যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কীসের ভিত্তিতে বাংলাদেশের ওপর এই শুল্ক আরোপ করল, তা পরিষ্কার নয় বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে তিনি গণমাধ্যমকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানান।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হিসাব করে বের করেছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেসব পণ্য আমদানি করে, সেসব পণ্যে ৭৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে; সেই হিসাবে বাংলাদেশের পণ্যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্কের হিসাবের মধ্যে শুল্ক ছাড়াও আরও কিছু বিষয়ে আমলে নেওয়া হয়েছে। যেমন মুদ্রার বিনিময় হার, অশুল্ক বাধা, সংশ্লিষ্ট দেশের বাণিজ্যনীতি ইত্যাদি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ যেসব পণ্য আমদানি করে, সেগুলোতে আমদানি শুল্ক খুবই কম।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ যে তিনটি পণ্য সবচেয়ে বেশি আমদানি করে, সেগুলো হলো স্ক্র্যাপ আয়রন, পেট্রোলিয়াম ও তুলা। এর মধ্যে স্ক্র্যাপ আয়রন ও কটন কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করা হয়, এসব পণ্যে শুল্ক নেই অর্থাৎ এই দুটি পণ্য বিনা শুল্কে আমদানি করা হচ্ছে। সুতা দিয়ে তৈরি পোশাক সেই যুক্তরাষ্ট্রেই রপ্তানি হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে আমরা যেসব পণ্য রপ্তানি করি, তার ৯০ ভাগই এই তৈরি পোশাক। বাস্তবতা হলো যুক্তরাষ্ট্রের কটনের পঞ্চম বৃহত্তম ক্রেতা দেশ বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেরই নিয়ম আছে, তাদের দেশের কাঁচামাল আমদানি করে প্রস্তুতকৃত পণ্য সেই দেশেই রপ্তানি করা হলে শুল্কের ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দেওয়া হবে কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই নিয়ম প্রযোজ্য হলো না।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই বাস্তবতায় আমাদের কথা বলার অবকাশ আছে। আমি মনে করি, টিকফার মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আমাদের এ কথা তুলতে হবে। প্রথমত, আমাদের জানতে চাইতে হবে কীসের ভিত্তিতে তারা ৭৪ শতাংশ শুল্কের হিসাব করল। তাদের কাছ থেকে আমদানি করা পণ্যে আমাদের শুল্ক অনেক কম। তারা মুদ্রার বিনিময় হার নিয়ে কারসাজির হিসাব করেছে। এক সময় আমাদের টাকার বিনিময় হার
কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে রাখা হতো ঠিক; কিন্তু গত তিন বছরে ধাপে ধাপে মুদ্রার বিনিময় হার বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। ফলে আমাদের বিনিময় হার এখন বাজারের হারের কাছাকাছি। এই বিষয়গুলো আমাদের তুলে ধরতে হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির কারণে পোশাক রপ্তানিতে কী কী প্রভাব পড়বে? এখন বাংলাদেশের কী করা প্রয়োজন, এসব বিষয় জানতে চাইলে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মার্কিন শুল্কারোপ এটা অপ্রত্যাশিত ছিল না। তবে তাদের বাড়ানোর মাত্রাটা আশ্চর্যান্বিত করেছে। তিনি বলেন, এর ফলে পণ্যের দাম বাড়বে, চাহিদা কমে যাবে।
অন্যদিকে আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপরও অতিরিক্ত শুল্কারোপ করা হয়েছে। যেমন চীনের ওপর ৩৪ শতাংশ, ভিয়েতনাম ৪৬ শতাংশ, কম্বোডিয়া ৪৯ শতাংশ এটা আমাদের চেয়ে বেশি। এখান থেকে আমরা সুবিধা নিতে পারব। অন্যদিকে ভারতে ২৭ শতাংশ, পাকিস্তানে ২৯ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। এটা আমাদের চেয়ে কম। এখানে তারা বেশি সুবিধা নেবে। অর্থাৎ সব দিক থেকেই প্রভাব পড়বে।
অতিরিক্ত শুল্কারোপের কারণে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা জানিয়ে এই অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ বলেন, ইতিমধ্যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও চীন বলেছে তারাও অতিরিক্ত শুল্কারোপ করবে। এতে করে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হবে। ফলে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এটা আমাদের জন্য ভালো খবর হবে না।
এখন আমাদের করণীয় কী, জানতে চাইলে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করা যেতে পারে। তাদের জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে যে, কী বিবেচনা বা হিসাবে এই শুল্কারোপ করা হয়েছে।
