রাজনীতিতে তারুণ্য শক্তির উদ্বোধন

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৫, ০৭:১৩ এএম

জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের সমন্বয়ে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ করেছে। নতুন দলের আহ্বায়ক করা হয়েছে সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামকে। আর সদস্য সচিব করা হয়েছে আখতার হোসেনকে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে নতুন রাজনৈতিক দল ও আহ্বায়ক এবং সদস্য সচিবের নাম ঘোষণা করেন জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে নিহত শহীদ মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন রাব্বীর বোন মীম আক্তার।

কমিটি ঘোষণার পর বক্তব্যে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলন, বাংলাদেশে ভারতপন্থি বা পাকিস্তানপন্থি রাজনীতির কোনো ঠাঁই হবে না। তার বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে বাংলাদেশে একটি সেকেন্ড রিপাবলিক বা দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার বিষয়ে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লড়াই সূচনা করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে আমাদের সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সব সম্ভাবনার অবসান ঘটাতে হবে। এরপর নাহিদ ইসলাম দলের পক্ষ থেকে একটি ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।

এদিকে বেলা ৩টায় সংগঠনটির আত্মপ্রকাশের কথা থাকলেও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে মূল সমাবেশ শুরু হয় বিকেল ৪টার পর। তবে সকাল থেকেই তরুণ থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে ওই এলাকা। নতুন দল গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার ও সুস্থ ধারার রাজনীতি করবে। পাশে দাঁড়াবে গণমানুষের, করবে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার, এমন প্রত্যাশা আগতদের। সমাবেশে যোগ দিতে দেশের প্রান্তিক এলাকা থেকে এসেছেন প্রবীণরাও। বিগত দিনের রাজনীতির খুঁটিনাটি ভুল এবং তা থেকে উত্তরণে তরুণদের ওপর আস্থা তাদের।

সমাবেশে সংগঠনটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন আংশিক আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেন। এতে দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হয়েছেন শামান্তা শারমিন, আরিফুল ইসলাম আদীব, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব হয়েছেন ডা. তাসনিম জারা, নাহিদা সরওয়ার রিভা, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হয়েছেন হাসনাত আবদুল্লাহ, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হয়েছেন সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক হয়েছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক হয়েছেন আবদুল হান্নান মাসউদ।

যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে নুসরাত তাবাসসুম, মনিরা শারমিন, মাহবুব আলম, সারওয়ার তুষার, অ্যাডভোকেট মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন, তুজরুবা জাবিন, সুলতান মুহাম্মদ জাকারিয়া, ড. আতিক মুজাহিদ, আশরাফ উদ্দিন মাহদি, অর্পিতা শ্যামা দেব, তানজিল মাহমুদ, অনিক রায়, খালেদ সাইফুল্লাহ, জাবেদ রাসিম, এহতেশাম হক ও হাসান আলী।

দলটির পক্ষ থেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং দলগুলোর নেতারা সমাবেশস্থলে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি, জামায়াত, নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি, লেবার পার্টি, জেএসডি, বিপ্লবী ওয়ার্কাস পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। এ ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্য, বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক ও বিদেশি অতিথিরাও ছিলেন। বিএনপির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। এ ছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা আকবর খান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জেনারেল সেক্রেটারি মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমেদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকন্দ ও হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী, বিকল্পধারা বাংলাদেশের নির্বাহী সভাপতি মেজর (অব.) আবদুল মান্নান, বাংলাদেশ এলডিপির মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম, খেলাফত মজলিসের নেতা আহমেদ আবদুল কাদের, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব সাখাওয়াত হোসেন রাজী, ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এ কে এম আজহারুল ইসলাম, এবি পার্টির নেতা দিদারুল আলম এবং জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুলসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ঢাকার পাকিস্তান হাইকমিশনের পলিটিক্যাল কাউন্সিলর কামরান দাঙ্গাল ও ঢাকায় ভ্যাটিকান সিটির রাষ্ট্রদূতসহ আরও অনেকে ছিলেন।

সমাবেশে সারজিস আলম বলেন, ‘আমরা শুধু আপনাদের একটা কথাই বলতে চাই, ৫ আগস্ট খুনি হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর দেশ গঠনের যে স্বপ্নগুলো দেখেছিলাম, সেই স্বপ্নপূরণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। যেকোনো বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত থাকবে, যুক্তি-তর্ক থাকবে; তবে দিনশেষে দেশের জন্য এবং দেশের মানুষের জন্য মঙ্গলকর সেই বিষয়ে সবাই যেন ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি। আমরা বিশ্বাস করি, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি সম্মানবোধ থাকে, আগামীর বাংলাদেশ হবে অপ্রতিরোধ্য। আমরা অনুরোধ করি দেশে যত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আছে, তারা যেন নিজেদের দায়িত্ব বাদ দিয়ে তোষামোদির রাজনীতিতে লিপ্ত না হয়। আমরা অনুরোধ করি খুনি হাসিনা যে বাংলাদেশ পুলিশকে ধ্বংস করে দিয়েছে, তারা তাদের কাজের মাধ্যমে হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনে।’

তিনি বলেন, ‘আইন-আদালত থেকে শুরু করে সরকারি যত অফিস রয়েছে, আপনাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে জনগণের থেকে হাত পেতে ঘুষের টাকা নেবেন না। সামান্য স্বার্থের জন্য জনগণের সঙ্গে এ অন্যায় আপনারা করবেন না। খুনি হাসিনার বিচার আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে করতে হবে। কোনো অপরাধীর মুক্তির জন্য আমরা যেন থানায় না যাই। যারা বড় রাজনৈতিক দলে রয়েছেন, তারা যদি ছোট দলকে এগিয়ে যেতে না দেন তাহলে আবার একটি স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হতে পারে। খুনি হাসিনাকে দেখে যেন আমরা সেই শিক্ষা নিতে পারি। আমরা দেশ এবং জাতিকে সবার ওপরে রেখে যেন নতুন ও সাম্যের বাংলাদেশ গঠন করতে পারি।’

সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পাটির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা দেশকে আওয়ামী লীগের জাহেলিয়াতের থেকে মুক্ত করে সংসদ ভবনকে ফ্যাসিবাদ মুক্ত করেছি। সেই সংসদ ভবনের সামনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যাওয়ার জন্য আমরা মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি ধরে আমাদের দেশে ছিল বিচারহীনতার রাজনীতি। আপনারা দেখেছেন, ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহে কীভাবে ভারতীয় আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। স্পষ্টভাবে বিডিআর হত্যাকে বিডিআর বিদ্রোহ বলে চালানো হয়েছে। শাপলা চত্বরে আমাদের দাড়ি-টুপিওয়ালা ভাইদের রাতের অন্ধকারে কীভাবে গণহত্যা চালানো হয়েছে। দাড়ি-টুপিওয়ালা ভাইদের সামনে থেকে কীভাবে মাইক কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কীভাবে দিনের ভোট রাতে চালু করার সংস্কৃতি চালু হয়েছে। আমরা ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের এই দুঃশাসনের কবর রচনা করেছি।’

