জিআই স্বীকৃতি পেল মুন্সীগঞ্জের পাতক্ষীর

আপডেট : ০১ মে ২০২৫, ০৭:৩৬ এএম

মুন্সীগঞ্জের ঐতিহ্য সিরাজদীখানের পাতক্ষীর ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের উদ্যোগে গতকাল বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন সুগন্ধার ফরেন সার্ভিস একাডেমির মাল্টিপারপাস হলে বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবসের আলোচনা সভায় এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন জেলা প্রশাসক আবুজাফর রিপন আবেদনটি করেছিলেন।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক ফাতেমা তুল জান্নাতের হাতে সনদ তুলে দেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান। আয়োজনটিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নিবন্ধিত ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিকভাবে সনদ দেওয়া হয়।

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক ফাতেমা তুল জান্নাত সনদটি গ্রহণ করে বলেন, জিআই সনদপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে এ পণ্যের মান ও স্বাতন্ত্র্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেল, যা স্থানীয় উৎপাদকদের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। পণ্যের মেধাসম্পদ সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের জিআই পণ্যের পরিচিতি বৃদ্ধিতে এ অনুষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, গবেষক, উদ্যোক্তা এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

একনজরে পাতক্ষীর : দুগ্ধ জাতীয় মিষ্টান্ন খাবারটির নাম পাতক্ষীর। কেউ বলেন ক্ষীরসা বা পাতাক্ষীর, আবার কেউ বলেন পাতক্ষীরা। খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু। ২০০ বছর ধরে ভোজনরসিকদের খাবার তালিকার প্রিয় মিষ্টান্ন খাবার এই পাতক্ষীর। দেশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে সুখ্যাতি। ইউরোপ ও আমেরিকার বাঙালি কমিউনিটির অনেকেই পাতক্ষীর কিনে নিয়ে যান। সেখানকার মিষ্টিপণ্যের দোকান বা সুপারশপেও বিক্রি করে থাকেন অনেকে। এ ছাড়া ফ্রান্স, ইতালি ও ভারত প্রবাসীরা প্রতি বছর এ পাতক্ষীর কিনে নিয়ে যান।

সিরাজদীখানের জগদ্বিখ্যাত পাতক্ষীর জিআই পণ্যের স্বীকৃতির খবর পৌঁছতেই উপজেলার সন্তোষপাড়া গ্রামের কারিগরদের মধ্যে বইছে আনন্দ বন্যা ও খুশির জোয়ার। এ খবরে তারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।

যেভাবে পাতক্ষীরের প্রচলন : সিরাজদীখানের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাতক্ষীর। মিশে আছে এ অঞ্চলের খাবার সংস্কৃতির সঙ্গেও। লিপিবদ্ধ কোনো ইতিহাস না থাকলেও মোগল আমলে ঢাকাবাসীর খাবার তালিকায় পাতক্ষীরের নাম পাওয়া যায়। লোকমুখে জানা যায় যে, প্রায় ২০০ বছর আগে বিক্রমপুর তথা সিরাজদীখানেই পাতক্ষীরের উৎপত্তি। সে সময় পুলিন বিহারী দেব নামে এক ব্যক্তির হাত ধরেই পাতক্ষীর আসে এ অঞ্চলে। উপজেলার রশুনিয়া ইউনিয়নের সন্তোষপাড়া গ্রামের ঘোষ বাড়িতে তিনিই প্রথমে তার স্ত্রীকে নিয়ে দুগ্ধ এ মিষ্টান্ন তৈরি শুরু করেন। তিনি ও তার স্ত্রীর তৈরি এ পাতক্ষীর সে সময় জেলার বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হতো। পুলিন বিহারী ও তার স্ত্রীর কাছ থেকে শিখে একই সময়ে ইন্দ্রমোহন ঘোষ এবং লক্ষ্মী রানী ঘোষের পরিবার তৈরি করতে শুরু করে এটি। এখন তাদের বংশধররাই বানাচ্ছেন এই ক্ষীর। উত্তরসূরি কার্তিক চন্দ্র ঘোষ, ভারতী ঘোষ, সুনীল চন্দ্র ঘোষ, রমেশ ঘোষ, বিনয় ঘোষ, মধুসূদন ঘোষ, সমীর ঘোষ ও ধনা ঘোষ এই পেশা ধরে রেখেছেন। এ পাতক্ষীর পারিবারিক ঐতিহ্য ও ব্যবসা হলেও পরিবারের মেয়েদের মিষ্টান্ন বানানোর রীতি শেখানো হয় না। এ পদ্ধতি রপ্ত করে পরিবারের পুত্রবধূরা। কেননা মেয়েরা বিয়ের পর অন্যত্র চলে যায়। তবে বর্তমানে দোকানের কারিগররাই পাতক্ষীর তৈরি করে থাকেন।

