ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র পদে বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের শপথ নিয়ে নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বুধবার থেকে নগর ভবনে অন্তত ৭০টি তালা ঝুলিয়ে লাগাতার আন্দোলন করছেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা।
আন্দোলনকারীদের দাবি, অবিলম্বে ইশরাককে মেয়র পদে শপথ পড়াতে হবে। কিন্তু শপথ নিলে কতদিন দায়িত্ব পালন করবেন মেয়র? আইন অনুয়ায়ী, যদি সোমবার শপথ পড়ানো হয়; তবে ইশরাক হোসেন মেয়র হিসেবে সময় পাবেন ৪২ দিন।
নিয়ম বলছে, এর মধ্যেই নির্বাচন ও আগের মেয়রের শপথগ্রহণের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। তবে এখনো সিটি করপোরেশনের প্রথম বোর্ডসভার পাঁচ বছর পূর্ণ হতে ৪২ দিন বাকি রয়েছে। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন-২০০৯-এর ৬ ধরায় বলা হয়েছে, করপোরেশনের মেয়াদ প্রথম সভা হওয়ার তারিখ থেকে পাঁচ বছর।
ডিএসসিসির নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা দক্ষিণ সিটির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নূর তাপস মেয়র হন। ১৬ মে দায়িত্ব নেওয়ার পর ৩০ জুন প্রথম বোর্ডসভা হয়। আইন অনুযায়ী করপোরেশনের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা আগামী ২৯ জুন।
যদি সোমবার ইশরাক হোসেনকে মেয়র পদ বুঝিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তিনি আগামী ২৯ জুন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। অর্থাৎ ৪২ দিনের জন্য মেয়র হবেন ইশরাক হোসেন। এরপর দায়িত্ব নেওয়ার জন্য যতদিন দেরি হবে, এই ৪২ দিন থেকে ততদিন কমবে।
সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরিষদ বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগের বিধান রয়েছে স্থানীয় সরকার আইনে। আদালতের ভিন্ন কোনো আদেশ না থাকলে এই ৪২ দিন পর সরকারকে আবার প্রশাসক নিয়োগ দিতে হবে।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. তোফায়েল আহমেদ এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেন, এমন ঘটনা এর আগে ঘটেনি। যে কারণে এখন শপথ নিলে ইশরাক হোসেন কতদিন পদে থাকতে পারবেন, তা নিয়ে একটা আইনগত জটিলতা রয়েই গেছে। তিনি বলেন, বর্তমান আইন অনুযায়ী এই সিটি করপোরেশনের মেয়াদ আছে আর ১৫-১৬ দিন। সে অনুযায়ী যদি নতুন করে তফসিল ঘোষণা করা হয়, সেখানে যদি ইশরাক হোসেন প্রার্থী হতে চান, তাহলে তাকে এ সময়ের মধ্যেই পদত্যাগ করে পরবর্তী নির্বাচনে প্রার্থী হতে হবে।
এর আগে একইভাবে গত বছরের ১ অক্টোবর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন চৌধুরীকে মেয়র ঘোষণা করা হয়েছিল। তিনি এখন চট্টগ্রামের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, আইন অনুযায়ী শপথ পড়ানো গেলে মন্ত্রণালয় এতে বাধা দেবে না। কিন্তু ভবিষ্যতে যাতে বিতর্ক না হয়, আইনি কোনো জটিলতায় না পড়তে হয়, সেজন্য আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে। আইনি মতামত পেলে এবং উচ্চ আদালতের একটি রিট নিষ্পত্তির পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন তারা।
এদিকে, ডিএসসিরি প্রশাসক মো. শাহজাহান মিয়াকে ওয়াসার এমডির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ডিএসসিসির প্রশাসকের পাশাপাশি ওয়াসার এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। গতকাল রবিবার এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার।
মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, আইনি জটিলতা না থাকলে ইশরাক হোসেনকে শপথ পড়ানোর উদ্যোগ নেবে সরকার। সেজন্যই শাহজাহান মিয়াকে ওয়াসার এমডি পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আর যদি আইনি জটিলতায় শপথ পড়ানো না যায়, তবে আপাতত দুই সংস্থাতেই দায়িত্ব পালন করবেন শাহজাহান।
ব্লকেড কর্মসূচি : ডিএসসিসি মেয়র হিসেবে ইশরাক হোসেনকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার দাবিতে সোমবার ব্লকেড কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন তার সমর্থকরা। রবিবার নগর ভবনের সামনে চতুর্থ দিনের অবস্থান কর্মসূচি থেকে এ ঘোষণা দেন সাবেক সিনিয়র সচিব মশিউর রহমান। তিনি বলেন, ‘সোমবার বেলা ১১টা থেকে নগর ভবন ব্লকেড ও এর আশপাশের এলাকায় ব্লকেড কর্মসূচি শুরু হবে। বেলা ৩টা পর্যন্ত নগর ভবনের সামনে এ কর্মসূচি চলবে।’
এর আগে নগর ভবনের ভেতরে শ্রমিক কর্মচারী এবং বাইরে নেতাকর্মীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। নগর ভবনের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল করেন আন্দোলনকারীরা। মিছিলটি নগর ভবনের সামনে থেকে শুরু হয়ে গোলাপ শাহ মাজার হয়ে গুলিস্তান, প্রেস ক্লাব, শিক্ষা ভবন প্রদক্ষিণ করে আবার নগর ভবনের সামনে আসে। মিছিল থেকে ইশরাককে মেয়রের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার দাবির পাশাপাশি স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেন তারা।
