বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় প্রতিরক্ষামূলক একটি যন্ত্রের নাম অটোমেটিক সার্কিট রিক্লোজার (এসিআর)। গুরুত্বপূর্ণ এমন যন্ত্র সরবরাহের জন্য একটি অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সুপারিশ করার অভিযোগ উঠেছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) বিরুদ্ধে।
আরইবি’র বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন ধরনের নিন্মমানের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি সংস্থাটির অধীনস্থ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে গছিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব নিন্মমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহারে গ্রাহক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের তোপের মুখে পড়তে হয় সমিতির কমকর্তা-কর্মচারীকে। এ নিয়ে সমিতির পক্ষ থেকে একাধিকবার আপত্তি জানালেও আরইবি তা আমলে নেয়নি। উল্টো তাদেরকে নানাভাবে হয়রানি করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
আরইবির এসব অপকর্মের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের পদত্যাগ এবং নিজেদের বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে কর্মবিরতিসহ টানা নানা ধরনের আন্দোলন চালিয়ে আসছেন সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
এসিআর এমন একটি ডিভাইস যা বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের হলে ফিডারের একটি অংশকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফল্ট কারেন্ট প্রবাহে বাধাগ্রস্ত করে। মূলত নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র।
সূত্রমতে, গত ৫ ফেব্রুয়ারি দুটি প্যাকেজের আওতায় ১২০টি ১১ কেভি এবং ১০০টি ৩৩ কেভি এসিআর কেনার জন্য স্থানীয়ভাবে দরপত্র আহ্বান করে আরইবি। এসব দরপত্রে অংশ নেয় একাধিক প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে ‘এম আর বি আর করপোরেশন’ নামের একটি নতুন কোম্পানি দক্ষিণ কোরিয়ার বিএইচ সিস্টেম কোম্পানি লিমিটেডের পণ্য সরবরাহের প্রস্তাব দেয়।
অভিযোগ রয়েছে, এই কোম্পানি বা তাদের প্রস্তাবিত সরবরাহকারী পূর্বে বাংলাদেশের কোনো বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় কিংবা নিজ দেশ সহ পৃথিবীর কোথাও কোনো বিদ্যুৎ বিতরণী সংস্থায় দরপত্রে চাহিদাকৃত ১১ কেভি এসিআর সরবরাহ করেনি। সংশ্লিষ্ট মূল্যায়ন কমিটি তাদের প্রস্তাবিত পণ্যের কার্যকারিতা যাচাই-বাছাই না করে অনভিজ্ঞ এসিআর উৎপাদনকারী ও সার্ভিস প্রদানকারী দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সুপারিশ করেছে। একই কোম্পানিকে ৩৩ কেভি এসিআর সরবরাহার কাজে ৭১৩ নম্বর বোর্ড সভায় কারিগরিভাবে নন রেসপন্সিভ করা হয়েছে।
দরপত্রের শর্ত অনুসারে উৎপাদনকারীর ন্যূনতম ১ বছরের দরপত্রে আহ্বানকৃত মালের সন্তোষজনক অপারেশনের অভিজ্ঞতা সনদপত্র পৃথিবীর যেকোনো বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা থেকে দিতে হবে। কিন্তু দরপত্রে গুণগত মালামাল ক্রয় নিশ্চিত করার এই শর্তটিকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
দরপত্রে ১২০টি ১১ কেভি এসিআর ক্রয়ের জন্য আহ্বান করা হয়েছে অথচ উক্ত কোরিয়ান কোম্পানির তার ৯ বছরের উৎপাদন মেয়াদে এতগুলো এসিআর বানানোর কোন অভিজ্ঞতা নেই।
সূত্রমতে, দরদাতা প্রতিষ্ঠানটি তাদের দরপত্রের সঙ্গে যে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছে, তাতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের আয় দেখানো হয়েছে ১৩ লাখ ৪৯ হাজার টাকা, যা আয়কর বিভাগের একজন উপ-কর কমিশনার কর্তৃক প্রত্যয়নও পেয়েছে। কিন্তু ‘হাফিজ আহমেদ অ্যান্ড কোং’ কর্তৃক জারি করা অডিট রিপোর্ট অনুসারে- ৩০ জুন, ২০২৪ তারিখে সমাপ্ত বছরের আয় ছিল ১ কোটি ২০ লাখ ১১ হাজার ৩২৯ টাকা।
এর আগে, আরইবি ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে চার্ডন কোরিয়া কোম্পানি লিমিটেডের কাছ থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকার ৫২৭টি এসিআর কিনে, যেগুলোর প্রায় সবকটিই খুব অল্প অতিদ্রুত সময়ের মধ্যেই বিকল হয়ে যায়। সাবস্টেশন এবং বিদ্যুৎ বিতরণ লাইনে সংযোগ দেওয়ার পর পর্যায়ক্রমে সব কয়টি এসিআর অকার্যকর হয়ে পড়ে। এসিআরগুলো উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ক্রয় করা হলেও তৎকালীন সময়েও উক্ত চার্ডন কোরিয়া কোম্পানি লিমিটেডের ৩৩ কেভি এসিআর বানানো এবং তাদের মালামালের পৃথিবীর যেকোন দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থায় তিন বছরের সন্তোষজনক অপারেশনের শর্তটিকে উপেক্ষা করা হয়েছিল ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া যথাযথভাবে দরপত্রের শর্ত অনুসরণ করে করা হয়নি। পরবর্তীকালে এই ব্যাপারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই অপকর্মের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সুপারিশ করলেও আরইবি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এ ঘটনার পেছনে একটি পুরাতন স্বার্থন্বেষী সিন্ডিকেটের পুনরায় সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
তাছাড়া ইতোপূর্বে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড সিংসান কোরিয়া থেকেও ৩০০টি নিন্মমানের এসিআর ক্রয় করেছিল, যা ব্যবহার করা যায়নি শেষ পর্যন্ত। পরবর্তীকালে উক্ত এসিআর প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। কিন্তু নিন্মমানের এসব যন্ত্রপাতি কেনার আর্থিক দায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপর পড়ে শেষ পর্যন্ত। কারণ সমিতির যাচাই বাছাই করে ঠিকাদারের কাছ থেকে সরাসরি যন্ত্রপাতি কেনার সুযোগ নেই। তাদেরকে আরইবি’র কাছ থেকেই কিনতে হয়। এই সুযোগ আরইবি নিন্মমানের যন্ত্রপাতি গছিয়ে দেয়।
বিদ্যুৎ খাতের নানা অনিয়ম-অপচয় ও বকেয়া বিল ঠেকাতে স্মার্ট প্রিপেইড মিটার সংযোজনের উদ্যোগ নিয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এ মিটার কেনার প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড বিরুদ্ধে ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতিরও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এস এম জিয়া-উল-আজিমকে বারবার ফোন ও মেসেজ করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
চাঁদপুরে বিজিএফের চাল উদ্ধার, ইউপি সদস্য গ্রেপ্তার
ঝিনাইদহে অনলাইন জুয়া সাইটের বাংলাদেশি এজেন্ট গ্রেপ্তার
বরুড়ায় একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গরু ছাগলের হাট 