ফুটবল ছিল পোপ ফ্রান্সিসের জীবনের এক অমূল্য অংশ। আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসে জন্ম নেওয়া হোর্হে মারিও বেরগোগ্লিও ছিলেন সান লরেনজো ক্লাবের নিবেদিতপ্রাণ সমর্থক। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ফুটবলের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও ক্লাবের প্রতি তাঁর আবেগ অটুট ছিল। সোমবার সকালে ৮৮ বছর বয়সে ভ্যাটিকানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান ধর্মীয় নেতা।
সান লরেনজোর আজীবন সদস্য (নাম্বার ৮৮,২৩৫) ছিলেন পোপ ফ্রান্সিস। ছোটবেলা থেকেই গ্যাসোমেত্রো স্টেডিয়ামে গিয়ে ক্লাবের খেলা উপভোগ করতেন। এমনকি ১৯৯৮ সালে কোচ আলফিও বাসিলের অধীনে খেলোয়াড়দের খেলার আগে আশীর্বাদ দিতে গিয়েও ড্রেসিংরুম থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল তাঁকে—কারণ কোচ ভেবেছিলেন, তাঁর উপস্থিতি হয়তো "অপয়া"।
তাঁর পোপ হওয়ার বছর ২০১৩-তে সান লরেনজো জাতীয় শিরোপা জেতে ছয় বছর পর, আর পরের বছরই ক্লাবটি প্রথমবারের মতো কোপা লিবার্তাদোরেস জয় করে। অনেকেই এই সাফল্যকে ‘পোপের অলৌকিক প্রভাব’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
২০২৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়—মেসি না ম্যারাডোনা- কে সেরা? পোপ সোজা বলেছিলেন, "আমি তৃতীয় একজনকে রাখব—পেলে। এই তিনজনকে আমি অনুসরণ করেছি। ম্যারাডোনা ছিলেন অসাধারণ খেলোয়াড়, কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে ব্যর্থ। মেসি একজন ভদ্রলোক। কিন্তু এই তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হৃদয়বান মানুষ ছিলেন পেলে।" তিনি জানান, একবার বিমানে পেলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তাঁর। সে সাক্ষাৎ ছিল হৃদয়ছোঁয়া।
পোপ হওয়ার মাত্র পাঁচ মাস পরেই তিনি ভ্যাটিকানে লিওনেল মেসিকে অভ্যর্থনা দেন তিনি। আর্জেন্টিনা ও ইতালির এক প্রীতি ম্যাচ উপলক্ষে এই আয়োজন হয়েছিল। মেসি তাঁকে জাতীয় দলের স্বাক্ষরিত জার্সি ও উপহারসামগ্রী দেন।
২০১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর, ডিয়েগো ম্যারাডোনা পোপের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এক চ্যারিটি ম্যাচের আগে। সেই সাক্ষাতের পর ম্যারাডোনা বলেন, “পোপ ফ্রান্সিস ম্যারাডোনার চেয়েও বড়।” তবে পোপ ফ্রান্সিস আক্ষেপ করেছিলেন, ম্যারাডোনার জীবনকে ঘিরে যারা ছিল, তারা তাকে সঠিক পথে নিতে পারেনি। "অনেক ক্রীড়াবিদই খারাপভাবে শেষ করেন,"—এভাবে আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
২০১৬ সালে সান লরেনজো ক্লাব তাদের নতুন স্টেডিয়ামের নাম 'পোপ ফ্রান্সিস স্টেডিয়াম' করার সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সম্মান গ্রহণ করেন। সেই সময় তাঁকে উপহার দেওয়া হয়েছিল তাঁর প্রিয় খেলোয়াড় রেনে পন্তোনির ছবি সম্বলিত জার্সি, পুরনো গ্যাসোমেত্রোর একটি অংশ এবং আরও স্মৃতিচিহ্ন।
পোপ ফ্রান্সিস ছিলেন শুধুমাত্র এক ধর্মীয় নেতা নন, তিনি ছিলেন একজন ফুটবলপ্রেমী, একজন সান লরেঞ্জো ভক্ত, যিনি ধর্ম, সংস্কৃতি ও খেলাধুলার অসাধারণ সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন নিজের জীবনে। তাঁর ভালোবাসা, হৃদয় এবং স্মৃতিগুলো চিরকাল থেকে যাবে ফুটবল ও বিশ্বাসের জগতে।
