয়ে দিয়েছেন নির্বাহী আদেশের। এরই মধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এককভাবে যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দাতা রাষ্ট্র। ফলে তার এসব পদক্ষেপ বিশ্ব জুড়ে চরম অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে মানবাধিকার ও সহায়তা কর্মসূচিগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি বিশ্ব জুড়ে কূটনৈতিক ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও বড় পরিবর্তনের আভাস দিয়েছে নতুন ট্রাম্প প্রশাসন। ইতিমধ্যে এসব পরিবর্তনের ছাপও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ফলে দিন যত গড়াচ্ছে, ততই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে উঠছে বিশ্ব। এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে দেশটির নতুন পররাষ্ট্রনীতি কীভাবে বিশ্বকে ধন্দে ফেলছে, তা তুলে ধরেছে ব্রিটিশ সম্প্রচার মাধ্যম বিবিসি।

গত রবিবার জার্মানিতে শেষ হয়েছে তিন দিনব্যাপী মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন। এই সম্মেলনে যোগ দেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা। সেখানে দেওয়া হেগসেথ-রুবিওর পরস্পরবিরোধী বক্তব্য নতুন আলোচনার সৃষ্টি করেছে। হোয়াইট হাউজে প্রত্যাবর্তনের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। এই যুদ্ধ ঘিরে ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে ধারণা দিয়েছে মিউনিখে তিন দিনের সম্মেলন। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসন কীভাবে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করছে এবং এ নিয়ে অন্যদের কাছে বার্তা দিচ্ছে, সেটিও স্পষ্ট হয়েছে অনেকটাই।

মিউনিখে দেওয়া বক্তব্যে পিট হেগসেথ জানান, ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় রাশিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে যেতে ইউক্রেনকে বড় ছাড় দিতে হবে। তিনি বলেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার দখল করা অঞ্চলগুলো কিয়েভ ফিরে পাবে এমনটা মনে করা অবাস্তব। একই সঙ্গে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য হওয়ার যে দাবি ইউক্রেন করেছে, সেটিও বাস্তবসম্মত নয়। সেই সঙ্গে সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নয়, বরং তা ইউরোপীয়দের ওপর নির্ভর করছে বলে মন্তব্য করেন হেগসেথ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন দল রিপাবলিকান পার্টির কয়েকজন নেতাসহ অনেকেই। তারা বলছেন, হেগসেথের বক্তব্য রাশিয়ার সঙ্গে দর-কষাকষির ক্ষেত্রে ইউক্রেনের অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে ওয়াশিংটন। যদিও পরের দিনই নিজের বক্তব্য থেকে পিছু হটেন পিট হেগসেথ। ইউক্রেনের ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করে হেগসেথ বলেন, তিনি বাস্তবতা তুলে ধরেছিলেন।

শান্তি আলোচনা নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর অবস্থানের মিল নেই। মিউনিখে মার্কো রুবিও বলেন, স্থায়ীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠান জন্য কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র। একটি টেকসই নিরাপত্তাকাঠামো তৈরি করার কাজে নেতৃত্ব দেবে ইউরোপের দেশগুলো। এমনকি শান্তিচুক্তিতে যেতে রাশিয়াকে রাজি করানোর জন্য সামরিক হাতিয়ার ব্যবহারের কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও। অথচ হেগসেথ বলেছেন, ইউক্রেনে কোনো মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হবে না। তবে হেগসেথ নিজের বক্তব্য থেকে পরে সরে গেলেও, ট্রাম্প-পুতিনের ফোনালাপের পর দেওয়া বিবৃতির মধ্যে খুব একটা পার্থক্য দেখা যায়নি। তাতে ইউরোপের দেশগুলো বড় ধাক্কা খেয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে প্যারিসে জরুরি সম্মেলনের ডাক দিয়েছে ইউরোপের দেশগুলো। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেন, তাড়াহুড়ো করে করা কোনো চুক্তি ভালো হয় না। সমালোচকরা বলছেন, মিউনিখে ইউক্রেন-রাশিয়া শান্তিচুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তবে সেই প্রচেষ্টা কখনো কখনো অন্যদের সামনে বিস্ফোরক হিসেবে এসেছে। আবার কর্মকর্তাদের কোনো কোনো মন্তব্যে বিরোধও দেখা দিয়েছে।

প্রথম মেয়াদে প্রশাসনের অনেকেই ট্রাম্পের সঙ্গে বিরোধিতা বা দ্বিমত পোষণ করেছিলেন। তবে নতুন প্রশাসন তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। সে কারণেই কোনো সামরিক বাহিনী বা সংস্থার নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা ছাড়াই ফক্স নিউজের উপস্থাপক হেগসেথকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মার্কো রুবিও বলেছেন, তিনি চান ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রভাবশালী সরকারি দপ্তর হবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে ট্রাম্প তার গাজা দখলের প্রস্তাব দিয়ে বিতর্ক আরও উসকে দিয়েছেন। সেখানেও একইভাবে বিভ্রান্তি ও পারস্পরিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। ফলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসন সহিংসতাপূর্ণ ও অনিশ্চিত ম্যাডম্যান তত্ত্বের পথে হাঁটছে, যা বিশ্ব জুড়ে দ্বিধা বিভক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি চরম সংকটের সৃষ্টি করতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত