বিমানের আকাশে নৈরাজ্য

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২৫, ০৬:৫৫ এএম

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিমান একটি আদর্শের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। ওই সময় বিমানের প্রতিটি কাজের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিমানের বোর্ড পুনর্গঠিত হলেও কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবের অভিযোগ উঠেছে। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলেও তাকে সেই দোষমুক্ত করার জন্য পছন্দের লোক দিয়ে গঠন করা হচ্ছে দ্বিতীয় তদন্ত কমিটি। গত ১৫ বছরে যাদের দোর্দ- প্রতাপে বিমানের ‘ভেঙে পড়ার’ উপক্রম হয়েছিল, তারাই নানা জায়গায় পুনর্বাসিত হচ্ছেন। গাড়িচালক থেকে শুরু করে বিমানচালকও অনিয়মে জড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ। বলা যায়, নৈরাজ্যের আকাশে ঘুরপাক খাচ্ছে ‘বিমান’।

বিমানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিমানের নিজস্ব কর্মকর্তা হওয়ায় তিনি বিমানের প্রায় সবাইকেই চেনেন। তিনি যেসব কাজ সুষ্ঠুভাবে করতে পারবেন, প্রশাসন ক্যাডার থেকে এমডি এনে সে কাজ করা সম্ভব নয়। কিন্তু তার কর্মকান্ডে বিমানকর্মীরা নাখোশ। তিনি তেলা মাথায় তেল ঢালছেন। বিগত বছরগুলোয় যারা সুবিধা ভোগ করেছেন, তাদেরই সুবিধাজনক জায়গায় চাকরি করার সুযোগ দিচ্ছেন। সার্টিফিকেট জালিয়াতি, তেল চুরির মতো ছোটখাটো ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না হওয়ায় বিমানে অসন্তোষের আলামত পাওয়া যাচ্ছে।

মো. সুমন মিয়া ২০১৬ সালে ক্যাজুয়াল এমটি অপারেটর পদে চাকরিতে যোগ দেন এসএসসি পাসের সনদ জমা দিয়ে। ২০২২ সালে তিনি যখন এমটি অপারেটর হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান, তখন তিনি এসএসসি (ভোকেশনাল) পাসের সনদ জমা দেন। অভিযোগ ওঠায় গত নভেম্বরে এ নিয়ে তদন্ত করেন বিমানের উপমহাব্যবস্থাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ। তদন্ত কমিটিকে নিয়োগ শাখার ব্যবস্থাপক লিখিতভাবে জানান, সুমনের দুটি সনদই নিয়োগ শাখার ফাইলে আছে। কিন্তু সুমন প্রথম সনদটি তার নয় বলে দাবি করছেন। অথচ এ সনদের ভিত্তিতেই তার চাকরি হয়। এসএসসি (ভোকেশনাল) বোর্ড থেকে বিমানকে জানানো হয়েছে এসএসসির (ভোকেশনাল) সনদটিও জাল। এখন সুমন বিমানের এমডির গাড়ি চালান।

বিমানের জুনিয়র শিডিউলিং অফিসার শফিকুর রহমান অভিযোগ করে বিমানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে জানান, ২০২৩ সালের ৫ এপ্রিল এমটি অপারেটর মো. তারেক ঢাকা মেট্রো চ ৫২-০৬৩৩ গাড়িটি নিয়ে বের হন। মাইলেজ মিটার অনুযায়ী গাড়িটি চলেছে ৫২ কিলোমিটার। তিনি পুড়িয়েছেন ৪২ লিটার অকটেন। এই জ্বালানি পোড়ানো সন্দেহজনক, অস্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ একই গাড়ি অন্য ড্রাইভাররা যখন চালান, তখন যে কেপিএল (কিলোমিটার পার লিটার) পাওয়া যায়, তার সঙ্গে ড্রাইভার তারেকের কেপিএলের ব্যাপক গরমিল রয়েছে।

৫২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে কত লিটার তেলের প্রয়োজন এমন প্রশ্নের উত্তরে তদন্ত কমিটিকে জুনিয়র শিডিউলিং অফিসার শফিকুর রহমান জানান, সর্বোচ্চ ১৫ লিটার। গাড়িতে এক ঘণ্টা এসি চালালে আরও সর্বোচ্চ এক লিটার জ্বালানি খরচ হতে পারে। গাড়িটিতে কোনো ত্রুটি ছিল না। একই গাড়ি তারেকের আগে আরও তিনজন ড্রাইভার চালিয়েছেন। ওই তিনজন মিলে ১১২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে ৩০ লিটার জ্বালানি ব্যবহার করেছেন।

তদন্ত বিভাগের প্রতিবেদনে তারেক দোষী সাব্যস্ত হলেও তার চাকরি রক্ষা করতে তৎপর একটি গ্রুপ। তারা বিমানের উপমহাব্যবস্থাপক মাসুদ পারভেজ রানাকে দিয়ে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। সেই তদন্ত কমিটি তাকে নির্দোষ প্রমাণ করে দায়মুক্তি দেয়। মাসুদ পারভেজ রানা বিমানের এমডির কাছের লোক হিসেবে পরিচিত। বিমানে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের কাছে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছে! রাষ্ট্রীয় এ সংস্থাটির কর্মকর্তাদের গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব প্রকট। একাধিক গ্রুপ রয়েছে, যারা বিভিন্ন সিন্ডিকেটের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। বিমান এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট এজাজুল হক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইওকে লিখিতভাবে জানান, বিমানের প্রকৌশল বিভাগের মো. জাহাঙ্গীর কবির, সহকারী ব্যবস্থাপক (কমার্শিয়াল) মো. মঈন উদ্দিন লোটাস এবং গ্রাউন্ড সার্ভিসের জুনিয়র অফিসার ফিরোজুজ্জামান তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। অভিযুক্তরা চাকরিচ্যুত ছিলেন। তারা আবারও বিমানে চাকরি ফিরে পেয়েছেন। এজাজুল হকের অভিযোগ আমলে নেননি বিমানের এমডি।

গত ১৫ বছর যারা বিমানে দাপট দেখিয়েছেন, বর্তমান প্রশাসন তাদের প্রতি নমনীয়। নানা অনিয়মে জড়ানোর কারণে বিমান শ্রমিক লীগের ১৭ নেতার বিরুদ্ধে তদন্ত করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন। প্রধান অভিযুক্ত ছিলেন বিমানের সিবিএর সভাপতি মশিকুর রহমান। তাকে সম্প্রতি টরন্টো থেকে প্রত্যাহার করা হলেও তিনি সপরিবারে টরন্টোতেই আছেন। বর্তমান এমডি তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। ওই ১৭ জনের সিন্ডিকেটের বাকিদের যারা চাকরিতে আছেন, তারাও নানা সুবিধা নিচ্ছেন বর্তমান ব্যবস্থাপনার কাছ থেকে। সাবেক সিবিএর বাইরেও শ্রমিক লীগের অন্য নেতারা নানাভাবে সুবিধা নিচ্ছেন। শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় ও বিমান ইউনিটের নেতা মো. রফিকুল আলম জুনিয়র অফিসার থেকে সহকারী ব্যবস্থাপক পদে, মো. হারুনর রশিদ জুনিয়র অফিসার (প্রশাসন) থেকে সহকারী ব্যবস্থাপক (প্রশাসন), মো. দলিলুর রহমান জুনিয়র অফিসার থেকে সহকারী ব্যবস্থাপক প্রশাসন পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। ৫ আগস্টের আগে দাপিয়ে বেড়ানো শ্রমিক লীগ নেতা মো. আতিকুর রহমান এবং মো. ফিরোজুল ইসলামকে (অডিট) বিধিবহির্ভূতভাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বিমানের যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার স্টেশনের জুনিয়র অফিসার থেকে মো. আতিকুর রহমানকে সহকারী ব্যবস্থাপক (অ্যাকাউন্টস) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ফিরোজুল ইসলামকেও একই পদে পদোন্নতি নিয়ে বিমান হেডকোয়ার্টার বলাকায় নেওয়া হয়েছে। ফিরোজুল ইসলামের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ভোল পাল্টানোর অভিযোগও রয়েছে। গত ১৫ বছরের সুবিধাবাদী গোলাম কায়সার আহমেদকে জুনিয়র অফিসার (বাণিজ্যিক) থেকে সহকারী ব্যবস্থাপক পদে, বিমান শ্রমিক লীগের প্রশাসন শাখার সভাপতি মো. আবু সাইদের জুনিয়র অফিসার (প্রশাসন) থেকে সহকারী ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) পদে পদোন্নতি হয়েছে।

