মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই দ্বন্দ্ব চলছে। একপক্ষ মানববন্ধন ও প্রধান উপদেষ্টাকে স্মারকলিপি প্রদানের মতো কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করলে অন্যপক্ষও একই স্থানে একই কর্মসূচি ঘোষণা করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করে আসছিল। সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ভবনের সামনে এমন কর্মসূচি ঘিরে একাধিকবার দুপক্ষের মধ্যে হাতাহাতির মতো ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশি হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। তবে গতকাল সোমবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) লঙ্কাকা- ঘটিয়ে বসেন বায়রার সদস্যরা। একপক্ষের ডাকা সংবাদ সম্মেলনে আরেকপক্ষ হামলা চালায়। পরে শুরু হয় সংঘর্ষ। এতে ১০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। হামলার শুরুতে ডিআরইউতে ভাঙচুর এবং পরে সংগঠনটির কর্মচারীদের ওপর হামলা চালান তারা।
ঘণ্টাব্যাপী চলা এ ঘটনা ডিআরইউ ও বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) এবং পুলিশের হস্তক্ষেপে নিয়ন্ত্রণে আসে। আলোচনার মাধ্যমে সংঘর্ষ থামলেও পরে এ ঘটনার পেছনে একে অন্যকে দায়ী করে সংবাদ সম্মেলন করেন দুপক্ষের নেতারা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের মালয়েশিয়া সফরকালীন দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় উত্থাপিত আগের মতো সিন্ডিকেটের পরিবর্তে সব রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য মালয়েশিয়া শ্রমবাজার উন্মুক্তের প্রস্তাব স্বাগত জানিয়ে এবং আসন্ন জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের মিটিংয়ে সেটি বাস্তবায়নের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বের একাংশ। এ একাংশের নেতৃত্বে আছেন বায়রার সাবেক সহসভাপতি রিয়াজ উল ইসলামও। আরেক অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন বায়রার সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন স্বপন ও বায়রা সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন।
ডিআরইউ সাগর-রুনি মিলনায়তনে গতকাল সকালে ফখরুল ইসলামদের পূর্বনির্ধারিত সংবাদ সম্মেলনে বায়রার কিছু সদস্য এসে হট্টগোলের চেষ্টা করেন। সেখানে একপর্যায়ে উত্তেজনা তৈরি হলে ফখরুল ইসলামের সঙ্গে বাগ্বিত-ায় জড়ান তারা। এ সময় তাকে পেটাতে পেটাতে দোতলা থেকে নিচে নামিয়ে আনা হয়। ভাঙচুর করা হয় ডিআরইউ অফিসকক্ষ। হামলার শিকার ফখরুল ইসলাম পালিয়ে আশ্রয় নেন ক্র্যাব অফিসে। সেখানে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় আরও কয়েকবার হামলার চেষ্টা করে অন্যপক্ষের শতাধিক লোক। এ সময় ক্র্যাব সদস্যদের হস্তক্ষেপে পুনরায় হামলা থেকে রক্ষা পান ফখরুল ইসলাম।
হামলার বিষয়ে বায়রার সাবেক সহসভাপতি রিয়াজ উল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের একটা সুন্দর আয়োজনে এমন একটা অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে গেল। আমরা এখানে সংবাদ সম্মেলন করতে আসছিলাম। কিন্তু আমাদের এখানে তা করতে দেওয়া হয়নি। ফখরুলকে আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। ডিআরইউ অফিস ভাঙচুর করা হয়েছে। আমরা তো কোনোভাবে বেঁচে গেছি। আমাদের চার-পাঁচ সদস্য রক্তাক্ত হয়েছেন। থানা থেকে পুলিশ এসে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে।’
অভিযুক্তদের পক্ষে বায়রার সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা এখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতে এসেছি। হলরুমে প্রবেশের সময় আমাদের বাধা দেওয়া হয়। যিনি সংবাদ সম্মেলনের আহ্বান করেছেন তিনি ছাড়া অন্য কেউ ঢুকতে পারবেন না। আমাদের বলা হলো যিনি আহ্বান করেছেন, তিনি (ফখরুল ইসলাম) এলে আমরা একসঙ্গে প্রবেশ করব। কিন্তু তিনি আসার পর তিন-চারজনকে প্রবেশ করার জন্য বলেন, বাকিদের না করে দেন। কারণ সেখানে জায়গা কম, বেশি লোক জায়গা দেওয়া যাবে না। এটা নিয়ে সাধারণ সদস্যরা জানতে চান যে, তিন-চারজনকে জায়গা দিলে সবাইকে দাওয়াত দিয়েছেন কেন? এটা নিয়ে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। এরপর উত্তেজনা, ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। তাদের দাবি ফখরুল ইসলাম যখন বলেন যে, আজকে সংবাদ সম্মেলন করবেন না তখন সাধারণ সদস্যরা উত্তেজিত হয়ে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেন।’
ক্র্যাব কার্যালয়ে বায়রার দুপক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসে পুলিশ। ডিএমপির রমনা জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) আবদুল্লাহ আল মামুন ও শাহবাগ থানার ওসি খালিদ মনসুর ওই আলোচনা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে স্বপন গ্রুপের আজিজ ঘটনার দায় স্বীকার করে ক্ষমা চান এবং ডিআরইউ ও ক্র্যাবকে ক্ষতিপূরণ দেন। সেখানে তিনি পুলিশকে বলেন, ভবিষ্যতে আর এমন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটবে না। অনেক লোক থাকায় তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেননি বলেও জানান। সেখানে আইনগত ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান হামলায় আহত অন্যপক্ষের ফখরুল ইসলাম। বৈঠক শেষে সাগর-রুনি মিলনায়তনেই পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করে দুপক্ষ।
উভয়ই মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে কর্মী পাঠাতে সিন্ডিকেটের ফাঁদে পা না দেওয়ার জন্য সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে। তাদের একটি পক্ষ মনে করছে, মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের সিন্ডিকেট ভাঙতে বিএমইটির অনলাইনে ডেটাবেজ সমৃদ্ধ করে অনলাইন সিস্টেমে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে হবে। তাহলে কম খরচে কর্মী পাঠানো সম্ভব। আরেকটি পক্ষ বলছে, সরকারের হয়ে একটি গ্রুপ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে বন্ধ করতেই নানা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে। যাতে বিগত সময়ে সিন্ডিকেটের সঙ্গে থাকা সদস্যরাও রয়েছে। কিন্তু আজ তারা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলছে।
গত ১৫ মে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাশুসন ইসমাইল এবং মানবসম্পদ মন্ত্রীর স্টিভেন সিম চি সঙ্গে যৌথসভা শেষে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল জানান, দীর্ঘদিন বন্ধের পর আবারও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলছে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে মালয়েশিয়া। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে জনশক্তি রপ্তানিসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মানব পাচার ও মানি লন্ডারিংয়ের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা, শ্রমিকের নিরাপত্তা ও স্বার্থ সংরক্ষণ করে অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং অভিবাসন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে সহযোগী এজেন্সি প্রথা বাদ দেওয়া।