চার দিন ধরে অচল সিটি করপোরেশন : শপথ পড়ানোর দাবিতে চলমান আন্দোলনে স্থবির হয়ে পড়েছে ঢাকার দক্ষিণ অংশের নাগরিক সেবা কার্যক্রম। গতকালও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে পারেননি নগরবাসী। হাজারীবাগের বাসিন্দা নারগিস সুলতানা জানান, ছেলের জন্মনিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিলেন। গত বৃহস্পতিবার জন্মনিবন্ধনের কপি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আন্দোলনের কারণে নগর ভবনে ঢুকতেই পারেননি। গতকাল এসেও ফিরে গেছেন। কবে এলে পাবেন, তার উত্তর কারও কাছেই পাননি।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. সালাউদ্দিন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও নাগরিক সেবা বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় দেওয়া ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নগর ভবনের সামনে একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের আন্দোলনে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় জনদুর্ভোগ দেখা দিয়েছে এবং নাগরিক সেবা বন্ধ রয়েছে।
রিট নিষ্পত্তি এবং আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত : ওই বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় পরবর্তী আইনানুগ ও দাপ্তরিক করণীয় ঠিক করবে হাইকোর্ট বিভাগে করা রিট পিটিশন নম্বর ৮১৩৭/২০২৫ মামলার রায়ের আদেশ প্রাপ্তি, ওই আদেশে অত্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি কোনো নির্দেশনা থাকলে তার প্রতিপালন কিংবা সুনির্দিষ্ট আইনানুগ পদ্ধতি অনুসরণক্রমে এবং মেয়াদ-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন ও আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতপ্রাপ্তির পর।
এর আগে আলোচিত রায়ের বিষয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও অসংগতি উল্লেখ করে এবং ইশরাক হোসেনের শপথ আয়োজন করা থেকে বিরত থাকতে স্থানীয় সরকার বিভাগকে অনুরোধ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মামুনুর রশিদের একটি লিগ্যাল নোটিস পাঠিয়েছেন। পরে ওই আইনজীবী নির্বাচনী মামলা নম্বর ১৫/২০২০-এ প্রদত্ত বিজ্ঞ নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের ২৭ মার্চের রায় ও ডিক্রি, নির্বাচন কমিশনের ২৭ এপ্রিল ২০২৫ তারিখের জারি করা সংশোধিত গেজেটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন করেন। ওই রিট মামলায় ইশরাক হোসেনকে শপথ পড়ানো থেকে বিরত থাকতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতি এবং প্রতারণামূলক রায় দেওয়ার জন্য নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিচারকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইন, বিচার ও সংসদ মন্ত্রণালয়ের প্রতি নির্দেশনা প্রার্থনা করা হয়েছে।
হাইকোর্টে রিট এবং মামলা বিচারাধীন অবস্থায় জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী এমন আন্দোলন আদালতের প্রতি অনাস্থা অথবা অবমাননার শামিল। নাগরিক সেবা ব্যাহত ও অচলাবস্থা দূর করতে আন্দোলনকারী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের প্রতি স্থানীয় সরকার বিভাগের উদাত্ত আহŸান জানায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
গত বছরের ১৭ আগস্ট স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনে সংশোধনী এনে প্রশাসক নিয়োগের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং ১৯ আগস্ট তারিখে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রকে অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। সামগ্রিক বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের আপিল না করার সিদ্ধান্ত, হাইকোর্ট বিভাগে করা রিট পিটিশন এবং স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ৬ ধারা বিবেচনাক্রমে স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক পরবর্তী প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণে কোনো আইনগত জটিলতা আছে কি-না, এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ বিগত চিঠি দিয়েছে।
‘আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা’ চিরকুট লিখে শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় বাড়ল
‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন করা হবে, খুলে যাবে নির্বাচনের পথ
নিয়ন্ত্রণে ভাষানটেক বস্তির আগুন