তিনি বলেন, ‘এই গণভবনে কে যাবে সেটি নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ থেকে, ভারত থেকে নয়। এই সংসদে কে যাবে সেটি নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের খেটেখাওয়া জনতা। এই সংসদের মসনদে কে বসবে সেটি নির্ধারণ করবে এ ভূখ-ের মানুষ। আমরা দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে একটি জাতি গড়ে তুলতে পারিনি। ইচ্ছে করে বিভাজনের রাজনীতি জিইয়ে রাখা হয়েছে। আমরা সুশাসন নিশ্চিত করে পারিনি। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো তারা ভেঙে দিয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানও যথাযথভাবে ফাংশন করতে দেখি না। আমরা আপনাদের কথা দিচ্ছি, এই তরুণ প্রজন্ম ইনসিটিশনগুলোতে ফাংশনাল করব। এই বিভাগের রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে আমরা একতার রাজনীতি বাংলাদেশে চালু করব। আমরা এই ভূখ-ের অধিকার আদায় করতে পারিনি। বিদেশের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক থাকবে। কিন্তু কোনো প্রেসকিপশনের সম্পর্ক থাকবে না। এ দেশে কামারের ছেলে প্রধানমন্ত্রী হবে, কুমারের ছেলে প্রধানমন্ত্রী হবে। এ দেশে যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব উঠে আসবে। আমরা সুন্দর একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘সারা দেশের মানুষের কাছে আহ্বান থাকবে আজকের তরুণরা যে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে আপনারা সবাই দোয়া করবেন যেন মহান রাব্বুল আলামিন, মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের এই তরুণদের স্বপ্নকে বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করার তৌফিক দান করেন। বাংলাদেশে যারা গণহত্যা চালিয়েছে, এই তরুণরা যেন তাদের নেতৃত্বে এই বাংলার জমিনে সেই খুনি, গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগ এবং তাদের দোসরদের বিচার করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশে ৫৪ বছর পর আমরা যে সুযোগ পেয়েছি, একটি নতুন সংবিধানের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, এই তরুণরা স্বপ্ন দেখে আগামীর বাংলাদেশ এক নতুন সংবিধানের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা গণপরিষদ নির্বাচনের দাবি জানাই।’

ঘোষণাপত্র : সদ্য ঘোষিত তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম দলের পক্ষ থেকে একটি ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। তিনি বলেন, ‘জুলাই ২০২৪ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে, আমরা বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা এই মর্মে ঘোষণা করছি ‘আমরা হাজার বছরের ঐতিহাসিক পরিক্রমায় বঙ্গীয় বদ্বীপের জনগোষ্ঠী হিসেবে এক সমৃদ্ধ ও স্বকীয় সংস্কৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের পতন ঘটে। তবে শোষণ ও বৈষম্য থেকে এ দেশের গণমানুষের মুক্তি মেলেনি। ফলে ২৩ বছরের সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু স্বাধীনতার পর দীর্ঘসময় ধরে বাংলাদেশের জনগণকে বারবার গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে হয়েছে। ১৯৯০ সালে ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে সামরিক স্বৈরাচারকে হটিয়েছে। তথাপি স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়েও আমরা গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে এমন একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করতে পারিনি। বরং বিগত ১৫ বছর দেশে একটি নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা কাযেম হয়েছিল, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থে বেপরোয়া ব্যবহার করে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা হয়েছে। বিরোধী মতের কণ্ঠরোধ, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ও অর্থ পাচারকে একটি রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে পরিণত করা হয়েছে।’

ঘোষণাপত্রে আরও বলা হয়, জুলাই ২০২৪-এ ছাত্র-জনতা বিপুল আত্মত্যাগের মাধ্যমে এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটিয়েছে। কিন্তু আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন স্বাধীনতা কেবল একটি সরকার পতন করে আরেকটি সরকার বসানোর জন্যই ঘটেনি। জনগণ বরং রাষ্ট্রের আষ্টেপৃষ্ঠে জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আকাক্সক্ষা থেকে এই অভ্যুত্থানে সাড়া দিয়েছিল, যেন জনগণের অধিকারভিত্তিক একটি রাষ্ট্র পুনর্গঠিত হয়। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিচ্ছি। এটি হবে একটি গণতান্ত্রিক, সমতাভিত্তিক ও জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল।

