গণপরিবহনে নৈরাজ্য অপ্রতিরোধ্য?

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৪:১০ এএম

রাজধানীতে সড়কে নৈরাজ্য নতুন কিছু নয়। দুর্ঘটনা, যানজট যেন আমাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। এ নিয়ে বহু আলোচনা-সমালোচনা গবেষণা হয়েছে। পরিকল্পনা হয়েছে, প্রতিবাদ হয়েছে। কোনোটাই কাজে আসেনি। ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে বড় একটি আন্দোলন করেছে শিক্ষার্থীরা। ওই আন্দোলনের সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেলেও সরকারি নীতিনির্ধারকরা সড়ককে নিরাপদ করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। কিছু নীতিমালা আইন করে শুধু আন্দোলনের গতি থামিয়েছিলেন। আদতে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এতে নগরীর সমস্যাগুলো সমস্যার জায়গাতেই আছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পরিবহন ইউনিয়নের নেতা ছিলেন মন্ত্রীর আসনে। ফলে তিনি সব সময়ই পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের স্বার্থ দেখেছেন। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারকে কঠিন পদক্ষেপ নিতে বাধা দিয়েছেন। তখন শোনা যেত, তিনি চাইলে সারা দেশে যোগাযোগব্যবস্থায় ধস নামাতে পারেন। তৎকালীন সরকারকেও তিনি তাই বুঝিয়েছিলেন। এখন তো ওনি নেই, তবে কেন সড়কের নৈরাজ্য থামানো যায়নি?  তবে এ কথা সত্য, গণপরিবহনের মালিক বা শ্রমিকরা চাইলে জনদুর্ভোগ তৈরি করতে পারে। হঠাৎ বাস ধর্মঘট ডাক দিলেই হয়, বিকল্প ব্যবস্থা নেই বলে জনসাধারণ পড়েন দুর্ভোগে। এই সুযোগটাই বরাবর তারা নিয়ে থাকে। একে পুঁজি করে তারা ঘায়েল করে রাখে সরকারি নীতিনির্ধারকদের। সাধারণ মানুষকে করেন জিম্মি। সড়কে নৈরাজ্যের বিষয়গুলোর কমবেশি আমাদের সবারই জানা। অপ্রশস্ত রাস্তা, যেখানে সেখানে কারপার্কিং, যাত্রী উঠা-নামা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, আইন মেনে না চলা, যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল, চালকদের শিক্ষার অভাবসহ নানা বিষয় রয়েছে। এসবের কারণে নগরীতে দিনভর লেগে থাকে যানজট। ঘটছে দুর্ঘটনা। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশ হেলথ ইনজুরি সার্ভে-২০১৬তে উল্লেখ করা হয়েছিল, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৬৪ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন। এটি ছিল সরকারি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত জরিপে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে সড়কে দুর্ঘটনা বেড়েছে ১ দশমিক ৫৪ শতাংশ, মৃত্যু বেড়েছে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ, আর আহতের সংখ্যা  বেড়েছে ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

২০১৮ সালের শিক্ষর্থীদের আন্দোলনের পর সরকার সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আইন কঠোর করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বাধা ছিলেন সেই মন্ত্রী। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আইনের প্রয়োগ ঘটাতেও হিমশিম খায় সরকার। যানজট আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে বড় সংকট। রাজধানীবাসীর কাছে যানজট একটি মূর্তিমান আতঙ্ক। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা  গেছে, অসহনীয় যানজটের কারণে প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। রাজধানী ঢাকায় ৭৩টি মোড়ে আটকে যাচ্ছে যানবাহন। ফলে প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা। আর জ্বালানি পুড়ছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার। যানজটের কারণ হিসেবে নানামুখী সমস্যার কথা বলা হয়।  অনিয়ন্ত্রিত গাড়ি রাজধানীতে যানজটের সৃষ্টি করছে। প্রতিদিনের অসহ্য যানজটের কারণে স্থবির হয়ে পড়ে মানুষের জীবন ও জীবিকা। এই যানজট থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু সেখানে আছে অপরিকল্পনার ছোঁয়া। হাজার কোটে টাকা বিনিয়োগেও রাজধানীবাসী যানজট থেকে মুক্তি পায়নি। এতে জনগণকে দীর্ঘদিন উন্নয়নযজ্ঞের যন্ত্রণা পোহাতে হয়েছে মাত্র। এসব পরিকল্পনায় অপরিকল্পনার ছোঁয়া ছিল বলে নগরবাসী যানজটের চক্করে পড়ে আছে।

শুরুতে বলেছিলাম, পরিবহন শ্রমিকরা নগরবাসী ও সরকারি নীতিনির্ধারকদের জিম্মি করে রেখেছে। এর একটা প্রমাণ মিলে সম্প্রতি সিএনজি অটোরিকশা চালকদের ভাড়া নির্ধারণে বিষয়ে উচ্চ আদালতের একটি আদেশকে ঘিরে। সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া ও মালিকের জমার নির্ধারিত হার রয়েছে। সরকার সেই ভাড়া ও জমার হার কার্যকর করতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু রাস্তা অবরোধ করে মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলে সরকারকে পিছু হটতে বাধ্য করলেন অটোরিকশার চালকরা। সম্প্রতি অটোরিকশাচালকদের অবরোধের কারণে সচিবালয়ে জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে কয়েকজন উপদেষ্টা সময়মতো পৌঁছাতে পারেননি। এমন পরিস্থিতিতে ওই দিন দুপুরের মধ্যে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) চালক ও মালিকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে দেওয়া চিঠি প্রত্যাহার করে। এর ফলে যাত্রীদের আগের মতোই বেশি ভাড়া দিয়ে চলাচল করতে হবে এবং নির্দিষ্ট গন্তব্যে যেতে অটোরিকশাচালকদের মর্জির ওপর নির্ভর করতে হবে। মালিকরাও চালকদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ আদায় করতে থাকবেন। এর মানে, নৈরাজ্য টিকে রইল। ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিগত সরকারের সময়ে বেশ কয়েকবার নিষিদ্ধ হলেও ব্যাটারি রিকশাচালকদের সড়ক অবরোধের মুখে পিছু হটেছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও সম্প্রতি চেষ্টা করেছে। কিন্তু পারেনি। তারা যখন সড়ক অবরোধ করে জনদুর্ভোগ তৈরি করেছিল, তখন হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে সরকার। তাদের অবরোধে অচলাবস্থায় সরকারকে পিছু হটতে হয়েছে। সড়কে শৃঙ্খলা আনতে আব্দুল্লাহপুর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচল করা ২১টি কোম্পানির বাস টিকিট কাউন্টার ভিত্তিতে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। টিকিট কাউন্টারভিত্তিক বাস পরিচালনা কার্যক্রমের উদ্বোধনও করা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, প্রায় ২ হাজার ৬১০টি বাস চলবে। সব বাস একই রঙের (গোলাপি) হবে। এসব বাসে টিকিট ছাড়া কেউ উঠতে পারবেন না। যত্রতত্র বাসে ওঠা-নামাও করা যাবে না। রাজধানীতে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মাধ্যমে চালু করা হয় ই-টিকিটিং পদ্ধতি ও কাউন্টারভিত্তিক বাস সার্ভিস। নতুন পদ্ধতিতে গাজীপুর-ঢাকা সড়কের বিভিন্ন রুটে প্রথম অবস্থায় ২১টি কোম্পানির ২৬১০টি বাস চালু করা হয়। সব গাড়ির রঙ নির্ধারণ করা হয় গোলাপি। নতুন এ সিস্টেমের পাঁচ দিন যেতে না যেতে এসব গাড়ির শ্রমিকদের ভেতর অসন্তোষ শুরু হয়। তারা টিকিট সিস্টেমের বিরুদ্ধে। এক বাসচালকের সহকারীকে প্রশ্ন করেছিলাম,  আপনারা এর বিরুদ্ধে কেন। তিনি আমাকে বলেন, এতে আমাদের ইনকাম কমে যায়। আশির দশকেও রাজধানীতে কিছু বাসে টিকিট সিস্টেম ছিল। কিন্তু ওই সিস্টেম কবে কীভাবে বাতিল হয়েছে, তা আমার জানা নেই। কিন্তু সিস্টেমটা মনে করি ভালো ছিল। কাউন্টার বাস চালু হয়েছিল নগরবাসীর যাতায়াতে ঝামেলা কমাতে। পাশাপাশি এসি বাসও চালু হয়েছিল। কিন্তু সেসব বাসের কাউন্টার সিস্টেম এখন বেশিরভাগই অচল। কিছু কিছু বাস এখনো কাউন্টার সিস্টেম চালু রেখেছে। কিন্তু খুবই নগণ্য। রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের গণপরিবহনে অটোরিকশা যুক্ত হয় ২০০৩ সালে। তখন পরিবেশদূষণকারী বেবিট্যাক্সি ও মিশুক উঠিয়ে দিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশার অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে সংখ্যা ছিল নির্দিষ্ট। শুরুতে কয়েক মাস নির্ধারিত ভাড়ায় চলাচল করেছিল অটোরিকশাগুলো। এরপর শুরু হয় নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ২০-৩০ টাকা বেশি চাওয়া। পরে মিটার থাকলেও চালকরা চুক্তিতে চলাচল করতে যাত্রীদের বাধ্য করা শুরু করেন। মিটারের কথা বললে, তারা যাত্রীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। সেই অবস্থা এখনো চলছে।