মুন্সীগঞ্জের যেসব দোকানে বিক্রি হয় এবং যেভাবে বানানো হয় : মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সিরাজদীখান বাজারে পাতক্ষীরের ১৭টি দোকান রয়েছে। এর মধ্যে রাজলক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভান্ডার, মা ক্ষীর ভান্ডার, জগন্নাথ মিষ্টান্ন ভান্ডার, সমীর ঘোষ মিষ্টান্ন ভান্ডার, মহাগুরু মিষ্টান্ন ভান্ডার উল্লেখযোগ্য। গরমের সময় একেকটি দোকানে দৈনিক গড়ে ৪০-৫০ পাতা পাতক্ষীর বিক্রি হয়ে থাকে। এক পাতায় ৫০০ গ্রাম পাতক্ষীর মোড়ানো হয়। তবে শীতকালে বিক্রি বাড়ে। এ সময় প্রতি দোকানে দৈনিক গড়ে ২০০-২৫০ পাতা পাতক্ষীর বিক্রি হয়। এক কেজি সুস্বাদু পাতক্ষীর ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে। তবে দুধের দাম কমবেশির সঙ্গে পাতক্ষীরের দাম ওঠানামা করে।

যেভাবে বানানো হয় পাতক্ষীরা : সিরাজদীখান বাজারের রাজলক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভা-ারের সহোদর তিন ভাই শরৎ ঘোষ, মাদব ঘোষ ও খোকন ঘোষ পাতক্ষীর তৈরির সঙ্গে জড়িত। খোকন ঘোষ (৭০) জানান, পারিবারিকভাবেই এ পাতক্ষীর তৈরি করে আসছেন। চার পুরুষ ধরে পাতক্ষীর তৈরি করে আসছে তাদের পূর্বপুরুষরা। তবে তার ভাই প্রয়াত সুনীল ঘোষ প্রথমে বাজারে মিষ্টির দোকান চালু করেছিলেন। তিনি ছিলেন পাতক্ষীর তৈরির অন্যতম কারিগর। ভাইয়ের কাছ থেকেই তার দুই ভাই ও সন্তানদের ক্ষীর বানানোর হাতেখড়ি। বর্তমানে ঘোষ পরিবার ছাড়াও উপজেলার আরও কয়েকটি পরিবার পাতক্ষীর তৈরি ও বিক্রি করে। এক কেজি পাতক্ষীর ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি করে থাকেন।

মহাগুরু মিষ্টান্ন ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী সুশান্ত ঘোষ বলেন, সাধারণত ক্ষীর প্রস্তুত করতে অনেক পরিমাণ দুধকে জ্বাল দিয়ে পরিমাণে কমিয়ে ঘন করা হয়। পাতক্ষীর বানাতেও প্রচুর পরিমাণ দুধ পাতিলে ঢেলে দীর্ঘসময় ধরে জ্বাল দিতে দিতে কাঠের চামচ দিয়ে নাড়তে হয়, যাতে পাতিলের তলায় দুধ লেগে না যায়। এরপর দুধ ঘন হয়ে এলে সামান্য হলুদ ও পরিমিত পরিমাণ চিনি মিশিয়ে চুলা থেকে নামানো হয়। পরিমাণের অনুপাত যদি ধরা হয় তাহলে ৩০ লিটার দুধে ৭৫০ গ্রাম চিনি ও দুই চা চামচ হলুদ বাটা মিশিয়ে প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা জ্বাল দেওয়া ও নাড়াচাড়া করতে হয়। এভাবেই ছয় কেজি দুধ থেকে প্রস্তুত হয় এক কেজি পাতক্ষীর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত