বর্ষবরণের আনন্দ শোভাযাত্রার ‘মোটিফ’-এর শিল্পী মানবেন্দ্র ঘোষের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে শিল্পীর পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘মানবেন্দ্র ঘোষের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে।’ আবার ঘটনার পেছনে আওয়ামী লীগের হাত দেখছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে জানিয়েছেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।
দেশ রূপান্তরের মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সদর উপজেলার গড়পাড়ায় শিল্পী মানবেন্দ্র ঘোষের বাড়িতে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গত মঙ্গলবার রাতের কোনো এক সময় এ ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা। আগুনে বাড়ির একটি ঘর সম্পূর্ণভাবে পুড়ে গেছে।
ভাস্কর্যশিল্পী মানবেন্দ্র ঘোষ গণমাধ্যমকে বলেছেন, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে তিনি ঢাকায় চারুকলার আয়োজনে শোভাযাত্রার জন্য বাঘের মোটিফ তৈরি করেছিলেন। তবে স্থানীয়ভাবে গুজব রটে যে, এটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখাকৃতি ছিল। এর জেরেই হামলার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজ করিনি। শিল্পের প্রয়োজনেই বাঘের মোটিফ বানিয়েছিলাম। এখন আমি ও আমার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। সরকারের কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানাচ্ছি।’
খবর পেয়ে মানিকগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমান উল্লাহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ওসি বলেন, ‘অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। বিষয়টি খুব গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।’
উল্লেখ্য, ভাস্কর মানবেন্দ্র ঘোষের বাড়ি সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের বাড়ির পাশেই। ফলে ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ধারণা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এ ঘটনায় স্থানীয় সংস্কৃতি অঙ্গনের ব্যক্তিরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং শিল্পীর নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় প্রশাসনের কার্যকরী পদক্ষেপ দাবি করেছেন।
ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর পুরো জেলায় সমালোচনার ঝড় বইছে।
জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে ব্যবস্থা : প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, মানবেন্দ্রের বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার ইয়াছমিন খাতুন বলেছেন, ‘ইতিমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে পুলিশ। তদন্ত চলছে। কারও জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে দ্রুততম সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
যা বললেন মানবেন্দ্র : স্থানীয় গণমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, পহেলা বৈশাখের আগের দিন থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। তিনি বলেন, ‘পহেলা বৈশাখের বাঘের মোটিফ তৈরি করেছি আমি। হুমকি পাচ্ছিলাম। তবে শেখ হাসিনার মুখাবয়ব তৈরি করিনি। ফেসবুকে দেওয়া হুমকির বিষয়ে মঙ্গলবার সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করি। আমি ও আমার পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক মানোয়ার হোসেন মোল্লা গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘তদন্তের মাধ্যমে আগুনের নেপথ্যের সঠিক কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। পুড়ে যাওয়া বাড়িটি মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আবার নির্মাণ করে দেওয়া হবে।’
আওয়ামী লীগের হাত : ফেসবুকে এক পোস্টে ঘটনার পেছনে আওয়ামী লীগের হাত দেখছেন বলে জানিয়েছেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন তিনি।
তিনি লিখেছেন, ‘শিল্পী মানবেন্দ্র ঘোষের বাড়িতে যারা হামলা করেছে তাদের ধরার জন্য পুলিশ কাজ শুরু করেছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা পুলিশের আইজিকে পরিষ্কার নির্দেশনা দিয়েছেন।’
ঢাবি সাদা দলের উদ্বেগ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাক্তন ছাত্র ভাস্কর মানবেন্দ্র ঘোষের বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাকে ন্যক্কারজনক আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ এবং উদ্বেগ জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। গতকাল বুধবার সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান, যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম এবং অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার এক যৌথ বিবৃতিতে এই নিন্দা জানান।
নেতৃবৃন্দ বলেন, বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা ১৪৩২ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তবে আগের দিন দুষ্কৃতিরা ফ্যাসিবাদের প্রতিকৃতি ও পায়রার মোটিফ পুড়িয়ে দিয়েছে। তারপরও সংশ্লিষ্ট শিল্পী ও শিক্ষার্থীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মোটিফগুলো মেরামত ও পুনর্র্নির্মাণ করে আনন্দ শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই দুষ্কৃতিরা গত মঙ্গলবার রাতে চারুকলা অনুষদের অ্যালামনাই শিল্পী ভাস্কর মানবেন্দ্র ঘোষের বাড়িতে আগুন দিয়েছে। কারণ তিনি অ্যালামনাই শিল্পীদের সঙ্গে নিয়ে মোটিফ নির্মাণে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করেছেন। এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং ন্যক্কারজনক।
দুষ্কৃতিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ঢাবি সাদা দলের নেতৃবৃন্দ। তারা বলেন, গত কয়েকদিন ধরে শোভাযাত্রার কার্যক্রমে যুক্ত বেশ কয়েক জনকে ভিনদেশি ফোন নম্বর থেকে ভয় দেখানো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা কটূ কথা প্রচার করা হচ্ছে।
