অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার, বিচার কার্যক্রম এবং নির্বাচনের জন্য কাজ করছে। অর্থনৈতিক সংস্কার চলছে। সংস্কার শেষে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হবে। আমরা বড় একটা অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির চেষ্টা করছি, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি ঘুরে দাঁড়ায়, তাহলে এর প্রভাব শেয়ার মার্কেটেও পড়বে। যদি সার্বিক অর্থনীতির অবস্থা খুব ভালো হয়, আশা করা যায়, বাংলাদেশের শেয়ারবাজার খুব দ্রুত নতুন উচ্চতায় উঠবে। এছাড়া নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা কেটে গেছে, আগামী বছরের ৩০ জুনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন হবে।
গতকাল রবিবার পুঁজিবাজার নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকদের সংগঠন ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) আয়োজিত সিএমজেএফ টকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এসব কথা বলেন। সিএমজেএফ সভাপতি গোলাম সামদানী ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আবু আলী।
শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ডাকাতদের আড্ডা হয়ে গেছে। এখানে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা কেবল প্রতারণার শিকার হয়েছেন, পুঁজি হারিয়েছেন। অতীতে যারাই পুঁজিবাজারের সংস্কারে দায়িত্ব নিয়েছেন, তারাই বিভিন্ন গোষ্ঠীর তাঁবেদারি করেছেন।
তিনি বলেন, একটা বড় বিষয় হচ্ছে যে, ঐতিহাসিকভাবে বিএসইসিতে বা বাংলাদেশের ক্যাপিটাল মার্কেটের যে সংস্কারগুলো যারা করেছেন, তারা সবাই গোষ্ঠী স্বার্থের দিকে তাকিয়েছিলেন। এই গোষ্ঠীটা একটা পারপাস সার্ভ করছে, ওই গোষ্ঠীর প্রতিপক্ষ এসে আরেকটা পারপাস সার্ভ করেছে। ফলে দেখা গেছে যে, যারা বড় বড় প্লেয়ার, তারা সবসময় লাভবান হয়েছেন। সাধারণ বিনিয়োগকারী শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে তাদের পুঁজি সঞ্চয়ের আশা করেছেন। কিন্তু তারা সবসময় প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
পুঁজিবাজার নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠকের বিষয়ে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই সভায় একটা বিষয় জোরালোভাবে এসেছে, তা হলো আমরা কেন ব্যবস্থা নিতে পারছি না? এটার কারণ হচ্ছে, পুরো শেয়ার মার্কেটটা হয়ে গেছে ডাকাতদের আড্ডা। পুঁজিবাজারে এক ডাকাত গেলে আরেকটা ডাকাত আসছে।
শফিকুল আলম বলেন, পুঁজিবাজার সংস্কারের জন্য আপনি যাকে নিয়ে আসছেন, সে আরেকটা ডাকাত। এক্ষেত্রে সংস্কারের বিষয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলছেন, এখানে খুব স্ট্রং (মজবুত) এবং খুব গভীর সংস্কার করতে হবে। এই সংস্কার যে করবে, তারা হচ্ছে এই গোষ্ঠী স্বার্থের অনেক দূরের লোক। তারাই এসে করবে। তারা নির্মোহভাবে সংস্কার করবে। পুরো বিশ্বেই শেয়ার মার্কেটের খুব গভীর সংস্কার হয়, ভালো জায়গায় যায়। কিন্তু বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে, যারা সংস্কার করতে চান, তারা আসলে আরেকটা ধান্দাবাজ গ্রুপ।
তিনি যোগ করেন, এই জন্য অধ্যাপক ইউনূস গত মিটিংয়ে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন যে, শেয়ারবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের মার্কেটে রূপান্তর করতে বিদেশি বিশেষজ্ঞ নিয়ে আসবেন। সে জন্য তিন মাসের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। তিন মাসের মধ্যে তারা এসে শেয়ার মার্কেটের কী কী করণীয়, সেটা তারা বলবেন এবং সে অনুযায়ী খুব দ্রুত অ্যাকশন নেওয়া হবে।
