ফাহমিদুলের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখছি

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৫, ১২:১২ এএম

আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির অধীনে অলিম্পিক সলিডারিটির স্কলারশিপ নিয়ে আন্তর্জাতিক কোচিং কোর্স করতে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে অবস্থান করছি। দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া টানা পাঁচদিন আট ঘণ্টা করে হাঙ্গেরি ইউনিভার্সিটি অব স্পোর্টস সায়েন্সেই কাটাতে হয়। ব্যস্ত দিনগুলোর মধ্যেই বাংলাদেশের তরুণ ফুটবলার ফাহমিদুল ইসলামের খেলা দেখতে ইতালিতে গিয়েছিলাম। ১৮ বছরের তরুণ এর মধ্যেই পরিচিতি পেয়ে গেছেন দেশের ফুটবল অঙ্গনে। হচ্ছে নানা আলোচনা। অলবিয়া কালসিও ১৯০৫ ক্লাবের হয়ে ইতালির চতুর্থ বিভাগে খেলেন ফাহমিদুল। মাঠে বসে তার খেলা দেখার অভিজ্ঞতা দেশের ফুটবল সমর্থকদের কাছে পৌঁছে দিতেই হাঙ্গেরির জাতীয় ছুটির দিনে লিখতে বসা।

পয়েন্ট টেবিলের দশম স্থানে থাকা অলবিয়ার প্রতিপক্ষ ছিল এই মৌসুমে অবনমন নিশ্চিত করা তেরাচিনা কালসিও। ম্যাচটি শেষ হয় গোলশূন্য ড্রয়ে। পাহাড় ও সমুদ্রের মধ্যে অবস্থিত স্টেডিয়ামে খুব একটা দর্শক নেই। গুটিকয়েক যারা ছিলেন, গানের সঙ্গে গলা মিলিয়ে তারাই মাতিয়ে রাখলেন হোম দল তেরাচিনাকে।

এক সময় জাতীয় দলে খেলেছি। এরপর ক্রীড়া সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ফর্টিস এফসির ম্যানেজার ও জুনিয়র দলের সহকারী কোচের দায়িত্বে আছি। সুবাদে দেশের ফুটবলকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণে দেখার সুযোগ হয়েছে। যেখানে গিয়েই ফুটবল দেখি, সেখানকার সঙ্গে বাংলাদেশের ফুটবলের তুলনাটা তাই চলেই আসে আমার ‘কিউরিয়াস মাইন্ডে।’ মোটা দাগে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের চেয়ে ইতালির চতুর্থ বিভাগ এগিয়ে আছে বলেই মনে হলো! এই তেতো সত্যিটা লুকিয়ে রাখলে সারা জীবন পেছনের সারিতেই থাকতে হবে। বরং প্রকাশ্যে আনলে উন্নতির রাস্তা খোঁজার কাজটা জোরালো হবে। তাই ভিন্ন দেশের ফুটবলের খোঁজখবর দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াটাও নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমি ফুটবল বোদ্ধা নই। তবে সাধারণ কিছু বিষয়ে চোখ রাখলে একটা লিগের স্ট্যান্ডার্ড বুঝতে পারার কথা। যেমন, ম্যাচের ইনটেনসিটি। ৯০ মিনিটের মধ্যে কত কম সময় বল মাঠের বাহিরে থাকে? খেলোয়াড়দের ভার্টিক্যাল (সামনের দিকে) পাস খেলার প্রবণতা বেশি না কম। ডিফেন্ডিং শেইপ। ট্রানজিশন রিঅ্যাকশন। এছাড়া খেলোয়াড়দের টেকনিক্যাল ও ফিজিক্যাল বিষয়গুলো তো আছেই। লাল-সবুজ জার্সিতে ফাহমিদুলের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখছি।

দ্বিতীয়ার্ধে রাইট উইঙ্গার হিসেবে বদলি নেমেছিলেন ফাহমিদুল। উইথ দ্য বল ভীষণ দ্রুতগতিসম্পন্ন একজন উইঙ্গার মনে হয়েছে তাকে এবং বলের ওপর ভালো নিয়ন্ত্রণ আছে। ডিফেন্ডিং ট্রানজিশনের সময় তার দ্রুত রিঅ্যাকশন আমার বেশি ভালো লেগেছে। টিম ডিফেন্ডিংয়ে শেইপ বজায় রাখতে যা খুব কার্যকর। দুই লিগের মানদণ্ড বোঝানোর সুবিধার্থে বলছি, আমার কাছে মনে হয়েছে দুই দলে যারা খেলেছেন তাদের মান বাংলাদেশ জাতীয় দলের ফুটবলারদের সমপর্যায়ে। বিশেষ করে পয়েন্ট টেবিলের দশম স্থানে থাকা ফাহমিদুলের দল অলবিয়া দলের খেলোয়াড়রা। এতেই ফাহমিদুলের মান সম্পর্কে একটা ধারণা করে নেওয়া যায়। ভালো মানের প্রবাসী ফুটবলাররা এসে বাংলাদেশ দলের শক্তি বাড়াচ্ছে। এজন্য বাফুফের নতুন কমিটির বাহবা প্রাপ্য। একই সঙ্গে নিজেদের ফুটবলার তৈরি, লিগের উন্নতিসহ বাংলাদেশের স্থানীয় ফুটবলাররাও কীভাবে দেশের বাইরে গিয়ে ভালো পরিবেশে খেলে নিজেদের উন্নতি ঘটাতে পারে, সে রাস্তাও আমাদের খুঁজতে হবে।

সেই পথ খুঁজতে গিয়েই কথা হলো অলবিয়া ক্লাবের সভাপতি ও স্পোর্টিং ডিরেক্টরের সঙ্গে। তার আগে বলে রাখি, ইতালির চতুর্থ বিভাগে ইউরোপের বাইরে থেকে দুজন ফুটবলার খেলার সুযোগ আছে। অলবিয়াতে এ মুহূর্তে কোনো বিদেশি ফুটবলার নেই। দলটিতে লাতিন ও আফ্রিকান ফুটবলার থাকলেও বর্তমানে তারা সবাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন পাসপোর্টধারী। দুপুরের খাবারের টেবিলে ২২ বছরের নিচে থাকা বাংলাদেশের তিন ফুটবলারের ব্যাপারে ক্লাব সভাপতি ও স্পোর্টিং ডিরেক্টরের সঙ্গে আলাপ হলো। এর মধ্যে একজন খেলোয়াড়ের ব্যাপারে আশাবাদী মনে হলো তাকে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমাকে কিছু প্রশ্নও করলেন। বাংলাদেশের ফুটবলার নিতে পারলে তাদের যে ভালো লাগবে, এই বিষয়টি আমার কাছে পরিষ্কার। বাংলাদেশের ফুটবলাররা যেন ইতালি গিয়ে অন্তত ট্রায়ালে অংশ নিতে পারেন, সেই কাজটি করে আসতে পেরেছি বলেই আমার বিশ্বাস।

আমার কাজটা হয়তো ছোট। তবে সুযোগটাকে বড় ধরে আমাদের ফুটবলারদের চেষ্টা করতে দোষ কী?

 লেখক : ম্যানেজার, ফর্টিস এফসি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত