গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তির পকেট থেকে যাচ্ছে ৬৫% টাকা

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৫, ০৭:২৬ এএম

দেশে গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় হচ্ছে ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ব্যয় করছে মোট ব্যয়ের মাত্র ২৭ শতাংশ বা ১০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ৭৩ শতাংশ বা ২৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ব্যক্তির পকেট থেকে যাচ্ছে ৬৫ শতাংশ অর্থ। অবশিষ্ট ৭ শতাংশ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা ও ১ শতাংশ অর্থ আসছে স্বেচ্ছাসেবী স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো থেকে।

সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের সর্বশেষ ‘উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মানুষের অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যসেবায় (ইএসপি) ব্যয়’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়।

গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি ও বেসরকারি মিলে ব্যয় হচ্ছে ৭৭ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা। এর মধ্যে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যসেবায় (ইএসপি) ব্যয় হচ্ছে ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা স্বাস্থ্যসেবায় মোট ব্যয়ের ৪৯ শতাংশ।

গ্রামের মানুষের এই ব্যয়ের মধ্যে রোগ নিরাময়ে ব্যয় হচ্ছে ৭৫ শতাংশ অর্থ ও ছয় ভাগের এক ভাগ বা এক ষষ্ঠাংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে রোগ প্রতিরোধে। এমনকি রোগ নিরাময়ে মোট ব্যয়ের দুই তৃতীয়াংশ যাচ্ছে নারীদের ক্ষেত্রে।

গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় এই ব্যয়কে অপ্রতুল বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন চিকিৎসায় যে ব্যয়, এই টাকা দিয়ে কিছুই হবে না। তাছাড়া ইএসপি কার্যকর না। প্যাকেজে যেসব সেবার কথা লেখা থাকে, সরকারি হাসপাতালে সেগুলো পাওয়া যায় না। সরকারও এ ব্যাপারে সচেষ্ট না।

এমনকি সরকার যে ব্যয় করছে, স্বাস্থ্যসেবার পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে সেই ব্যয়ের সেবাটুকুও মানুষ পাচ্ছে না বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে সরকার যে খরচ করছে, সেখান থেকে মানুষ কাক্সিক্ষত সেবাটুকুও পাচ্ছে না। সরকার যে টাকা দিচ্ছে ও মোট যে ব্যয় হচ্ছে সেটা যদি ঠিকমতো ব্যয় হতো, তাহলে এখনকার চেয়ে তিনগুণ বেশি সেবা পেত মানুষ।

সর্বোচ্চ ব্যয়েও উপেক্ষিত নারী : স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের হিসেবে, দেশে বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে মাতৃ, নবজাতক, শিশু ও কৈশোর স্বাস্থ্যসেবায় সর্বোচ্চ ব্যয় হচ্ছে। এই ব্যয় মোট ব্যয়ের ৪২ শতাংশ বা ১৬ হাজার কোটি টাকা। এখানে জনপ্রতি বছরে ব্যয় ৯৪৩ টাকা। এর মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২৯৪ টাকা ও বেসরকারি খাতে ব্যয় হচ্ছে ৬৪৯ টাকা। অথচ এখনো দেশে নারী স্বাস্থ্যসেবা উপেক্ষিত এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে মাতৃ মৃত্যু বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রতি হাজারে ২০ জন নবজাতকের মৃত্যু হয়। এক বছর বয়সী শিশু হাজারে ২৫ জন এবং পাঁচ বছরের নিচে ৩১ জন মারা যায়। মাতৃমৃত্যুর অনুপাত প্রতি লাখে ১৫৬ জন। কৈশোরকালীন গর্ভধারণ করে ২৪ শতাংশ। গর্ভকালীন একবার সেবা নেয় ৮৪ শতাংশ এবং চারবার সেবা নেয় মাত্র ৪১ শতাংশ। দক্ষ সেবা প্রদানকারী দ্বারা প্রসব সেবার হার ৭০ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব সেবার হার ৬৫ শতাংশ।

