সোমবার ২০২৫ সালের জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কেন্দ্রীয় চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটারদের নাম প্রকাশ করেছে। ২০২০ সালের পর আবারও ক্রিকেটারদের বিভিন্ন বেতন-শ্রেণিতে ক্যাটাগরি ভিত্তিতে চুক্তিবদ্ধ করা হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিসিবি ক্রিকেটারদের তিনটি আলাদা আলাদা সংস্করণের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় চুক্তিভুক্ত করেছিল, এই বছর বিসিবি ফিরে গেল পুরনো পথেই। গত ৫ বছরে বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে পরিচিত মুখের বাইরে যেসব তরুণ সুযোগ পেয়েছেন কেন্দ্রীয় চুক্তিতে, তাদের বেশিরভাগই অবস্থান ধরে রাখতে পারেননি।
২০২০ সালে ১৭ জনকে কেন্দ্রীয় চুক্তিতে রেখেছিল বিসিবি। সে বছর এ প্লাস ক্যাটাগরিতে কেউই ছিলেন না, ‘এ’ ক্যাটাগরিতে ছিলেন মুমিনুল হক। মোহাম্মদ মিঠুন ২০২০ সালের চুক্তিতে থাকলেও পরে আর কখনোই তাকে চুক্তিবদ্ধ করেনি বিসিবি। ২০২১ সালে চুক্তিভুক্ত ক্রিকেটারের সংখ্যা বাড়িয়ে ২৪ করে বিসিবি, নতুন ধারায় চুক্তি হয় সংস্করণ অনুযায়ী। নতুন চুক্তিতে শামীম হোসেন পাটোয়ারী আসেন টি-টোয়েন্টি সংস্করণে, টেস্টে সাইফ হাসান ও সাদমান ইসলাম ও এবাদত হোসেন। আগের বছরের চুক্তি থেকে বাদ পড়েন ইমরুল কায়েস ও রুবেল হোসেন। ২০২২ সালে এসে আবার টি-টোয়েন্টি সংস্করণ থেকে বাদ পড়েন শামীম হোসেন, টেস্ট চুক্তি থেকে বাদ পড়েন আবু জায়েদ চৌধুরি রাহি। পরের বছরে টেস্টের চুক্তিতে রাখা হয় ইয়াসির আলি চৌধুরি রাব্বি ও মাহমুদুল হাসান জয়কে। সাইফ হাসান বাদ পড়েন। ২০২৩ সালে এসে চুক্তিভুক্ত ক্রিকেটারের সংখ্যাটা কমে হয় ২১, প্রথমবার চুক্তিতে আসেন হাসান মাহমুদ ও জাকির হাসান। ২০২৩ এর চুক্তির সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশ ছিল মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতকে রাখা। ২০২২ সালে ১৭টা আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলেছিলেন মোসাদ্দেক, ১৭ গড়ে ১৮৯ রান ও ১৩ উইকেট নেওয়া মোসাদ্দেক কী করে পরের মৌসুমে চুক্তিতে জায়গা পান সেটা অবশ্য ‘ওপেন সিক্রেট’। ক্রিকেট আঙিনায় কান পাতলেই শোনা যায়, মোসাদ্দেক খেলেন আবাহনীতে তবে বেতন পান বিসিবি থেকে!
২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো চুক্তিতে আনা হয় ২০২০ যুব বিশ্বকাপ জয়ী দলের তাওহীদ হৃদয় ও তানজিম হাসান সাকিবকে। ২০২৫ সালের চুক্তিতে হৃদয় আছেন বি ক্যাটাগরিতে, মাসিক ৬ লাখ টাকা বেতনে আর তানজিম সাকিব আছেন সি ক্যাটাগরিতে ৪ লাখ টাকা বেতনে।
কেন্দ্রীয় চুক্তিতে নিয়মিত থেকেও সবচেয়ে হতাশ করা নামটা খুব সম্ভবত নুরুল হাসান সোহানের। ২০২১ সালে টি-টোয়েন্টি, ২০২২ সালে টি-টোয়েন্টি, ২০২৩ সালে টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি এবং ২০২৪ সালে আবারও শুধুই টি-টোয়েন্টির চুক্তিতে ছিলেন সোহান। এই সময়ে ৩৭টা টি-টোয়েন্টি ম্যাচে খেলেছেন, অধিনায়কও হয়েছিলেন। কিন্তু পায়ের নিচে মাটিটা শক্ত করতে পারেননি। বরং উইকেটরক্ষক হিসেবে বেশ কিছু মৌলিক ভুল করেছেন এই সময়ে, যেমন স্টাম্পের আগে বল হাত দিয়ে ধরে ফেলা ও ক্যাচ ছাড়া। এসব কারণেই টানা ৪ বছর কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকার পরও নির্বাচকরা তাকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস করেননি। বরং তারা টেস্টে সুযোগ দিয়েছেন মাহিদুল ইসলাম অঙ্কনকে।
এমনই আরেক হতাশার নাম ইয়াসির আলি রাব্বি। অভিষেকের আগে দ্বাদশ ব্যক্তি হিসেবে অনেকগুলো সফরেই গেছেন, মাঠে পানির বোতল নিয়ে ঢুকলেও একাদশে ঢুকতে লেগে গেছে লম্বা সময়। কিন্তু যখন সুযোগ পেলেন, তখন আর পারলেন না মিডল অর্ডারে নিজেকে প্রমাণ করতে। ২০২২ সালে ৫টা টেস্ট খেলেই আপাতত শীতঘুমে চট্টগ্রামের এই ব্যাটসম্যানের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। মিনহাজুল আবেদীন নান্নু প্রধান নির্বাচকের পদ থেকে বিদায় নেওয়ার পর তার সেই ‘শীতঘুম’ ভাঙার সম্ভাবনাও কম।
আরেকটা হতাশার নাম আফিফ হোসেন। ২০২০ সালে আফিফ ছিলেন ডি ক্যাটাগরির চুক্তিতে, ২০২১ সালে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টিতে, ২০২২ এবং ২০২৩ সালেও তাই, ২০২৪ সালে এসে চুক্তি থেকে বাদ পড়েন আফিফ। এবারও বাইরে। তিন বছর তাকে চুক্তিতে রেখে নিয়মিত বেতন দিয়ে গেছে বিসিবি, কিন্তু এই ক্রিকেটারের পারফরম্যান্সে উপকৃত হতে পারেনি বাংলাদেশ দল। তবে এই সময়টায় আবাহনী লিমিটেডে নিয়মিত খেলেছেন আফিফ।
কেন্দ্রীয় চুক্তিতে বড় লাফ দিয়েছেন নাহিদ রানা। প্রথমবারেই মাসে ৬ লাখ টাকা বেতনে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে। টেস্ট অধিনায়ক মুমিনুল হক এবং কাটার মাস্টার মোস্তাফিজুর রহমানের সমান বেতন তুলবেন মাত্রই এক বছর হয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখা এই তরুণ।
৬টা টেস্ট খেলেও শাহাদাত হোসেন দীপু নেই কেন্দ্রীয় চুক্তিতে। আবার ২০২১ সালের পর কেন্দ্রীয় চুক্তিতে ফিরেছেন সৌম্য সরকার। চন্ডিকা হাথুরুসিংহে কোচ থাকাকালীন বহুবার সৌম্যকে অযাচিতভাবেই সুযোগ দেওয়া হয়েছে, এমনকি তাকে উদীয়মান দলের সঙ্গেও খেলতে পাঠানো হয়েছে ফর্ম ফিরে পাওয়ার জন্য। কিন্তু সৌম্য আগের মতোই আছেন। কখনো অলরাউন্ডার, কখনো টেস্ট ওপেনার এমন নানান ভূমিকার গোঁজামিলে বিশ্ব আসরে খেলেছেন। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারতের বিপক্ষে শূন্য রানে আউট হওয়ার পর ঢাকা লিগেও লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জের বিপক্ষে আউট হয়েছেন শূন্য রানে।
বাংলাদেশের কথিত ‘পঞ্চপা-ব’দের ভেতর একমাত্র মুশফিকুর রহিমের নামই এখন আছে কেন্দ্রীয় চুক্তির তালিকায়। সাদা বল থেকে অবসর নেওয়ায় শুধুই টেস্টে খেলবেন মুশফিক, যে কারণেই সংগতভাবে তাকে এ প্লাস ক্যাটাগরির চুক্তিতে রাখা হয়নি। পঞ্চপা-ব পরবর্তী প্রজন্মের অনেকেই সুযোগ পেয়েছেন নানান ভূমিকায়, বিসিবির পক্ষ থেকে তাদের আর্থিক সুরক্ষার দিকটা দেখার জন্য কেন্দ্রীয় চুক্তিতেও রাখা হয়েছে একাধিক বছর। কিন্তু তরুণরা মাঠের খেলায় সেই আস্থার প্রতিদান দিতে পেরেছেন কমই। যেমন খালেদ ও নাসুম এখনো সেই তলানির চুক্তিতেই পড়ে আছেন, কেউ কেউ জায়গাই হারিয়ে ফেলেছেন।
