‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বাতিলের দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার থেকে প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করবেন সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একই সময়ে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের কার্যালয়সহ মাঠপর্যায়ের দপ্তরগুলোতেও এই কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
গতকাল বুধবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারী সংগঠন ‘বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য ফোরাম’-এর পক্ষ থেকে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সংগঠনটির নেতারা জানান, দাবি পূরণ না হলে ৩১ তারিখের পর নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। সংবাদ সম্মেলনে সংশোধিত অধ্যাদেশকে ‘অবৈধ কালো আইন’ উল্লেখ করে ঐক্য ফোরামের কো-চেয়ারম্যান বাদীউল কবীর বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের ব্যাপারে আমরা একটি সবুজ সংকেত পেয়েছি। আশা করছি, আলোচনার মাধ্যমে কর্মচারীদের সন্তোষজনক সমাধান মিলবে।’
তিনি জানান, আসন্ন ঈদ, বাজেট এবং চলমান আলোচনার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে তারা আপাতত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত সচিবালয় ও মাঠপর্যায়ের দপ্তরগুলোতে কর্মবিরতি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে জরুরি সেবার ক্ষেত্রে কর্মবিরতির সময়সীমা আধা ঘণ্টায় সীমিত রাখার অনুরোধ জানান তিনি।
ঐক্য ফোরামের আরেক কো-চেয়ারম্যান মুহা. নূরুল ইসলাম বলেন, ‘৩১ মে পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে। এরপর দাবি পূরণ না হলে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। আন্দোলন থেকে পিছিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই।’
গত মঙ্গলবারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ভূমি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব এএমএম সালেহ আহমেদের নেতৃত্বে কয়েকজন সচিব আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদের কাছে উপস্থাপন করেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব তা প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তুলে ধরবেন বলে জানা গেছে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে আন্দোলনকারী কর্মচারী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন এই সচিবরা। ওই বৈঠকের পর আন্দোলনকারীরা গতকাল বুধবারের কর্মসূচি একদিনের জন্য স্থগিত করেছিলেন।
গত বৃহস্পতিবার অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ সংশোধন করে ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ ’-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর রবিবার সন্ধ্যায় সরকার এই অধ্যাদেশ জারি করে। এর বিরোধিতা করে গত শনিবার থেকে সচিবালয়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বিপুলসংখ্যক কর্মচারী বিক্ষোভ ও সমাবেশে অংশ নেন। তারা এই অধ্যাদেশকে দমনমূলক ও ‘কালো আইন’ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে তা বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছেন।
কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি ২৫ ক্যাডার কর্মকর্তাদের : প্রশাসন ক্যাডারের ‘বৈষম্যমূলক আচরণের’ প্রতিবাদে শিগগিরই কঠোর কর্মসূচির পরিকল্পনা করছে ২৫টি ক্যাডারের কর্মকর্তারা। গতকাল বুধবার দ্বিতীয় দিনের কলমবিরতি পালন শেষে ‘আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদ’- এর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈষম্যমূলকভাবে প্রশাসন ক্যাডারদের করা বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত ও বিভাগীয় মামলার প্রতিবাদে সারা দেশের বিভিন্ন দপ্তরে অত্যন্ত সফলভাবে কলমবিরতি কর্মসূচি পালিত হয়েছে। আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদের আহ্বানে দেশের বিভিন্ন দপ্তরে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত পরিষদের অন্তর্ভুক্ত সিভিল সার্ভিসের ২৫টি ক্যাডারের কর্মকর্তারা দুই দিনব্যাপী এ কর্মসূচি পালন করেন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসন ক্যাডারের সদস্যরা মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরে মারামারি, মিছিল ও জনপ্রশাসনে শোডাউন করেন। সংস্কার কমিশনকে আল্টিমেটাম দেন। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি শুরু হয় এবং প্রশাসন ক্যাডারের সদস্যরা বাকি ২৫টি ক্যাডারের সদস্যদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। এসব লেখালেখির কারণে ২৫ ক্যাডারের ১২ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।
সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে বিষয়টি সমাধানের জন্য আশ্বস্ত করা হয়েছিল। তবে দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টিকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও সম্প্রতি কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম শুরু করেছে। অথচ, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা সরকারি বিধি-বিধান বহির্ভূত কার্যকলাপের পরও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
পরিষদ জানায়, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন উত্থাপিত প্রতিবেদনে দুর্নীতিমুক্ত জনসেবা নিশ্চিত করার মতো কোনো সুপারিশ দেখা যায়নি। বরং একটি নির্দিষ্ট ক্যাডারের গোষ্ঠীস্বার্থে পক্ষপাতদুষ্ট সুপারিশ বিদ্যমান। জেলা পরিষদ ভেঙে দিয়ে ডিসিকে জেলার প্রধান এবং তাকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ পদ আপগ্রেডেশনের সুপারিশ করা হয়েছে।
পরিষদ মনে করে, কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে একটি ভৌগোলিক এলাকায় কোনো সরকারি চাকরিজীবী প্রধান হতে পারেন না। তাই জেলা পরিষদকে শক্তিশালী ও কার্যকর করে জনগণের প্রতিনিধিকে জেলার প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে দাবি করে পরিষদ।
এ ছাড়া, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন তার প্রতিবেদনে উদ্দেশ্যমূলকভাবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিসংখ্যান, ডাক, পরিবার-পরিকল্পনা, কাস্টমস ও ট্যাক্স ক্যাডারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি করেছে। উপসচিব পুলে প্রশাসন ক্যাডারের জন্য ৫০% কোটা রেখে অন্যান্য ২৫টি ক্যাডারের জন্য ৫০% পরীক্ষার ভিত্তিতে নিয়োগের সুপারিশ করেছে, যা জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে পরিষদ মনে করে।
‘আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদ’- এর সঙ্গে কোনো রকম আলোচনা ছাড়া এমন সব সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারের সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকলেও সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ক্যাডারের পক্ষপাতদুষ্ট নির্যাতনমূলক আচরণের প্রতিবাদে কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হচ্ছে পরিষদ।
