লেখক, গবেষক, ভাষাবিজ্ঞানী আবুল মনসুর মুহম্মদ আবু মুসা পরিচিত মনসুর মুসা নামে। তিনি আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মানুষের ভাষা সমস্যা নিয়ে তার গবেষণা ও প্রবন্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোনো না কোনো হলের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হতো। শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক ও পাঠবহির্ভূত দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে হতো এই হলের সঙ্গে যুক্ত থাকা শিক্ষকদের। মনসুর মুসার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী যে ব্যাপারটি ঘটেছিল তা হলো, তিনি নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট হল শামসুন নাহার হলের হাউজ টিউটর হিসেবে যুক্ত হওয়ার জন্য তালিকাভুক্ত হওয়া। খোঁজ নিয়ে জানলেন, বিষয়টি কোনো ভুল নয়, বরং শামসুন নাহার হলের প্রাধ্যক্ষা মিসেস মেহেরুন নেসার জ্ঞাতসারে ও ইচ্ছায় ঘটেছে। দায়িত্ব ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে উপস্থিত থাকা, বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করা, সাহিত্য প্রতিযোগিতার পরীক্ষক হওয়া আর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে প্রাধ্যক্ষা বা কর্র্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করা। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই একটি ঘটনা তার চিত্তকে নাড়া দিয়েছিল গভীরভাবে। সেটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচন। মনসুর মুসার দায়িত্ব ছিল সকাল আটটা থেকে সাড়ে দশটা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ ও বিকাল চারটার পরে ভোট গণনায় সহায়তা করা। শামসুন নাহার হল ছিল মেয়েদের জন্য নির্ধারিত অন্য হলের তুলনায় অর্থাৎ, রোকেয়া হলের তুলনায় বেশ ছোট। শিক্ষার্থী সংখ্যাও বেশি ছিল না। সে কারণে ভোট গ্রহণ তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায় এবং যথাসময়ে ভোট গণনা শুরু হওয়ার পরে তা সমাপ্তও হয়ে যায় দ্রুত। দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা ফলাফল তৈরি করে বাইরে টাঙিয়েও দিলেন। এমন সময় শোনা গেল গোলাগুলির আওয়াজ। অস্ত্রধারীরা দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে জানতে চাইল, ব্যালট বাক্স কোথায়? শিক্ষকরা জানিয়ে দিলেন, পশ্চিমে, মিলনায়তনে। অস্ত্রধারী চলে গেল সেদিকে। শিক্ষকরা ভাবছিলেন, যেখানে ফল প্রকাশ হয়েছে, সেখানে ব্যালট বাক্স ছিনতাই করে কী লাভ?
যা হোক, সারা ক্যাম্পাসে, সব হলে ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের ফলে সে নির্বাচন বাতিল হয়। সে সম্পর্কে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে যে আলোচনা হয় সে সম্পর্কে মনসুর মুসা লিখেছিলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানী অধ্যাপকবৃন্দ কেউ সত্য কথা বলছি না; আমরা সবাই আনুষ্ঠানিকভাবে মিথ্যা বলছি।’ তাই এই স্বীকারোক্তি ১৯৭৩ সালের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দলিল।
সুলতানা রাজিয়া
(অধ্যাপক মনসুর মুসার ‘শামসুন নাহার হলের নির্বাচন-১৯৭৩’ নিবন্ধের তথ্যানুসারে)