এ ব্যাপারে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের সভাপতি ও স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, স্বাস্থ্যে এসডিজি লক্ষমাত্রা অর্জনে নবজাতকের মৃত্যু হাজারে ১২ জনে, পাঁচ বছরের নিচে শিশুমৃত্যু হাজারে ২৫ জনে এবং মাতৃমৃত্যু প্রতি লাখে ৭০ জনে নামিয়ে আনতে হবে। আমাদের হাতে আছে আর পাঁচ বছর। আমরা অনেকখানি অর্জন করেছি। তবুও চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছি। এ সময়ের মধ্যে নবজাতক ও মাতৃমৃত্যু নামিয়ে আনা কঠিন। এ বিষয়ে যতটা জোর দেওয়া দরকার এখনো ততটা জোর দেওয়া হচ্ছে না।

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, অপরিণত বয়সে বিয়ে এবং গর্ভধারণ রোধ করাতে হবে। কারণ এদের মাতৃমৃত্যু সংখ্যা বেশি। গর্ভকালীন সেবা বাড়াতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী গর্ভকালীন আটবার সেবা দেওয়া দরকার। কিন্তু চারবারও সেবা নিতে যায় না। গর্ভকালীন মায়েদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। তাদের পুষ্টি নিশ্চিত করা না গেলে গর্ভের সন্তানের ওপরও সেই প্রভাব পড়ে। সন্তান প্রসবের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মাতৃমৃত্যু বেশি হয়। এই মৃত্যু রোধে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে। বাড়িতে হোক আর হাসপাতালে, সন্তান প্রসব হতে হবে দক্ষ মিডওয়াইফের দ্বারা।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় অসংক্রামক রোগে : স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, রোগের দিক থেকে গ্রামাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় হচ্ছে অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায়, যা মোট ইএসপি ব্যয়ের ২৫ শতাংশ বা ৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এ টাকা ব্যয় হচ্ছে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং ছোটখাটো আঘাত বা জখমের চিকিৎসায়। তৃতীয় সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে ডেঙ্গু, এইডস, যক্ষ্মাসহ এমন ধরনের রোগ এবং তথ্যকণিকা প্রচার ও অন্যান্য কিছু রোগের চিকিৎসায়। এরপর সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় ৬ শতাংশ এবং পুষ্টিতে ৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

বেশি ব্যয় ওষুধে : গ্রামের মানুষ বেশি ব্যয় করছে ওষুধে, যা মোট ব্যয়ের ৪১ শতাংশ অর্থ। এর পরিমাণ বছরে ১৫৭ বিলিয়ন বা ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে ভর্তি থাকা রোগীদের রোগ নিরাময়ে। তৃতীয় সর্বোচ্চ ১৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে হাসপাতালের বাইরের রোগীদের রোগ নিরাময়ে। এ ছাড়া তথ্য, শিক্ষা ও কাউন্সেলিংয়ে ১১ শতাংশ, গবেষণা ও উন্নয়নে ৭ শতাংশ বা ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, ল্যাবরেটরি সার্ভিসে ৫ শতাংশ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং এপিডেমিওলজিক্যাল সার্ভিলেন্স, ঝুঁকি ও রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে ৩ শতাংশ করে, গভর্ন্যান্স ও সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে ২ শতাংশ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি কর্মসূচিতে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ, স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ, শুরুতেই রোগ নির্ণয় কর্মসূচিতে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

আজ বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস : এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘জন্ম হোক সুরক্ষিত, ভবিষ্যৎ হোক আলোকিত’। দিবসটি উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাণী দিয়েছেন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনে দিবসটি পালিত হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নানা অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সেমিনার, স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রদর্শনী, সড়কদ্বীপ সজ্জিতকরণ এবং চলচ্চিত্র প্রদর্শনী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত