গাজীপুরে গত নয় মাসে শালবন দখল করে পাঁচ হাজারের বেশি বাড়িঘর, দোকানপাটসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা গড়ে উঠেছে। স্থাপনাগুলোর মধ্যে টিনশেড, আধাপাকা ও বহুতল ভবনও রয়েছে। গত বছর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে বনের জমি দখল শুরু করে এক শ্রেণির ভূমিদস্যু। গত নয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও থেমে নেই বনভূমি জবরদখল। অব্যাহত দখলের কারণে ভাওয়াল বনখ্যাত শালবনের আয়তন ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্য, বাস্তুচ্যুত হচ্ছে বন্যপ্রাণী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাজীপুরে বন দখলপরবর্তী জবরদখল তালিকা প্রস্তুত করেছে বন বিভাগ। তবে তালিকা প্রস্তুতের ক্ষেত্রে গেজেটভুক্ত বনভূমি উপেক্ষা করা হয়েছে। তালিকায় গুরুত্ব পেয়েছে যেসব ভূমির আরএস বন বিভাগের নামে রেকর্ডভুক্ত। সেই তালিকাও আবার বিতর্কিত এবং অসম্পূর্ণ। তালিকা প্রস্তুতের ক্ষেত্রে ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে অনেক জবরদখলকারীর নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আবার স্থাপনা নির্মাণের সময় ঘুষ দেওয়ার পরেও স্থাপনা উচ্ছেদের অভিযোগ উঠেছে। ৫ আগস্ট পূর্ববর্তী জবরদখলকারী অনেকেই ৫ আগস্ট পরবর্তী পুরাতন বাড়িতে নতুন কক্ষ নির্মাণ করেছেন। অথচ এসব জবরদখল আমলে নেয়নি বন বিভাগ। এতে গাজীপুরে জবরদখল হওয়া বিস্তীর্ণ বনভূমির তথ্য প্রকাশ পায়নি।
সচেতন মহল বলছে, একদিকে জোত মালিকদের সীমানা নির্ধারণী, উচ্ছেদ মোকদ্দমা নিষ্পত্তিসহ ভূমিসংক্রান্ত কাজে গাজীপুর জেলা প্রশাসন হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে, অভ্যুত্থানপরবর্তী গাজীপুরে বন দখলের সুযোগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বনের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বন দখলে সহযোগিতাকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তদন্তে চিহ্নিত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে দেওয়া হয়েছে ‘প্রাইজ পোস্টিং’। লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে অনেকেই আবার তদবির করে একই জেলায় অন্য বিটে বদলি হয়েছেন। বর্তমানে গাজীপুর বন বিভাগের মাঠ প্রশাসনে অচলাবস্থা। চাকরি ক্ষেত্রে চেইন অব কমান্ডের পাত্তা দিচ্ছেনা অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, গত নয় মাসে ভাওয়াল রেঞ্জের শুধু ভবানীপুর বিটে বনে কমপক্ষে ৭০০ ঘরবাড়ি, দোকানসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা গড়ে উঠেছে। যদিও বন বিভাগের তালিকায় ওই বিটে ৪৫১টি বাড়ি নির্মাণের তথ্য রয়েছে। বিগত দিনে ভবানীপুর বিটে কয়েক দফা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও এখনো উচ্ছেদ হয়নি শত শত স্থাপনা। ভাওয়াল রেঞ্জের পার্শ্ববর্তী জাতীয় উদ্যান রেঞ্জের বাউপাড়া বিটে গত নয় মাসে বনে শতাধিক ঘরবাড়ি নির্মিত হলেও সরকারি তালিকায় ৬৯টি। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ওই বিটে ২ নম্বর খতিয়ানভুক্ত বনে ৪৬টি বাড়ি উচ্ছেদ করতে অভিযান পরিচালনার সব প্রস্তুতি নিয়েও ব্যর্থ হয় জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগ।
পরবর্তীতে জবর দখলকারীরা নিজ উদ্যোগে বনে নির্মিত ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও ৪৬টি বাড়ির মধ্যে মাত্র ১৩টি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখনো উচ্ছেদ হয়নি ৩৩টি বাড়ি। কালিয়াকৈর রেঞ্জের শুধু চন্দ্রা বিটে গত ৫ আগস্ট পরবর্তী বনে কমপক্ষে ২ হাজার ৫০০ ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মিত হলেও বন বিভাগের তালিকায় মাত্র ১ হাজার ৩২৬টি। দুই দফায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি এবং বন বিভাগের নিজস্ব উচ্ছেদ অভিযানের পরেও চন্দ্রা বিটে এখনো ১ হাজারের বেশি স্থাপনা রয়েছে। এ ছাড়া কালিয়াকৈর রেঞ্জের মৌচাক ও বারুইপাড়া বিটে গত নয় মাসে বনে দুই শতাধিক ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। কাচিঘাটা রেঞ্জের কাচিঘাটা সদর, যাথিলা ও খলিশাজানি বিটে গত ৫ আগস্ট পরবর্তী বনে কমপক্ষে ৭০০ ঘরবাড়ি নির্মিত হলেও জবরদখলের সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি ওই রেঞ্জে।
শ্রীপুর রেঞ্জের শ্রীপুর সদর, সাতখামাইর, সিমলাপাড়া, রাথুরা, গোসিংগা, সিংড়াতলী ও কাওরাইদ বিটে গত ৫ আগস্ট পরবর্তী এক হাজারের অধিক ঘরবাড়ি নির্মিত হলেও বন বিভাগের তালিকায় রয়েছে মাত্র ১২০টি। অথচ ৫ আগস্ট পূর্ববর্তী শ্রীপুর রেঞ্জে ব্যক্তিপর্যায়ে জবরদখলকারীর সংখ্যা ৪ হাজার ৮১ জন। রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের মনিপুর ও রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিটে ৫ আগস্ট পরবর্তী বনে কমপক্ষে ২৫০টি বাড়ি নির্মিত হয়েছে।
মনিপুর বিটের বোকরান মনিপুর মৌজায় নুরুল ইসলাম, সিরাজুল, রোকন ও রফিকুলের নাম জবরদখল তালিকায় নেই। চন্দ্রা বিটের পূর্ব চান্দরা মৌজায় নজরুল, রফিক, শফিক, চান্দরা মৌজায় রেললাইনসংলগ্ন বনে বাড়ি নির্মাণকারী শতাধিক জবরদখলকারীর নাম তালিকায় নেই। ভবানীপুর বিটের মাহনা ভবানীপুর মৌজায় সাইদ, আতিকুল, রতন, বাউপাড়া বিটের বাহাদুরপুর মৌজায় আজাহার, মনির, সাত্তার, আলতাবসহ জেলায় বন বিভাগের ছয়টি রেঞ্জে বনভূমি জবরদখল তালিকায় অগণিত জবরদখলকারীর নাম নেই।
এ ছাড়া, গাজীপুর ভাওয়াল ও জাতীয় উদ্যান রেঞ্জের অধীন সংরক্ষিত বনে কমপক্ষে ৬০টি, শ্রীপুর রেঞ্জে ৫০টি, কালিয়াকৈর রেঞ্জে ৬০টি ও রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জে ১২টি শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং রিসোর্টসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অথচ এসব জবরদখলকারী প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদে নীরব ভ‚মিকায় বন বিভাগ। ৫ আগস্ট পরবর্তী জবরদখল উচ্ছেদেও বিমাতাসুলভ আচরণ করছে বন বিভাগ। একদিকে বন বিভাগ বিভিন্ন মৌজায় বিক্ষিপ্তভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে জবরদখলের সুযোগ করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জবরদখলের প্রকৃত তালিকা প্রস্তুত করে পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ পরিকল্পনাতেও ঘাটতি রয়েছে বন বিভাগের। পরিকল্পনাহীন এসব উচ্ছেদ অভিযানে হামলার ঘটনা ঘটছে। এতে সমালোচনার মুখে পড়েছে উচ্ছেদ অভিযান। আবার বনের জমি উদ্ধার করতে গিয়ে বন বিভাগের লোকজন স্থানীয়দের দ্বারা হামলার শিকার হয়েছেন একাধিকবার।
এ বিষয়ে জানতে প্রধান বনসংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী, বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল ঢাকার বনসংরক্ষক মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারীর মোবাইল ফোনে কল করলেও তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নাফিসা আরেফিন বলেন, বন বিভাগের দেওয়া তালিকা অনুসারে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। আর বনের জমির সঙ্গে ব্যক্তিমালিকানা জমি সংক্রান্ত মামলাগুলো অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দেখে থাকেন। আইন ও বিধি মোতাবেক সেগুলো নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।
জবরদখল তালিকা প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় অঞ্চলের বনসংরক্ষক এ এস এম জহির উদ্দিন আকন বলেন, জবরদখল তালিকা প্রস্তুত হয়েছে। কেউ বাদ পড়েছে কি না সেটি দেখা হবে। শুধু বনের আরএস রেকর্ড ধরে জবরদখল তালিকা প্রস্তুত হয়েছে কি না সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। জবরদখল তালিকা একটি চলমান প্রক্রিয়া বলেও তিনি জানান।