এর ফলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার কোনো গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি থাকবে না উল্লেখ করে শফিকুল আলম বলেন, কোনো গোষ্ঠী যেন মনে না করে যে, এখান থেকে আমি আমার মতো করে টাকা বানাব। বছরের পর বছর হয়েছে, আমরা দেখেছি, আমাদের আশপাশে যারাই একটু শেয়ারমার্কেটে ইনফ্লুয়েনশিয়াল পিপলের (প্রভাবশালী ব্যক্তির) আশপাশে ছিলেন, তারা সবাই কোটিপতি হয়ে গেছেন। সেটা যাতে আর না হয় সে জায়গাটা প্রফেসর ইউনূস বারবার গুরুত্ব দিয়েছেন।
ব্যাংকিং খাতকে গহ্বর থেকে টেনে তোলা হচ্ছে জানিয়ে প্রেস সচিব বলেন, আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা একদম দুর্বল ছিল। স্যার (ড. ইউনূস) বলেন, ব্যাংকিংয়ের অবস্থা ভূমিকম্পের মতো। সবকিছু ল-ভ- অবস্থা। সেখান থেকে আমরা ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে একটা গহ্বর থেকে তুলে এনে পাহাড়ে ওঠানোর চেষ্টা করছি।
তিনি বলেন, দুই সপ্তাহ হলো কারেন্সি ফ্লোট (বাজারভিত্তিক মুদ্রা ব্যবস্থা) করা হয়েছে। কিন্তু টাকার অবমূল্যায়ন হয়নি। এটার নির্দেশ করে যে, সংস্কার ভালো সংকেত দিচ্ছে।
সরকারের মেয়াদ শেষ হলে বিদেশি বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি হবে জানিয়ে শফিকুল আলম বলেন, এটার দুটো কারণ আছে। একটা হচ্ছে, আমরা চিটাগাং পোর্টের (বন্দর) মৌলিক সংস্কার করতে চাচ্ছি। চিটাগাং পোর্টটাকে আমরা চাচ্ছি বিশ্বের বড় বড় কোম্পানি যাতে বন্দরের সুবিধা নিতে পারে। আমরা চিটাগং টার্মিনাল কাউকে দিচ্ছি না। চিটাগাং টার্মিনালে যাতে তারা (বিদেশি) ইনভেস্ট করেন, ম্যানেজ (ব্যবস্থাপনা) করেন। আমরা তাদের কাছ রেসপন্স পেয়েছি যে, তারা তিন বিলিয়ন ডলারের মতো ইনভেস্ট করবে। এবং এই চিটাগং পোর্টে যদি এফিশিয়েন্সি লেভেলে (কার্যকরী দক্ষতার পর্যায়) দ্রুত এগিয়ে নিতে পারি, সেটার একটা মাল্টিপ্লায়ার এফেক্ট (সামষ্টিকভাবে) দেশের অর্থনীতিতে পড়বে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ একটি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বে বাণিজ্যে আমরা বেনিফিটের (লাভজনক) জায়গায় আছি। বন্দর ব্যবস্থাপনার উন্নতি করতে পারলে খুব দ্রুত এটা থেকে লাভবান হতে পারব। যেমন ধরেন, আপনারা বড় বড় দেশ একে অপরের বিপরীতে ট্যারিফ ইম্পোজ (শুল্ক আরোপ) করছে। এই ট্যারিফ ইম্পোজ করার কারণে যেই ফ্যাক্টরিগুলো হচ্ছে লো কস্ট ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাক্টরি, তারা আসলে খুঁজছে যে, তারা কোন দেশে গেলে তাদের এই ধরনের ট্যারিফ ফেস করতে হবে না। কোন দেশে গেলে লেবারটা লো কস্টে (কম মজুরি) করতে পারবে। তো বাংলাদেশের চেয়ে বেটার ডেস্টিনেশন (গন্তব্য) পুরো বিশ্বে এখন নেই। তো সেই আলোকেই আমাদের প্রধান উপদেষ্টা চাচ্ছিলেন বাংলাদেশকে একটা ম্যানুফ্যাকচারিং হাব তৈরি করার।
ম্যানুফ্যাকচারিং হাব তৈরি করার মূল শর্ত হচ্ছে বন্দরকে দক্ষ ব্যবস্থাপনা বা উপযোগী (পোর্ট এফিশিয়েন্সির) করা। সেজন্য বন্দরকে অন্যমাত্রায় নিতে হবে। তো এই অন্য মাত্রায় নেওয়ার টেকনোলজি আমাদের নেই। ওই ম্যানেজমেন্ট স্কিলটাও (ব্যবস্থাপনা দক্ষতা) আমাদের তৈরি হয়নি। এটার জন্য আমরা বিদেশের সবচেয়ে বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে কথা বলছি। দুবাই পোর্ট ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কথা বলছি। এপি মূলার মার্কসের সঙ্গে কথা বলছি এবং সিঙ্গাপুরের পোর্ট অব সিঙ্গাপুর অথরিটির সঙ্গে কথা বলছি। এর ফলে যেটা হবে, ওরা যদি ম্যানেজ করেন, তাহলে আমাদের পোর্ট এফিশিয়েন্সি বাড়বে। আর পোর্ট এফিশিয়েন্সির দিকে তাকিয়ে থাকে ওয়ার্ল্ডের বড় বড় কোম্পানিগুলো যারা ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে ইনভেস্ট করে, তারা তখন চিন্তা করবে যে, ওকে দিস ইজ হাই টাইম টু ইনভেস্ট ইন বাংলাদেশ (বিনিয়োগের উপযুক্ত সময়)।
বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে জানিয়ে শফিকুল আলম বলেন, এফডিআই আমরা যদি ঠিক করতে পারি, প্রচুর আনতে পারি, আর সামষ্টিক অর্থনীতি ঠিক থাকে, তাহলে আমরা মনে করছি এটার প্রভাব ক্যাপিটাল মার্কেটে পড়বে। ক্যাপিটাল মার্কেট গ্রো (উন্নতি) করতে বাধ্য।
