অপতথ্য রুখে দিতে সাংবাদিকদের ফ্যাক্ট চেকিংসহ অন্যান্য বিষয়ে প্রশিক্ষণের পরামর্শ দিয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, ‘তিনজন সাংবাদিকের চাকরি চলে গেছে, আগে কি এমন ঘটনা ঘটেছে? তিনজন সাংবাদিকের চাকরি তো আমরা খাইনি। আপনারা সাংবাদিকরা যারা আন্দোলন করছেন, আপনারা টিভি স্টেশনগুলোর বাইরে গিয়ে প্রোটেস্ট করেন। আমরা কোনো সাংবাদিকের চাকরি খাচ্ছিও না, জব (চাকরি) দিচ্ছিও না।’
গতকাল শুক্রবার ‘জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশ : গণমাধ্যমের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে তিনি এ কথাগুলো বলেন। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের জুলাই বিপ্লব স্মৃতি হলে এ সভার আয়োজন করে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন। প্রেস সচিব বলেন, ‘জুলাই-পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের শিকার হয়েছি অপতথ্য নিয়ে। এর সঙ্গে দুটি ফোর্স, একটা হচ্ছে ইন্ডিয়ান মিডিয়া একটা বড় রকমের অপতথ্যের সোর্স, আরেকটা হচ্ছে আওয়ামী লীগের লোকেরা। এরা সব এক হয়েছে। তারা কারও মুখ বন্ধ করছি না, চাকরি খাচ্ছি না দিচ্ছিও না
মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার নিয়ে বসে আছে। তারা প্রতিদিন একটার পর একটা (ভিডিও) দিচ্ছে। আপনি যেহেতু ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে কনজিউম করছেন, আপনি বুঝতেও পারছেন না এটি সত্য না মিথ্যা।’
শফিকুল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে যারা সাংবাদিকতা করছেন, তাদের জন্য এর চেয়ে ভালো সময় আসেনি। আমরা কারও মুখ বন্ধ করছি না। কারও কলম ভেঙে ফেলছি না, কারও ছাপাখানায় গিয়ে সিলগালা করছি না। আমরা সবাইকে বলছি, আপনারা সাংবাদিকতা করুন। অধ্যাপক ইউনূস (প্রধান উপদেষ্টা) ক্ষমতা গ্রহণের পর সব সম্পাদককে ডেকেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, আপনারা মন খুলে লেখেন, আমরা ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নই। আমার ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আপনার।’
শফিকুল আলম বলেন, ‘নিউজ কনজিউমের ধরন বদলে গেছে। ফলে প্রতিনিয়ত অপতথ্য আসছে, মিস ইনফরমেশন আসছে, ডিস ইনফরমেশন আসছে এবং এগুলো দিয়ে সমাজকে ডিস্টেবিলাইজ (অস্থিতিশীল) করা হচ্ছে। আগে দেখা যেত এটি ডমেস্টিক্যালি হতো। এখন দেখা যাচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়াও এটার সঙ্গে ভয়াবহভাবে জড়িত। প্রতিদিন তারা মিথ্যা নিউজ দিচ্ছে। অনেকে এটা বিশ্বাস করছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের নামে অপতথ্য ছড়ানো।’
সভায় লিখিত ধারণাপত্রে প্রধান উপদেষ্টার ডেপুটি প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার উল্লেখ করেন, ‘আমরা সবাই জানি, অতীতে সরকারের লোকজনই ঠিক করে দিতেন টকশোগুলোয় আলোচক হিসেবে কারা আসবেন কিংবা কারা আসতে পারবেন না। এখন এ ধরনের চর্চা বন্ধ করা হয়েছে। অতীতে এমনও হয়েছে কোনো একটা বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট কোনো রিপোর্টার কাভার করবেন এটা সরকারের লোকজন ঠিক করে দিয়েছে। এখন এ ধরনের চর্চাও বন্ধ করা হয়েছে।’
এ আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন। এ সময় বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী বলেন, ‘আমরা দেখেছি শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে আমাদের কিছু সাংবাদিক প্রশ্ন করতেন, প্রশ্নগুলো দেখলেই মনে হতো তারা দালালি আর চামচামি করছেন। আমরা তো এমন সাংবাদিকতা চাইনি। স্বৈরাচারের দোসররা যেন আর মাথাচাড়া দিয়ে না উঠতে পারে সেদিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।’
সভায় আরও বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুস সাত্তার, বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ চট্টগ্রামের সদস্য সচিব ডা. খুরশীদ জামিল, কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ওসমান গণি মনসুর, চবি যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শহীদুল হক, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নসরুল কাদির, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক রিজাউর রহমান, জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য নীলা আফরোজ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ শাহনওয়াজ প্রমুখ।
চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ছয়গুণ বাড়াতে পরিকল্পনা সরকারের : চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ছয়গুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ওই পর্যায়ে সক্ষমতা বাড়লে বছরে ৭ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। গতকাল বিকেলে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে আন্তর্জাতিকমানের কোম্পানিকে যুক্ত করার পরিকল্পনা আছে। এটা সফল হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জগতে পরিষ্কার বার্তা যাবে। বাংলাদেশ এখন প্রস্তুত, বিনিয়োগের জন্য খোলা।’
বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখানে যে পরিমাণ বিনিয়োগ, তা দেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। এ ছাড়া ইফিশিয়েন্সিও একটা বড় ব্যাপার।’
প্রেস সচিব আরও বলেন, ‘পুরনো বাণিজ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। চীন, ভিয়েতনাম, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর সবাই রপ্তানি দিয়ে ধনী হয়েছে। অথচ দক্ষিণ এশিয়া পিছিয়ে। এখন নতুন সুযোগ এসেছে। বাংলাদেশ সেই সুযোগ নিতে পারবে কি না, এটাই বড় প্রশ্ন।’
মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য রাখেন প্রধান উপদেষ্টার ডেপুটি প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম।
