ষোড়শ শতকে নির্মিত ঐতিহাসিক মসজিদ

আপডেট : ০৪ জুন ২০২৫, ১২:২৭ এএম

টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ি উপজেলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ধনবাড়ি নওয়াব শাহী জামে মসজিদ। স্থাপত্যের সৌন্দর্য, ধর্মীয় গাম্ভীর্য ও ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে এ মসজিদ শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং বহুকালের ইতিহাস ও মুসলিম ঐতিহ্যের সমন্বিত প্রতিচ্ছবি। ষোড়শ শতকে নির্মিত এ মসজিদটি যুগে যুগে সংস্কার ও সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে যেমন টিকে আছে, তেমনি বহন করে চলেছে পূর্বপুরুষদের কীর্তিগাথা।

মোগল শাসনামলে নির্মিত অসংখ্য ধর্মীয় স্থাপনার মধ্যে ধনবাড়ির এই মসজিদটি একটি উজ্জ্বল নিদর্শন। এ মসজিদ যেমন স্থাপত্যগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিস্ময়কর, তেমনি ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। সেলজুক তুর্কি বংশীয় ইসপিঞ্জার খাঁ ও মনোয়ার খাঁর হাতে নির্মিত এই মসজিদে মিশে আছে আকবরীয় আমলের ইতিহাস। পরবর্তী সময়ে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর উদ্যোগে এর পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণ একে দিয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া, বাড়িয়েছে স্থাপত্যের গাম্ভীর্য ও নান্দনিকতা।

মসজিদের গম্বুজ, মিনার, মেহরাব, খিলান, কড়ি পাথরের কারুকাজ এবং অন্দরমহলের মোজাইকসহ প্রতিটি নির্মাণ উপাদান প্রাচীন মুসলিম শিল্পকলার পরিচায়ক। শুধু তাই নয়, এ মসজিদকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি কমপ্লেক্স, যার মধ্যে রয়েছে মাদ্রাসা, ঈদগাহ, কবরস্থান এবং একটি বিশাল দীঘি। সময় যতই এগিয়েছে, ততই এই মসজিদ রূপ নিয়েছে আধ্যাত্মিকতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রাণমঞ্চে।

সম্রাট আকবরের সময়ে সেলজুক তুর্কি বংশের ইসপিঞ্জার খাঁ ও মনোয়ার খাঁ ধনবাড়ির অত্যাচারী জমিদারকে পরাজিত করার পর এ অঞ্চলের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের ভেতরের দেয়ালে কড়ি পাথরের লতাপাতা আঁকা অসংখ্য রঙিন নকশা ও কড়ি পাথরের মোজাইক করা প্রাচীন স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন পরিলক্ষিত হয়। মসজিদটি দেয়ালের বাইরের অংশেও রয়েছে সিমেন্ট আর কড়ি পাথরের টোরাকাটা নকশা।

মসজিদটি প্রায় ১০ কাঠা জমির ওপরে অবস্থিত। সংস্কারের আগে মসজিদটি ছিল আয়তাকার। তখন এর দৈর্ঘ্য ছিল ৪৫ ফুট এবং প্রস্থ ছিল ১৫ ফুট। কিন্তু সংস্কারের পর মসজিদটির আকার অনেকটা পরিবর্তিত হয়ে যায়।

বর্তমানে এটি একটি বর্গাকৃতির মসজিদ এবং সাধারণ তিন গম্বুজ বিশিষ্ট আয়তাকৃতির মোগল মসজিদের সঙ্গে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ। সংস্কারের পর মসজিদের প্রাচীনত্ব কিছুটা লোপ পেলেও এর চাকচিক্য ও সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। সুন্দর কারুকার্যময় এ মসজিদের পূর্বদিকে বহু খাঁজবিশিষ্ট খিলানযুক্ত তিনটি প্রবেশপথ, এ ছাড়া উত্তর ও দক্ষিণে আরও একটি করে সর্বমোট পাঁচটি প্রবেশ পথ রয়েছে।

মসজিদটির চারদিক থেকে চারটি প্রবেশ পথ এবং ৯টি জানালা রয়েছে। ৩৪টি ছোট ও বড় গম্বুজ রয়েছে। বড় ১০টি মিনারের প্রত্যেকটির উচ্চতা ছাদ থেকে প্রায় ৩০ ফুট সুউচ্চ। মসজিদের দোতলার মিনারটির উচ্চতা প্রায় ১৫ ফুট। মসজিদটির ৫ ফুট উচ্চতা এবং ৩ ফুট প্রস্থের মেহরাব দেখতে আকর্ষণীয় এবং সুপ্রাচীন। এখানে বসে ইমাম খুতবা পাঠ করেন।

মসজিদটির অনন্য একটি বৈশিষ্ট্য হলো সুউচ্চ ৩০ ফুট উচ্চতার মিনারের চূড়ায় ১০টি তামার চাঁদ মিনারের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মসজিদের সংরক্ষিত কক্ষে শোভা পাচ্ছে ১৮টি হাঁড়িবাতি। যা নারিকেল তৈল দ্বারা আলোর কাজে ব্যবহৃত হতো। রয়েছে মোগল আমলে ব্যবহৃত তিনটি ঝাড়বাতিও।

মসজিদ নির্মাণে চুন, সুরকি, সাদা সিমেন্ট, কড়ি পাথর, লোহার খাম ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়েছে। এ মসজিদের পাশেই রয়েছে শানবাঁধানো ঘাট ও কবরস্থান। যেখানে দাফন করা হয়েছে নবাব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীকে।

সুপ্রাচীন এ মসজিদটিতে একসঙ্গে ২০০ মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রাচীন আমলের মানুষের ইবাদত-বন্দেগি ও ইসলামি ঐতিহ্যের স্মৃতিচিহ্ন ধারণকারী ধনবাড়ি নওয়াব শাহী মসজিদটি ইসলামি ঐতিহ্য ও কালের সাক্ষী এবং সুপ্রাচীন ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত