ঠিকাদার লাপাত্তা

প্রকল্পের পানি গেল কোথায়?

আপডেট : ১৪ মে ২০২৫, ১০:২৮ এএম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর পৌরসভায় প্রায় ৮ কোটি টাকার একটি পানি সরবরাহ প্রকল্প তিন বছর আগে উদ্বোধন হলেও আজ পর্যন্ত পৌরবাসীর ঘরে পৌঁছায়নি এক ফোঁটা পানিও। ‘কাজ কাগজে হয়েছে, বাস্তবে নয়’— এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ দেখিয়ে বিল তুলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গা ঢাকা দিয়েছে। পৌর কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে রয়েছে নিরব ভূমিকায়।

প্রায় ৮ কোটি ২৬ লাখ ৫৮ হাজার টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (DPHE) বাস্তবায়িত প্রকল্পটির উদ্বোধন হয় ২০২১ সালের ২০ অক্টোবর। উদ্বোধন করেন তৎকালীন পৌর মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট শিব শংকর দাস।

প্রকল্পের কার্যাদেশ পায় দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান—‘এনপিআইএল - কম্বাইন্ড ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন’ এবং ‘মেসার্স তানভীর আহমেদ জেভি’। কাজের আওতায় ছিল ১৮.৯ কিলোমিটার পাইপলাইন বসানো, ৩ হাজার ৮৫৫টি হাউস কানেকশন এবং ১২টি স্ট্রিট হাইড্রেন্ট স্থাপন। কিন্তু বাস্তবে বসানো হয়েছে মাত্র দুটি নলকূপ—একটি পশ্চিম পাড়ায়, অন্যটি ভোলাচংয়ে। অধিকাংশ এলাকায় পাইপলাইনই বসানো হয়নি। কিছু এলাকায় বসানো হলেও তা চুরি হয়ে গেছে বা পড়ে আছে অকেজো অবস্থায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পরীক্ষামূলকভাবে কোথাও পানি সরবরাহ করতে গেলে পাইপ ফেটে যায়, লিক হয় এবং পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে। এরপর থেকে প্রকল্পটি নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই কর্তৃপক্ষের।

ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দুটি বিল তুলে এলাকা ছেড়েছে, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে এতদিনেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। পৌরসভার একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কাজ কাগজে হয়েছে, বাস্তবে নয়। টাকা ভাগ হয়ে গেছে—উপরে-নিচে সবাই পেয়েছে।” এক সাবেক কাউন্সিলরের মন্তব্য, “এটা ছিল সবচেয়ে বড় কমিশনের প্রজেক্ট। শিব শংকর দাসের ছত্রছায়ায় সবাই লাভবান হয়েছে।”

রাস্তাঘাট খুঁড়ে পাইপ বসানোর নাম করে অনেক জায়গার রাস্তা ভেঙে ফেলা হয়েছিল, যা পরে আর সংস্কার করা হয়নি। বাধ্য হয়ে স্থানীয়রা নিজেরাই চাঁদা তুলে কিছু রাস্তা মেরামত করেন। অভিযোগ রয়েছে, এই মেরামতের কাজের বিলও পৌরসভা উত্তোলন করেছে।

পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা তাজুল ইসলাম ও শাহ আলম বলেন, “এটা শুধু পানি প্রকল্প নয়, বরং উন্নয়ন বাজেটের ভয়াবহ লুটপাট। আমরা তিন বছর ধরে শুধু নাটক দেখে যাচ্ছি, কিন্তু পানি পাচ্ছি না। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তি চাই।”

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এনপিআইএল - কম্বাইন্ড ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন’-এর ঠিকাদার নজরুল ইসলাম এবং তৎকালীন মেয়র শিব শংকর দাস এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে গেছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

অন্যদিকে, ‘মেসার্স তানভীর আহমেদ জেভি’র মালিক শামিম আহমেদ দাবি করেন, “তৎকালীন মেয়র আমাদের ১ কোটি ২০ লাখ টাকা আটকে রাখায় কাজ বন্ধ রয়েছে। তবে পানি মিটার ও সরঞ্জামের ঘাটতি কাটিয়ে আগামী এক-দেড় মাসের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হবে।”

DPHE’র প্রকৌশলীরা এ বিষয়ে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। তবে নবীনগর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফ সারোয়ার বাতেন বলেন, “এই কাজটি সম্পূর্ণরূপে DPHE বাস্তবায়ন করেছে, পৌরসভা এতে জড়িত নয়।”

এ বিষয়ে মঙ্গলবার (১৩ মে) নবীনগরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক রাজীব চৌধুরী বলেন, “এই প্রকল্পটি আমার দায়িত্ব গ্রহণের আগেই সম্পন্ন হয়েছে। পৌরবাসীর কষ্টের কথা শুনেছি, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের তল্লাশি চালিয়েছি। তাদের লোকজন আজ বুধবার (১৪ মে) আমার সঙ্গে দেখা করবে। আশা করছি, অচিরেই এ সমস্যার সমাধান হবে।”

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত