ঈদুল ফিতরের ছুটির শেষ দিনে বরিশালের নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল যেন এক দুঃসহ মানবস্রোতের নাম। কর্মস্থলে ফেরার তাড়ায়, রাজধানীমুখী মানুষের ঢল আর সেই সঙ্গে বাড়তি ভাড়া, যান সংকট ও দুর্ব্যবহার— সব মিলিয়ে রীতিমতো দুর্ভোগযাত্রায় রূপ নিয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের সড়কপথ।
শনিবার (৫ এপ্রিল) সকাল থেকেই সরেজমিনে দেখা গেছে, বাস কাউন্টারগুলোতে ভিড়, অপেক্ষা, হতাশা আর কান্না মিশে এক বেদনাবিধুর চিত্র।
ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করা বাকেরগঞ্জ উপজেলার বাদলপাড়া এলাকার রোকেয়া বেগম (৫০) অসহায় কণ্ঠে বললেন, ‘ভাইরে ভাই, এ্যা বুজলে জীবনেও বাসে রওয়ানা দিতাম না। পা হালাইলেই ভোগান্তি। ৫শ টাহার ভাড়া ৮শ টাহা দিয়াও টিকিট পাই না। ঈদে আর কস্মিনকালেও বাসে উডমু না।’
রোকেয়ার চোখে ছিল নিঃসঙ্গতা, সঙ্গে হতাশা। বললেন, ‘লঞ্চে ম্যালা ভিড় হুইন্না আইছি টার্মিনালে। এইহানেও মউতের ভিড়। ঠেলাঠেলি, মারামারি— সবই হইতাছে। শেষমেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের দোতলা বাসে ৬০০ টাকা দিয়া উঠছি।’
বাবুগঞ্জের দেহেরগতি ইউনিয়নের বাসিন্দা মুসলিম মাঝি জানালেন, গোল্ডেন লাইন পরিবহনের টিকিট কেটেছিলেন, কিন্তু বাসটি রহমতপুর থেকে তাকে না নিয়েই চলে গেছে। এখন আশঙ্কায় আছেন— টাকাটা আদৌ ফেরত পাবেন কি না।
কবিরুল ইসলাম নামে এক যাত্রী অভিযোগ করেন, ‘বিএমএফ কাউন্টারে গিয়া টিকিট চাইছি। ওরা সারা বছর সাড়ে ৩শ থেকে ৫শ টাকায় ঢাকা নিছে, এখন ৬শ থেকে ৭শ টাকায় বিক্রি করতাছে। আমি জিগাইলে দুইজনে কলার ধইরা চড়-থাপ্পড় দিছে। এইটাই কি যাত্রীসেবা?’
এদিন সকাল ৯টার দিকে নথুল্লাবাদ টার্মিনাল পরিণত হয় যাত্রীদের হাহাকারের মঞ্চে। নারী, পুরুষ, শিশু— সব বয়সী মানুষ কাউন্টারগুলোর সামনে অপেক্ষা করেছে দীর্ঘ সময়।
পারুল নামে এক নারী যাত্রী বললেন, ‘দেড় ঘণ্টা ধইরা লাইনে দাঁড়ায়া টিকিট পাই না। ভাড়া বেশি চাইতাছে, আমার হাতে টাকা নাই। বেশি ভাড়া দিলে ঢাকা নেমে বাসায় যাইতে পারুম না। আগের ভাড়ার জন্য অপেক্ষা করতাছি।’
এদিকে বাসচালক নিজাম হোসেন পরিস্থিতির পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, ‘যাত্রী অনেক, কিন্তু কেউ দুই-চার টাকা বেশি দিতেও চায় না। আমরা তো খালি বাস নিয়াই বরিশাল আসি। সেই খরচ তো তুলতে হইব। তাই ৫০-১০০ টাকা বাড়তি নিচ্ছে অনেকে।’
বরিশাল বিআরটিসি ডিপো ম্যানেজার জামিল হোসেন জানান, যাত্রীচাপ সামলাতে ঢাকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ দোতলা বাসগুলো বরিশাল-ঢাকা রুটে যুক্ত করা হয়েছে।
বিআরটিএ বরিশালের সহকারী পরিচালক সৌরভ দাস জানান, ‘যাত্রী হয়রানি রোধে আমরা বিভিন্ন বাস টার্মিনালে অভিযান চালাচ্ছি। আমি নিজে নথুল্লাবাদে অবস্থান করছি।’
র্যাব-৮-এর অধিনায়ক নিস্তার আহমেদ বলেন, ‘ঈদের আগে মানুষ যেমন নিরাপদে বাড়ি ফিরেছে, তেমনি যেন কর্মস্থলেও নিরাপদে ফিরতে পারে সেজন্য আমরা কাজ করছি। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সেজন্য র্যাব কঠোর অবস্থানে রয়েছে।’