নাহিদ ইসলাম ঘোষণাপত্রে বলেন, ‘আমরা মনে করি, জুলাই-২০২৪ গণঅভ্যুত্থান আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লড়াই সূচনা করেছে। একটি গণতান্ত্রিক নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে আমাদের সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সব সম্ভাবনার অবসান ঘটাতে হবে। আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার জন্য গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন আমাদের অন্যতম প্রাথমিক লক্ষ্য। আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিকে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। ভেঙে পড়া রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় গড়ে তোলা ও তাদের গণতান্ত্রিক চরিত্র রক্ষা করা হবে আমাদের রাজনীতির অগ্রাধিকার। এর মধ্য দিয়েই কেবল আমরা একটি পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারব।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ চাই যেখানে সমাজে ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বিভেদের বদলে ঐক্য, প্রতিশোধের বদলে ন্যায়বিচার এবং পরিবারতন্ত্রের বদলে মেধা ও যোগ্যতার মানদ- প্রতিষ্ঠিত হবে। আমাদের রাজনীতিতে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কোনো স্থান হবে না। আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিকে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে মূলধারায় তুলে আনা হবে। আমাদের রিপাবলিকে সাধারণ মানুষ, একমাত্র সাধারণ মানুষই হবে ক্ষমতার সর্বময় উৎস। তাদের সব ধরনের গণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকারের শক্তিশালী সুরক্ষাই হবে আমাদের রাজনীতির মূলমন্ত্র। আমরা রাষ্ট্রে বিদ্যমান জাতিগত, সামাজিক, লিঙ্গীয়, ধর্মীয় আর সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও বৈচিত্র্য রক্ষার মাধ্যমে একটি বহুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মাণ করতে চাই। আমাদের রিপাবলিক সব নাগরিককে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে শক্তিশালী সুরক্ষা প্রদান করবে। আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিকে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর কোনো অংশকেই অপসারণ করা হবে না। বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে সমান গুরুত্ব প্রদান ও সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।’

আহ্বায়ক নাহিদ বলেন, ‘অর্থনীতিতে, আমরা কৃষিসেবা-উৎপাদন খাতের যথাযথ সমন্বয়ের মাধ্যমে এমন একটি জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাই যেটি হবে স্বনির্ভর, আয়বৈষম্যহীন ও প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল। আমাদের অর্থনীতিতে সম্পদ একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে পুঞ্জীভূত হবে না, বরং সম্পদের সুষম পুনর্বণ্টন হবে আমাদের অর্থনীতির মূলমন্ত্র। আমরা বেসরকারি খাতের সিন্ডিকেট ও গোষ্ঠীস্বার্থ নিয়ন্ত্রণে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ভোক্তা ও জনস্বার্থ সংরক্ষণ করব। অর্থনৈতিক অগ্রগতির মাধ্যমে এ অঞ্চলের একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করব এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তি খাতে জোর দিয়ে উদ্ভাবনী সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি টেকসই, আধুনিক অর্থনীতি গড়ে তুলব।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা একটি ন্যায্যতা ও সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় আমাদের সংকল্প আবারও পুনর্ব্যক্ত করতে চাই। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জুলাই-২০২৪ গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধেই বিজয় নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও শপথ। চলুন আমরা একসঙ্গে, হাতে হাত রেখে, এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তুলি যেখানে প্রতিটি নাগরিকের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হবে, যেখানে ন্যায় প্রতিষ্ঠা, মানুষের অধিকারের সংগ্রামই হবে রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য। যেখানে সাম্য ও মানবিক মর্যাদা হবে রাষ্ট্রের ভিত্তি। এখনই সময় নতুন স্বপ্ন দেখার, নতুন পথচলার এবং একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার! এই নতুন বাংলাদেশ গড়ায় আমরা সবাই প্রত্যেকে যার যার অবস্থান থেকে শপথ করি। ঐক্যবদ্ধ হই এবং আমাদের কাক্সিক্ষত সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে দৃঢ়চিত্তে এগিয়ে যাই। আমাদের দেশ, আমাদের অধিকার, আমাদের ভবিষ্যৎ আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক অধরা কোনো স্বপ্ন নয়, এটি আমাদের প্রতিজ্ঞা!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত