বিধি লঙ্ঘন করে শতাধিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদোন্নতি

আপডেট : ১৪ মে ২০২৫, ০৭:৩০ এএম

উপজেলা শিক্ষা অফিসার থেকে সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের পদোন্নতি পেতে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি থাকতে হবে বিএড ডিগ্রি। নিয়োগবিধি সংশোধন বা বিএড ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ দিয়ে পদোন্নতি দেওয়া হলেও যোগ্যতা অর্জন ছাড়াই বিধি লঙ্ঘন করে শতাধিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, শুধু অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা ধরে রেখে যোগ্যতা ছাড়াই অনেকে পদোন্নতি পেয়েছেন। কেউ কেউ আবার হয়েছেন বিভাগীয় উপপরিচালক। এর মধ্যে খোদ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও দায়িত্ব পালন করছেন।

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস রিক্রুটমেন্ট নিয়ম ১৯৮৯ অনুযায়ী ৩২ নম্বর কলামে সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বা সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট পদে পদোন্নতি পেতে হলে পাঁচ বছর ফিডার পদে চাকরি এবং বিএড বা ডিপইনএড ডিগ্রির যোগ্যতা থাকতে হবে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্মারক নম্বর ৩৮.০০১.০১২.০০.০০.০০১.২০০৪ (অংশ)-৯৩১ তারিখ ০৯/১২/২০১২ এর প্রজ্ঞাপনমূলে ১৩৩ জন উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার পদে পদোন্নতি প্রদান করা হয়। এ প্রজ্ঞাপনের ৩ নম্বর শর্তে বলা হয়েছে ‘পদোন্নতিপ্রাপ্ত যে সকল কর্মকর্তা বিএড ডিগ্রি এখনো অর্জন করতে পারেনি কিংবা অর্জনের সুযোগ পাননি তাদের পদোন্নতির বিপরীতে প্রাপ্য স্কেল ও অন্যান্য আর্থিক সুযোগ-সুবিধা বিএড ডিগ্রি অর্জনের পর কিংবা বিএড বিলোপ সংবলিত প্রস্তাবিত নিয়োগবিধি অনুমোদনের পর (যেটা আগে ঘটে) প্রাপ্ত হবেন।’

এদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্মারক নম্বর : প্রাগম/প্রশা-১/১৫(২)-বদলি (এডিপিইও)/২০০৫-০৪২ তারিখ : ১৫/০১/২০১৩ এর প্রজ্ঞাপনমূলে ১৩৩ জনকে সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৪৩ জন পরবর্তীতে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। ৭ জনকে ডিডি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে আবার ৬ জন খোদ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন।

অথচ এ আদেশের শর্ত মোতাবেক যেসব উপজেলা শিক্ষা অফিসার বিএড ডিগ্রি অর্জন করেননি তাদের সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার পদের পদোন্নতির বৈধতা হয়েছে ১৩/০৯/২০২৩ খ্রি. প্রণয়নকৃত বিএড বিলোপ সংবলিত ‘প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা-২০২৩’-এর পর।

ওই ১৩৩ জন সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্তদের মধ্যে যাদের (বিএড ডিগ্রি নেই) তাদের ১৩.০৯.২০২৩ খ্রি. তারিখ হতে সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার পদে পদোন্নতি ধরে আদেশের শর্তানুযায়ী পরবর্তী সুযোগ-সুবিধা প্রদান বিধিসম্মত। অভিযোগ রয়েছে, শর্ত উপেক্ষা করে দফায় দফায় পদোন্নতিপ্রাপ্তরা বড় অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে এসব সুবিধা পেয়েছেন। যার মধ্যে অনেকেই ২০২৬ ও ২০২৭ সালে অবসরে যাবেন।

যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ দিয়ে পদোন্নতি দেওয়া ১৩৩ জনের মধ্যে নিয়োগবিধি শিথিলের আগেই ৪৩ জন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন, ৭ জন ডিডি হয়েছেন তার মধ্যে ৬ জনই প্রাথমিক শিক্ষা অধিপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, ১৩৩ জনের মধ্যে থাকা বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের, উপপরিচালক (চ.দা.) আইন সেলের দায়িত্ব পালন করছেন মো. হোসেন আলী, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগে মো. তৌহিদুল ইসলাম, সংস্থাপন বিভাগে এএসএম সিরাজুদ্দোহা, প্রশিক্ষণ বিভাগে রয়েছেন মো. আব্দুল আলীম, অর্থ-রাজস্ব বিভাগে মো. নুরুল ইসলাম ও উপপরিচালক এনামুল হক রয়েছেন।

প্রায় এক যুগ আগে খুলনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ডিপিইও) পদে পদোন্নতি পান শেখ অহিদুল আলম। বর্তমানে তিনি খুলনা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। চলতি বছর ১২ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে খুলনা বিভাগীয় কমিশনার দপ্তরে সরকারি নিয়োগ ও পদোন্নতি বিধিমালা লঙ্ঘন করে পদোন্নতি পাওয়ার অভিযোগ করেন নগরীর ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের নাগরিক ফোরামের চেয়ারপারসন জালাল উদ্দিন খান। এ অভিযোগের ভিত্তিতে বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তর ২০ ফেব্রুয়ারি বিষয়টি তদন্ত করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে প্রাথমিক শিক্ষার খুলনা বিভাগীয় উপপরিচালক মোসলেম উদ্দিনকে নির্দেশ দেন। তদন্ত চলাকালে অহিদুল আলম বিএড বা ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন ডিগ্রির সনদ দিতে ব্যর্থ হন। সেখানে তিনি ২০০২ সালে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত এমএড ডিগ্রি সনদ দাখিল করেন।

ওই কর্মকর্তা (অহিদুল) দাবি করেন, পদোন্নতির ক্ষেত্রে এমএড ডিগ্রি বিএড ডিগ্রির সমতুল্য, তাই আর বিএড ডিগ্রি অর্জনের প্রয়োজন ছিল না। তদন্ত কর্মকর্তা মোসলেম উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত হতে ২৫ জুলাই বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে চিঠি দেন। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক মোহসীন উদ্দিন ২৮ আগস্ট স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানান, বাউবি থেকে ২০০২ সালে অর্জিত এমএড ডিগ্রি বিএড ডিগ্রির সমমান নয়। অর্জিত এমএড ডিগ্রির সঙ্গে বিএড ডিগ্রি অর্জিত হয়েছে অথবা বিএড ডিগ্রির বিকল্প বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

এ প্রসঙ্গে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ২০০০ সালেও স্নাতকোত্তরধারীরা বিএড সম্পন্ন না করে এমএড যেটা বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস রিক্রুটমেন্ট নিয়ম ১৯৮৯ অনুযায়ী পরিপন্থী। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, পদোন্নতির নিয়ম ভঙ্গ করে যেসব উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসারের পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল, তাদের মধ্য থেকে পরবর্তীকালে আবার কেউ কেউ বিএড ডিগ্রি ছাড়াই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্মারক নম্বর: ৩৮.০০১.০১২.০০.০০.০২৯.২০১৪-০৮১ তারিখ ২৬/০১/২০১৫ খ্রি. মোতাবেক জেলা শিক্ষা অফিসার পদে (ষষ্ঠ গ্রেড) পদোন্নতি পেয়েছেন।

আবার তাদের (বিএড ডিগ্রি নেই) মধ্যে কেউ কেউ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্মারক নম্বর : ৩৮.০০১.০৩১.০০.০০.০১৯.২০১৩.১৬১ তারিখ ০৬/০৪/২০২২ খ্রি. মোতাবেক চতুর্থ গ্রেড পেয়েছেন।

আবার তাদের (বিএড ডিগ্রি নেই) মধ্যে কেউ কেউ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্মারক নম্বর : ৩৮.০০.০০০০.৯৯১.১২.০০৭.২৪.৩৯৬ তারিখ ২৮/০৫/২০২৪ খ্রি. মোতাবেক উপপরিচালক পদে চলতি দায়িত্ব পেয়েছেন।

যাদের বিএড ডিগ্রি নেই তাদের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার পদে পদোন্নতির বৈধ সময় সময় হবে ১৩/০৯/২০২৫ খ্রি. তারিখে। অর্থাৎ তারা যাদের বিএড নেই তারা ষষ্ঠ গ্রেড প্রাপ্য হবে আগামী ১৩/০৯/২০২৫ খ্রি. তারিখে ডিপিইও পদে পদোন্নতির পর। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকে চতুর্থ গ্রেড নিয়েছেন ২৭.০১.২০২১ খ্রি. তারিখ থেকে, যা সরকারি অর্থের বিশাল অপচয় ও দুর্নীতির শামিল। এ ছাড়া যাদের (বিএড ডিগ্রি নেই) তাদের মধ্যে কেউ কেউ ২৮/০৫/২০২৪ খ্রি. তারিখে উপপরিচালকের চলতি দায়িত্ব পদে অবস্থান করেছেন, যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও বিএড ডিগ্রি অর্জনকারীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত