গণহত্যার জন্য ক্ষমাসহ তিন বিষয়ে সুরাহা চাইল ঢাকা

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৫, ০৬:২৫ এএম

পাকিস্তানকে ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য ক্ষমা চাইতে বলল বাংলাদেশ। সাধারণ ক্ষমা চাওয়া নিয়ে আলোচনা চালিয়ে নিতে একমতও হয়েছে পাকিস্তান। বাংলাদেশ মনে করে, অমীমাংসিত বিষয়গুলো মীমাংসা হওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। ১৫ বছর পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশের পক্ষ থেকেই সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়েও একমত পোষণ করা হয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব জসীম উদ্দিন এ কথা বলেন। এর আগে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালুচ পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ ছাড়া সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা অনুসন্ধানে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, বৈঠক ফলপ্রসূ হয়েছে। এই বৈঠকের পর আমনা বালুচ বলেন, বাংলাদেশে এসে খুশি লাগছে।

এদিকে দীর্ঘ সময় পর দুই দেশের মধ্যে এমন আলোচনাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ইসলামাবাদের সঙ্গে ঢাকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধিতে দুই দেশকেই মনোযোগী হতে হবে। এ ছাড়া আলোচনায় একাত্তরের অমীমাংসিত বিষয়গুলোও আসতে পারে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক হুমায়ুন কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিবের ঢাকা সফর অবশ্যই ইতিবাচক। তিনি বলেন, এই বৈঠকটির মধ্যে দুই দেশের যে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা এসেছে, তাতে অমীমাংসিত বিষয়ের সমাধানের পথও রয়েছে।

প্রায় ১৫ বছর পর গতকাল ঢাকা ও ইসলামাবাদের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে আলোচনা ফরেন অফিস কনসালটেশন (এফওসি) অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল সকালে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় আয়োজিত এফওসিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিন এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালুচ তাদের নিজ নিজ পক্ষের নেতৃত্ব দেন। বৈঠককালে, উভয় পক্ষ দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোর সামগ্রিক দিক, বিশেষ করে বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন।

বৈঠকের পর বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্রিফ করেন পররাষ্ট্র সচিব। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘আমরা বিষয়টি উত্থাপন করেছি ন্যায্যতা ও ঔচিত্যের দিক থেকে। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, আমরা পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলকে বলেছি, বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক এখন যে জায়গায় দাঁড়িয়েছে সাম্প্রতিককালে উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতার কারণে সেটিকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে গেলে আমাদের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মীমাংসা আশু প্রয়োজন। আমরা বৈঠকে একটি শব্দ ব্যবহার করেছি শক্ত ভিত্তি। আমরা বলেছি, একটি মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর জন্য এ বিষয়গুলোর মীমাংসা হওয়া উচিত।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর গণহত্যার জন্য দেশটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা উত্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের এখন যে সম্পর্ক এ সময় এ বিষয়গুলো সমাধান করার জন্য একটি উপযুক্ত সময়।’ আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফেরত পাঠানোর বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত ১ লাখ ২৬ হাজার ৯৪১ জন আটকে পড়া পাকিস্তানি নাগরিক সেখানে ফিরে গেছে। বাকি আছে ৩ লাখ ২৪ হাজার ১৪৭ জন, যারা ১৪টি জেলায় ৭৯টি ক্যাম্পে বসবাস করছে।’

জসীম উদ্দিন বলেন, ‘স্বাধীনতা-পূর্ব ক্ষতিপূরণ হিসাবে বাংলাদেশ ক্ষতিপূরণ বাবদ ৪৩২ কোটি ডলারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা স্থবির সম্পর্ককে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি এবং সেটি আমরা সম্পূর্ণরূপে আমাদের জাতীয় স্বার্থ মাথায় রেখে করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বৈঠকে দুদেশই অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। শিগগিরই পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি ফ্লাইট চালু হবে। জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি মাথায় রেখেই দেশটির সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করছি। তবে তাদের দিকে ঝোঁকার কোনো বিষয় নেই।’

২৭ এপ্রিল ঢাকায় আসছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী : পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার আগামী ২৭ এপ্রিল ঢাকা আসছেন। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব জসীম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরের তারিখ চূড়ান্ত করেছি, এ মাসের ২৭-২৮ তারিখে তিনি ঢাকা আসবেন। আজকের এ বৈঠকে দুদেশের মধ্যে যেসব সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা হয়েছে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরকে মাথায় রেখে চূড়ান্ত করার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পাকিস্তান দূতাবাসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করছি। যাতে আমাদের লাইন মিনিস্ট্রিগুলোর সঙ্গে বসে সমঝোতা স্মারকগুলো পর্যালোচনা করতে পারি এবং চূড়ান্ত করতে পারি।’

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার : প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা অনুসন্ধানে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি যমুনায় পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালুচ প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এই আহ্বান জানান। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। এসব কাটিয়ে ওঠার উপায় আমাদের খুঁজে বের করতে হবে এবং সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের নিজেদের আয়ত্তে বিশাল আন্তঃবাজার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এটি ব্যবহার করা উচিত। আমরা প্রতিবার “বাস মিস” করতে পারি না। দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে নিয়মিত পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সবপর্যায়ে দুদেশের মধ্যে সফর আয়োজনের প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন পাকিস্তানি এই আমলা।’

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফপিসিসিআইয়ের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে এবং বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আশা প্রকাশ করেন, এপ্রিলের শেষদিকে দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দারের আসন্ন সফর দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জোরদার করবে। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সার্কের কাঠামোয় পাকিস্তানসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তিনি সব সময়ই পছন্দ করেন।

তিনি আরও বলেন, জনগণের মধ্যে বন্ধন বাড়াতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের উচিত দুই দেশের মধ্যে আরও বেশি যুব ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বিনিময় করা। আমাদের সম্পর্ক হিমশীতল হয়ে যাওয়ায় আমরা দীর্ঘদিন একে অন্যকে মিস করছিলাম। আমাদের প্রতিবন্ধকতাগুলো অতিক্রম করতে হবে।’

প্রধান উপদেষ্টা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৯তম অধিবেশনের ফাঁকে এবং ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ডি-৮ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে কায়রোতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে তার বৈঠকের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতির ক্ষেত্রে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সার্ক, ওআইসি ও ডি-৮-এর মতো বহুপক্ষীয় ও আঞ্চলিক ফোরামে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাবে। এ সময় এসডিজিবিষয়ক সিনিয়র সচিব লামিয়া মোরশেদ ও বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার সৈয়দ আহমেদ মারুফ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে বুধবার দুপুরে ঢাকা এসে পৌঁছান পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালুচ। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (দক্ষিণ এশিয়া অনুবিভাগ) ইশরাত জাহান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত