আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে জটিল হচ্ছে। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দল, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে অংশগ্রহণমূলক অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না। পরে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন। ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দেন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
সাত মাস ধরেই রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের প্রতি নির্বাচনের রোডম্যাপ প্রকাশের দাবি জানাচ্ছে। তারা মনে করেন, রোডম্যাপ না থাকায় সরকারের ইচ্ছা নিয়ে সংশয় তৈরি হচ্ছে। তবে এখনই দলগুলো বিশেষ করে বিএনপির পক্ষ থেকে বড় ধরনের আন্দোলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে। তারা নির্বাচনের প্রস্তুতি ও আন্দোলনের চাপ তৈরির জন্য তিন মাসের খসড়া কর্মসূচি নিয়ে রেখেছেন। এদিকে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্বাচন যত দ্রুত সম্ভব হওয়া উচিত। কারণ, নির্বাচন যত বেশি পেছাবে, তত বেশি ঝুঁকি বাড়বে। অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও নির্বাচিত সরকার ছাড়া বিনিয়োগে আস্থা পাচ্ছে না।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘নির্বাচন হতেই হবে। আজ হোক বা কাল।’ তিনি মনে করেন, ‘যে দল যত বেশি মনে করছে ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ রয়েছে তারা তত বেশি সোচ্চার।’ জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠানের (জানিপপ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, ‘দূর থেকে কথা বলার চেয়ে একসঙ্গে কথা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও কথা বলা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ও বিএনপির এ ধরনের বৈঠক সফল বা নিষ্ফলের চেয়ে বৈঠক হয়েছে এটাই গুরুত্বপূর্ণ।’
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংস্কার কেন ভোটাধিকার আর গণতন্ত্রের বিকল্প হবে। যে ভোটাধিকারের জন্য ১৫ থেকে ১৬ বছর সংগ্রাম করেছি, সেই ভোটাধিকার কেন বিলম্বিত হচ্ছে?’
রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, নির্বাচন কখনই জুনের পরে যাবে না। এটা প্রধান উপদেষ্টার পুরো জাতির প্রতি অঙ্গীকার। আইন উপদেষ্টা নির্বাচনের তারিখ নিয়ে সব মহলের সংশয় কাটাতেই জুনের পরে নয়, এটা বলেছেন।
তারা আরও মনে করেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বিএনপিসহ অন্য দলগুলোর বৃহস্পতিবার বৈঠক হয়েছে। সেখানেও নিশ্চয় বার্তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, কেন ডিসেম্বরে নির্বাচন দেওয়া সম্ভব নয়। ইতিমধ্যে আইন উপদেষ্টা বলেছেন, ন্যূনতম সংস্কার না করে নির্বাচন দিয়ে দিলে তারা জাতির কাছে কী বলবেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতার মতে, ‘বিএনপি কেন ডিসেম্বরের কথা বলছে, জুনে নয় কেন। বিএনপি এজন্য বলছে, কারণ সে সময় আবহাওয়া অনুকূলে থাকে না। ১৯৯৬ সালে ১২ জুন নির্বাচন হয়েছে। এটা উদাহরণ হতে পারে। কিন্তু সেটি বাধ্যবাধকতা ছিল। ১২ জুনের নির্বাচন বাতিল হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ পরিস্থিতিতে নির্বাচন হয়েছিল। কিন্তু এখন তো বিশেষ পরিস্থিতি নয়।’ তিনি জানান, ডিসেম্বরে নির্বাচন না হলে বিএনপি কি মৃদু চাপ রাখবে নাকি অন্য দলগুলোকে নিয়ে আন্দোলনে যাবে; এটা তখনই হবে যখন এ সরকারের প্রতি অনাস্থা তৈরি হবে। তার আগে বড় ধরনের কোনো কর্মসূচিতে বিএনপিসহ শরিক দলগুলো আন্দোলনে যাবে না। তাই বিএনপি এখনো বলছে তারা মাঠের কর্মসূচির কথা ভাবছে না। তারা চাপ অব্যাহত রেখে যাবে। তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে, এই টানাপড়েন কেন? এটা হতে পারে কোনো কোনো দল দেরিতে নির্বাচন হলে গুছিয়ে নিতে পারবে। বিএনপি মনে করে, যত দ্রুত নির্বাচন হবে তারা লাভবান হবে। কারণ তাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ এখন মাঠে নেই। জামায়াত বা অন্য দল বিএনপির সঙ্গে সেভাবে ভোটের হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারবে না।
ড. ইমতিয়াজ আরও বলেন, ‘বিএনপি ও জামায়াত দূরত্ব মোটামুটি ঘুচিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কারণ বিএনপি ডিসেম্বরে আর জামায়াত মোটামুটি ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন চাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে জানুয়ারিতে নির্বাচন হতে পারে বলে আমি মনে করি। জামায়াতের এ অবস্থার কারণ তারা মনে করছে একা কুলিয়ে উঠতে পারবে না। আবার যারা মনে করছে নির্বাচন পিছিয়ে দিলে তারা গুছিয়ে উঠতে পারবে, তাদের বিষয়ে আমি মনে করি নির্বাচন যত বেশি পেছাবে তত বেশি ঝুঁকি বাড়বে। জনগণের সাপোর্ট যে এ সময় তাদের পক্ষে থাকবে এটা নাও হতে পারে। ইতিমধ্যে সাত-আট মাসে জনগণের মনোভাবের অনেক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে।’
এ বিশেষজ্ঞের মতে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মনে করছে, সরকার বলেছে জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে। সে ক্ষেত্রে কোনো বিনিয়োগকারীই এ স্বল্প সময়ের মধ্যে তাদের বিনিয়োগ ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে না। সবাই চায় তাদের বিনিয়োগ নিরাপদ থাকুক। কারণ কে ক্ষমতায় আসছে তাদের পলিসি কী হবে সেটা কিন্তু বিনিয়োগকারীরা বলতে পারছে না। নির্বাচন যত বেশি দেরি হবে দেশের অর্থনীতিতে তত বেশি প্রেশার বাড়বে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় গণতান্ত্রিক দেশগুলো নির্বাচনের মাধ্যমে স্থায়ী সরকার চাচ্ছে। যাতে তারা বিনিয়োগের জন্য আস্থা পেতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তো বলেই দিয়েছে, নির্বাচিত সরকার ছাড়া তারা বড় ধরনের বিনিয়োগে যাবে না। গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের সফররত দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিকোল চুলিকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপি, জামায়াত, এনসিপির শীর্ষ নেতারা। সেখানেও নির্বাচন দ্রুত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে মনে হয়।
নির্বাচন নিয়ে গতকাল গুলশানে হোটেল ওয়েস্টিনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সফরের বিষয়াবলি জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি বলিনি, ফেব্রুয়ারির ভেতরে নির্বাচন হতে হবে। অনেকগুলো কারণে বলেছি, ফেব্রুয়ারিতে চয়েজ করা যায়। প্রয়োজনে একটু এগোতে পারে, পেছাতে পারে। আমরা সাড়ে ১৫-১৬ বছর অপেক্ষা করতে পেরেছি; আরও এক-দুই মাস অপেক্ষা করতে পারব।’
তিনি বলেন, ‘আমরা ধারণা করি, প্রধান উপদেষ্টা তার কথার মর্যাদা রক্ষা করবেন এবং যেভাবে মির্জা (মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর) সাহেব বলেছেন, কাট অফ টাইম... আমরা ওরকম কথা বলতে চাচ্ছি না। কারণ এটা ওইরকম ফিক্সআপ করে দিলে এটা পয়েন্ট অব নো রিটার্নের মতো হয়ে যায়। প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী বছরের জুনের মধ্যে ইলেকশন হবে। আনুষঙ্গিক প্রস্তুতির জন্য, সংস্কারের জন্য, বিচারের জন্য আমরা মনে করি যে, এই সময়টা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু এ সময়ের সীমা যেন অতিক্রম করে না যায় সেই ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখব। গতকাল (বুধবার) আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। আমি বলেছিলাম রোজা শুরু হওয়ার আগে আগামী ফেব্রুয়ারিতে এটা (নির্বাচন) হতে পারে।’
তবে বুধবার ঢাকা সফররত মার্কিন কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘ন্যূনতম সংস্কার নয় বরং রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের জন্য কাজ করছি। এ পরিবর্তনগুলো ছাড়া নির্বাচন হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। সেই নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টি অংশগ্রহণ করবে কি না, সেটাও বিবেচনাধীন থাকবে।’