সব মিলিয়ে দুই দশক ধরে রাজধানী শহর ও বাণিজ্যিক নগর চট্টগ্রামে অটোরিকশা সেবায় নৈরাজ্য চলছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশার মালিক ও চালকদের দাবির মুখে অন্তত পাঁচবার ভাড়া ও দৈনিক জমা বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু একবারও বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর করতে পারেনি। অবশ্য চালকরা ভাড়া নেন কার্যত দ্বিগুণ। দেড়শ টাকার নিচে স্বল্প দূরত্বের পথে যাওয়া যায় না। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন অথবা লঞ্চঘাটের মতো জায়গা থেকে কোথাও যেতে চাইলে অনেক বেশি ভাড়া হাঁকা হয়। সকালে অফিস শুরুর সময় এবং বিকেলে ছুটির সময় ভাড়া বাড়িয়ে দেন চালকরা। সিএনজিচালিত অটোরিকশার নীতিমালায় চালক ও মালিকের শাস্তির বিধান রয়েছে। ২০১৮ সালে করা সড়ক পরিবহন আইনেও কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়েছে। সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, অটোরিকশার মতো কোনো কন্ট্রাক্ট ক্যারিজের চালকরা যেকোনো গন্তব্যে যেতে রাজি না হলে, বেশি ভাড়া চাইলে ছয় মাসের কারাদন্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন এবং চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ১ পয়েন্ট কর্তন করা হবে। এভাবে ১২ পয়েন্ট কাটা গেলে লাইসেন্স বাতিল হয়ে যায়। সড়ক পরিবহন আইনে আরও বলা হয়েছে, মালিক নির্ধারিত দৈনিক জমার বেশি টাকা দাবি করলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা ৬ মাসের কারাদন্ডের মুখোমুখি হবেন।

২০০৩ সালে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালুর আগে ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রায় এক লাখের মতো মিশুক-বেবিট্যাক্সি চলাচল করত। সেগুলো তুলে দিয়ে দুই শহরে ২৭ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা নামানো হয়। তখন অটোরিকশার অনুমতিপত্র বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রাইভেট গাড়ি, মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা অবাধে বাড়ছে। কোনো সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। শুধু অটোরিকশার ক্ষেত্রে এ সীমা রয়েছে। আর অটোরিকশার মেয়াদ (১৫ বছর) শেষ হয়ে গেলে পুরনো মালিকরাই নতুন অটোরিকশা নামানোর সুযোগ পান। সংকটের সুযোগে এ বাহনের মালিকরা নিবন্ধন হাত বদল করে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা আয় করছেন। আপাতত সড়কে নৈরাজ্য কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং দিন দিন বাড়ছে। যারা অবৈধভাবে সড়কে চলছে তাদের মধ্যে এক ধরনের অধিকার তৈরি হয়েছে যে, তাদেরও চলতে দিতে হবে। যারা আইন মানছে না, তারাও ভাবছে তারাই ঠিক। তাদের ভাব দেখে মনে হয়, তারা সড়কের অধিপতি। আর দুর্ভোগ, সেটা জনগণের নসিব।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত