রাজধানীর বেইলীরোডে অবস্থিত বহুতল ভবন ক্যাপিটাল সিরাজ সেন্টার শপিং মলের বেজমেন্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিসের মোট ৯টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। প্রাথমিকভাবে কোনও হতাহতের ঘটনা না পাওয়া গেলেও নারী-শিশুসহ ১৮ জনকে উদ্ধারের কথা জানায় ফায়ার সার্ভিস। তাদের মধ্যে ৭ জন পুরুষ, ৯ জন নারী ও শিশু ২ জন।
সোমবার (৫ মে) সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে আগুন লাগার সংবাদ পেয়ে তৎক্ষণাৎ ছুটে আসে ফায়ার সার্ভিস। রাত ৭টা ৪৭ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রনে আসে বলে ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান।
এদিকে আগুন নিয়ন্ত্রণের পরে এক সংবাদ সম্মেলনে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেইনস) লে. কর্ণেল মো. তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বেইলি রোডের ক্যাপিটাল সিরাজ টাওয়ারের নিচতলায় বেজমেন্টে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ফায়ার সার্ভিস বলছে, সেজমেন্টে গাড়ির গ্যারেজ থাকার কথা কিন্তু ছিল সিলিন্ডার ও জেনারেটর। জেনারেটর থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা এক ঘণ্টার মধ্যে রাত ৭টা ৪৭ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনত সক্ষম হই। ভবনটিতে শপিংমল, রেস্টুরেন্ট, হোটেল, অফিস ও আবাসিক ছিল। হুইল চেয়ারেও রেস্টুরেন্ট কিংবা উপরে গিয়েছিলেন আমরা দেখেছি। প্রায় ২০০ কাছাকাছি পরিবারের সদস্য ছিল। প্রায় একশতের কাছাকাছি মানুষকে আমরা উপর থাকে নামিয়ে নিরাপদে নিয়ে আসি।’
ফায়ার সার্ভিসের পানিবাহী গাড়ির পানি শেষ হয়ে যাচ্ছিল উল্লেখ করে ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘পাশেই বেইলি রোডের একটি পুকুর থাকায় পুকুরের পানি নিয়ে আমরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনি।’
অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে বেজমেন্ট থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে মনে হয়েছে। তবে তদন্তের পর আগুনের মূল কারণ জানা যাবে।’
বেজমেন্টে কি কি ছিল জানতে চাইলে লে. কর্ণেল মো. তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বেজমেন্টে গাড়ির গ্যারেজ হওয়ার কথা কিন্তু আমরা সিলিন্ডার ও জেনারেটর দেখেছি। জেনারেটরের পয়েন্ট থেকে আগুনের সূত্রপাতটা বেশি দেখেছি। অতিরিক্ত ধোঁয়া ছিল, ধোঁয়ার কারণে শুরুতে আমাদের কাজ করতে দেখতে হয়েছে। ৫-৬ তলা পর্যন্ত ধোঁয়া ছিল। ধারণা করা হচ্ছে জেনারেটর থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।’
এখন পর্যন্ত আহত কিংবা নিহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলেও জানান ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা।
অভিযোগ উঠেছে, মাকের্টের ভেতর অনেক অনিয়ম রয়েছে। নিয়ম ভঙ্গ করে ভেতরে ওয়েডিংয়ের কাজ করেছে মার্কেট কর্তৃপক্ষ। নকশা বহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত লিফটের জন্য শ্রমিকরা কাজ করছিল। সেখান থেকেই অগ্নিপাতের ঘটনা বলে ধারনা করছেন ব্যবসায়ীরা। বেজমেন্টে থাকা গাড়ি ও কয়েকটি মোটরসাইকেল পুড়ে গেছে বলে জানা গেছে।
মার্কেটের উপস্থিত দোকানদাররা জানান, সন্ধ্যায় মাগরিবের আজানের সময় অনেকে নামাজ আদায় করতে যায়। নামাজ শেষে মার্কেটের মুসল্লিরা হঠাৎ ধোঁয়া দেখতে পান। মার্কেটের অন্যান্য দোকানদারদের সঙ্গে মুসল্লিরাও দ্বিগবিদিক দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন। এসময় পুরো মার্কেট উপর তলা থেকে নিচ তলা পর্যন্ত ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যায়। এসময় মার্কেটে থাকা নারী-শিশুসহ সবাই জীবন বাঁচাতে চিৎকার শুরু করে। অনেকের আহাজারিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পরে।
এদিকে আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসেরকর্মীরা তাৎক্ষনিক আগুন নিভাতে কাজ শুরু করে। পর্যায়ক্রমে ৯টি ইউনিট আগুন নির্বাপনের পাশাপাশি ভবনের ভেতরে আটকে পড়াদের উদ্ধার কাজ শুরু করে।
রাত ৮টায় সরেজমিনে দেখা গেছে, রাত ৮টায় ওই ভবনের সামনে থেকে আগুনের ধোঁয়া বের হচ্ছিল। বেইলি রোডের সকল দোকান বন্ধ ছিলো। ভবনটির দুই এবং তৃতীয় তলার পশ্চিম পাশের গ্লাস ভেঙে মানুষ বের হতে দেখা গেছে। শপিং মলের সামনে বেরিকেট দিয়ে পুলিশ সদস্যরা দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভবনটির নিচতলায় কাপড় কসমেটিক্স ও জুয়েলারির দোকান দেখা গেছে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ, এনএসআই, র্যাব ও বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের মানুষ কাজ করতে দেখা গেছে। এছাড়াও আগুন দেখতে উৎসব জনতার ভিড় দেখা গেছে যা নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা গেছে সেনাবাহিনীর সদস্যদের।
ভবনটির নিরাপত্তাকর্মী শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ডিউটি টাইম শুরু হবে ৯টার দিকে। ডিউটির জন্য বাসায় রেডি হচ্ছিলাম। এমন সময় আগুনের সংবাদ পাই। দৌড়ে এসে দেখি ভবনটির নিচ তলায় আগুন লেগেছে। প্রচুর ধোয়া বের হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ভবনের বেজমেন্টে বিভিন্ন পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়াও বেজমেন্টে জেনারেটর ও বৈদ্যুতিক লাইনের তার রয়েছে। জেনারেটর বা বৈদ্যুতিক লাইন থেকে আগুন লাগতে পারে বলে ধারণা করেন তিনি।
ভবনটির নিচতালায় কে জে ওয়ার্ল্ড ফ্যাশন জুয়েলার্সের দোকানের মালিক নজরুল ইসলাম বলেন, আগুন লাগার সময় আমি নামাজে ছিলাম আমার কর্মচারীরা দোকানে ছিল। এসে দোকানের তালা দিতে চাচ্ছিলাম কিন্তু ভিতরে যেতে দেয় নি। আমার দোকানের কি অবস্থা বলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন এই দোকান মালিক।