বিমানের যানবাহন বিভাগের সিবিএ সভাপতি মো. আরিফুর রহমান ছিলেন শিডিউলিং সুপারভাইজার। তাকে জুনিয়র অফিসার শিডিউলিং পদে পদোন্নতি দিয়ে সিলেট থেকে ঢাকার যানবাহন বিভাগে আনা হয়েছে। আরিফুর রহমানের বাড়ি ফরিদপুর। অন্য ফরিদপুরবাসী এমটি অপারেটর মো. মাহবুবুর রহমান। তাকেও রাজশাহী থেকে ঢাকার যানবাহন বিভাগে আনা হয়েছে। চট্টগ্রাম স্টেশনের শিডিউলিং সুপারভাইজার গোলাম আমানুল্লাহ হকের বিরুদ্ধে আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ থাকার পরও বিমানের ব্যবস্থাপনা পদোন্নতি দিয়ে তাকে যানবাহন বিভাগে পদায়ন করেছে। এস্টেট অ্যান্ড কমন সার্ভিস বিভাগের ব্যবস্থাপক ফরিদপুরবাসী মো. দেলোয়ার হোসেনকে অবসরের পরও দুই বছরের চুক্তিভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

শ্রমিক লীগের ম্যাটেরিয়াল ম্যানেজমেন্ট শাখার সভাপতি গোপালগঞ্জবাসী মো. আলমগীর হোসেনকে জুনিয়র অফিসার (ম্যাটেরিয়াল) থেকে সহকারী ব্যবস্থাপক (ম্যাটেরিয়াল) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। প্রকিউরমেন্ট শাখা শ্রমিক লীগের সভাপতি ফরিদপুরবাসী মো. শরিফুল ইসলামকে কয়েকজনকে ডিঙিয়ে জুনিয়র অফিসার (প্রকিউরমেন্ট) থেকে সহকারী ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

বিমানে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন, যারা সরকারি চাকরি করেও রাজনৈতিক পদ-পদবির মাধ্যমে তাদের আধিপত্য বিস্তার করছেন। বাংলাদেশ বিমান এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সভাপতি এটিএম সাজ্জাদুল আলমকে জুনিয়র অফিসার থেকে সহকারী ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তিনি বিগত সময়ে বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ভিভিআইপি, ভিআইপি, মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের এয়ারপোর্টে প্রটোকল দেওয়ায় ব্যস্ত থেকেছেন।

বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের লোকদের বিদেশ পোস্টিংয়ে নানা অনিয়ম হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিমানে বিদ্যমান তিন বছরের বাধ্যবাধকতা মানা হয়নি। বৈদেশিক স্টেশনে তিন বছর হয়ে গেলে তাকে প্রত্যাহার করার নিয়ম রয়েছে। বিগত বছরগুলোয় সুবিধাভোগী এসব কর্মকর্তাকে ফেরত না এনে অন্য স্টেশনে পদায়নের মাধ্যমে পুরস্কৃত করা হয়েছে।

এএফএম আনিসুর রহমান ২০২১ সাল থেকে বিমানের কাঠমান্ডু শাখায় কর্মরত। আব্দুল্লাহ আল হুসাইন উপব্যবস্থাপক হিসেবে ২০২১ সাল থেকে আবুধাবিতে ছিলেন। গত সরকারের সুবিধাভোগী এ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়ে ইতালির রোমে পদায়ন করেছে বর্তমান ব্যবস্থাপনা। মো. মেসবাহ উদ্দিন ২০২০ সাল থেকে প্রায় পাঁচ বছর দিল্লিতেই কান্ট্রি ম্যানেজার ছিলেন। বর্তমান ব্যবস্থাপনা তাকে দিল্লি থেকে টরন্টোতে পোস্টিং দিয়েছে। কান্ট্রি ম্যানেজার করে শরীফুল আলমকে ২০২১ সালে মাস্কাটে পাঠানো হয়। বর্তমান ব্যবস্থাপনা তাকে সেখানে রেখেই গ্রুপ ৭ থেকে গ্রুপ ৮-এ পদোন্নতি দিয়েছে। তাকে দেশে ফেরত না এনে দুবাইয়ে পদায়ন করা হয়েছে। ২০২২ কুয়ালালামপুরের কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে পদায়ন করা হয় রিয়াদ সোলায়মানকে। তাকে কুয়ালালামপুর থেকে লন্ডনে পদায়ন করা হয়েছে। এ বি সিদ্দিক ২০২২ সাল থেকে কুয়েতের কান্ট্রি ম্যানেজার। জ্যেষ্ঠতা থাকার পরও তাকে অন্যত্র পদায়ন করা হয়নি। এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সফিকুর রহমানকে ফোন করেও পাওয়া যায়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত