'লাল মাটির রাজার’ বিদায়ী মঞ্চে ‘দা বিগ ফোর’

আপডেট : ২৬ মে ২০২৫, ০৫:০১ পিএম

টেনিসপ্রেমীদের চোখে চোখে জল। আর একবার, শেষবারের মতো একসঙ্গে দেখা মিলল আধুনিক টেনিসের স্বর্ণযুগের চার মহারথীর—রাফায়েল নাদাল, রজার ফেদেরার, নোভাক জোকোভিচ ও অ্যান্ডি মারেকে। রোলাঁ গারোর ঐতিহাসিক কোর্ট ফিলিপ শাত্রিয়েরের হৃদয়ছোঁয়া এক অনুষ্ঠানে ফরাসি ওপেন বিদায় জানাল তার চিরসেনানীকে— রোলা গাঁরোর 'লাল মাটির রাজা' নাদালকে।

সোমবার প্যারিসের হৃদয়ে গড়ে ওঠা এই আবেগঘন মঞ্চে জড়ো হয়েছিলেন টেনিসের ‘বিগ ফোর’। যাদের হাত ধরে বদলে গিয়েছে এই খেলা, ছুঁয়ে গিয়েছে ক্রীড়াবিশ্বের নতুন উচ্চতা। ফেদেরার ও মারে আগেই বিদায় নিয়েছেন, এবার পা রাখলেন নাদালও অবসরের পথে। পাশে দাঁড়ালেন প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে যাওয়া সহযোদ্ধারা। মুহূর্তগুলো ছুঁয়ে গেল ইতিহাসকে।

৩৭ বছর বয়সী নাদাল বললেন, 'এই সব বছর আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে লড়েছি, অথচ সময় সব কিছু বদলে দেয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে আজ এক বন্ধুত্বের গল্প... আমরা কেবল টাইটেলের জন্য লড়িনি, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেছি। আজ তোমরা এখানে—এটাই আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া।'

অনুষ্ঠানের শুরুতেই আবেগঘন আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেন ফেদেরার। স্মৃতির পাতায় ফিরে আসে সেই রাত, যখন ফেদেরারের শেষ ম্যাচে চোখের জলে ভেসে ছিলেন তাঁরা দুজনেই। এরপর আলিঙ্গন জোকোভিচ ও মারের সঙ্গেও। জোকোভিচ এসেছেন মাত্র ঘণ্টা কয়েক আগে, শনিবারই জিতেছেন নিজের ক্যারিয়ারের শততম শিরোপা। মারে এসে যোগ দিয়েছেন শুধুই বন্ধুত্বের টানে।

'আমি ভাবছিলাম, জোকোভিচের কোচ হিসেবে ওর পাশে দাঁড়াবো,' মজা করে বলেন মারে। 'কিন্তু এই দিনটা মিস করা যেত না। রাফা যা করেছে, বিশেষ করে এখানে, সেটা অতিক্রম করা কারও পক্ষে প্রায় অসম্ভব।'

নাদালের ঠোঁটে হাসি, মনে আনন্দের ঝাঁপি। তার মাঝেই ভেসে ওঠে এক মজার স্মৃতি, মারে একবার রিয়াল মাদ্রিদের হারের পর বার্তা পাঠিয়েছিলেন, 'ভালো আছ তো?' ব্রিটিশ ব্যঙ্গ-রসিকতা! পাল্টা জবাব না দিলেও, আজকের দিনে সেই বন্ধুত্বকেই তিনি স্মরণ করলেন স্নিগ্ধ আবেগে।

নাদালের জন্য প্রস্তুত ছিল এক অনন্য আয়োজন। ১৫ হাজার দর্শককে দেওয়া হয়েছিল রোলাঁ গারোর রঙে রাঙানো টি-শার্ট, যেন পুরো স্টেডিয়ামই হয়ে ওঠে ক্লে কোর্টের প্রতিচ্ছবি। 'রাফা! রাফা! রাফা!'—ধ্বনিতে মুখরিত চারপাশ, যখন স্যুট-পরা নাদাল আবির্ভূত হলেন।

প্রথম সারিতে বসা তরুণ কার্লোস আলকারাজ, যাঁকে ভবিষ্যতের নাদাল বলা হয়। পাশে বর্তমান নারী চ্যাম্পিয়ন ইগা শিয়াওতেক। নাদালের স্মৃতিময় ক্লিপিংস চলল স্ক্রিনে, আর তিনি দাঁড়িয়ে শুনলেন দর্শকদের দীর্ঘ করতালি। ঠোঁট কামড়ানো, চোখে জল—সেই এক চেনা রাফা।

পরিবারকে, টুর্নামেন্ট কর্তৃপক্ষকে, দর্শকদের কৃতজ্ঞতায় ভাসিয়ে বক্তব্য শেষ করলেন তিন ভাষায়—স্প্যানিশ, ফরাসি ও ইংরেজিতে। কণ্ঠে কাঁপন এল তখনই, যখন স্মরণ করলেন চাচা ও কোচ টনি নাদালকে, যাঁর হাতে গড়া নাদালের ২২টি গ্র্যান্ড স্ল্যামের ১৬টি।

শেষ চমক হিসেবে ফরাসি টেনিস ফেডারেশন তুলে দিল রুপার তৈরি নাদালের পায়ের ছাপ, সংরক্ষিত হবে চিরতরে ফিলিপ শাত্রিয়ের কোর্টে।

বিদায়ের ক্ষণে নাদালের অনুভব ছিল সহজ অথচ গভীর, 'আমি সাধারণত এসব অনুষ্ঠান পছন্দ করি না। কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে লজ্জা লাগে। কিন্তু আজ—সবকিছু নিখুঁত ছিল। আমি সত্যিই উপভোগ করেছি।'

একটা অধ্যায় শেষ হলো। নাদাল নামটা হয়তো স্কোরবোর্ডে আর দেখা যাবে না, কিন্তু ক্লে কোর্টের প্রতিটি ধুলিকণায় তিনি থাকবেন, চিরকাল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত