নেত্রেকানা জেলার মদন পৌরসভার সাবেক মেয়র আব্দুল হান্নান তালুকদার তার দায়িত্ব পালনকালে পৌরসভার কয়েক কোটি টাকার একাধিক জায়গা জাল কাগজপত্র সৃজনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সম্পত্তি দেখিয়ে তা নিজেই কিনে নিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি ও তার ভাই যোগসাজশ করে টেন্ডার ছাড়াই হাট-বাজার কমমূল্যে দলীয় লোকজন ও আত্মীয়স্বজনকে ইজারা দিয়েছেন। আবার হাট-বাজার ইজারার টাকার ৪৪ লাখ আত্মসাৎ করেছেন। তিনি অনিয়ম, দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ লোপাট করে কোটি কোটি টাকার মালিকানা অর্জন করেছেন বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে তথ্য রয়েছে।
দুদকের তথ্যমতে, নেত্রকোনা জেলার মদন পৌরসভার মেয়র আব্দুল হান্নান তালুকদারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, হাট-বাজার ইজারার অর্থ লোপাট, টেন্ডার বাণিজ্য, অনিয়ম-দুর্নীতির ও সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগটি দুদকেও জমা হয়। কমিশন অভিযোগটি অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য অনুসন্ধান টিম গঠন করে। তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। ফলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের অনুসন্ধান আটকে থাকে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গত বছর ৫ আগস্টের পর অভিযোগটি অনুসন্ধানে গতি ফিরে আসে। দুদকের সহকারী পরিচালক রাকিবুল হায়াতের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের টিম অভিযোগটি অনুসন্ধান করছেন। টিমের অন্য সদস্য হলেন উপসহকারী পরিচালক আল-আমিন।
দুদকের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুদকের টিম অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি মেয়র হান্নানের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য জানাতে ব্যাংক, বীমা, সিটি করপোরেশন, রাজউক, ভূমি অফিস, রেজিস্ট্রি অফিস, রিহ্যাবসহ ৬০টি প্রতিষ্ঠানে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে তার স্ত্রী খুশনো চৌধুরী ও দুই সন্তানের সম্পদের তথ্য চাওয়া হয়েছে। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন দপ্তর থেকে তথ্য-উপাত্ত দুদকে জমা হয়েছে, যা এখন পর্যালোচনা চলছে।
দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়েছে, মদন পৌরসভার মেয়র আব্দুল হান্নান তালুকদার বিভিন্নভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে দলীয় ও বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে অনিয়ম করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। মদনপুর পৌরসভার হাট-বাজার ও স্ট্যান্ডসমূহ যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করে ঘনিষ্ঠজনদের নামে ইজারা দিয়েছেন। তিনি ও তার ভাই মিলিতভাবে হাট-বাজার ও স্ট্যান্ডসমূহের ইজারার অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেন। পৌর সভায় একাধিক প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে অনিয়ম হয়েছে। তিনি পৌরসভার একাধিক জমি কয়েক কোটি টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছেন এবং একাধিক স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। তার গ্রামের বাড়িতে কোটি টাকা খরচ করে নির্মাণ করেন আলিশান বাড়ি। দুই কোটি টাকা দিয়ে নিজ বাড়িতে প্রায় পাঁচ একর জায়গা কিনেছেন।
এদিকে সাবেক মেয়র হান্নানের পরিবারের সদস্যদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির আদেশ দিয়েছে আদালত। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছর ১৬ মার্চ ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. জাকির হোসেন গালিবের আদালত এ আদেশ দেন। আদালতের আদেশে সাবেক মেয়র মো. আব্দুল হান্নান তালুকদার, স্ত্রী খুশনো চৌধুরী, তিন ছেলে মুজিবুল হাসান খালেদ, রেজয়ানুল হাসান ইমন ও আবরার হাসানের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মদন পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন আব্দুল হান্নান তালুকদার। তিনি ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি মেয়র হিসেবে শপথ নেন এবং ২০২০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ সালের ১১ অক্টোবর দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে মদন উপজেলা আওয়ামী লীগের আগামী তিন বছরের জন্য সভাপতি হিসেবে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুস এবং সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হান্নান তালুকদারকে নির্বাচিত করা হয়।
