ছেলের হাসির জন্য বাবার অবিশ্বাস্য ত্যাগ

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৫, ০৮:৩৮ এএম

সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে একজন বাবা কতটা দূর যেতে পারেন, তার বাস্তব উদাহরণ গড়েছেন গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর রাজু মিয়া (৫৫)। অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেও পিতৃত্বের দায়িত্ব ও ভালোবাসা তাকে সাহস জুগিয়েছে এক অসাধ্য পথ পাড়ি দেওয়ার।

ছেলের ইচ্ছা পূরণে রাজধানী ঢাকায় আড়াই মাস রিকশা চালিয়ে পুরোনো একটি বাইসাইকেল কিনে বাড়ি ফিরেছেন রাজু মিয়া। কিন্তু বাড়িতে তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য আলাদা করে কোনো পরিবহনভাড়া তাঁর সাধ্যের মধ্যে ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে তিনি নিজেই সাইকেল চালিয়ে ঢাকার পথ ধরেন। গন্তব্য, গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে তালুকজামিরা কবিরাজপাড়া গ্রাম। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে সেই সাইকেল তিনি তুলে দেন সন্তানের হাতে।

ঈদের আগের এই ত্যাগের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর ছড়িয়ে পড়ে রাজু মিয়ার এই ব্যতিক্রমী যাত্রার গল্প। ঈদের দিন বিকেলে প্রতিবেদক গিয়ে হাজির হন পলাশবাড়ীর হরিণাথপুর ইউনিয়নের তালুকজামিরা কবিরাজপাড়া গ্রামে। দেখা গেল, এক টুকরো বসতভিটার ওপর দুটি টিনশেড ঘর। এর একটি জরাজীর্ণ, যেখানে স্ত্রীসহ থাকেন রাজু মিয়া। অন্য ঘরটিতে থাকেন তাঁর ছেলে ও মেয়ে। বাড়িটি যেতে হয় অন্যের জমির আইল ও বাঁশঝাড়ের পথ পেরিয়ে।

রাজু মিয়া অল্প অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন একজন দিনমজুর। তিন শতক ভিটা ছাড়া তাঁর কোনো জমিজমা নেই। জীবন কাটে কখনো কৃষি শ্রমিক, কখনো রিকশাচালক হিসেবে কাজ করে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, ছোট মেয়ে গাইবান্ধা সরকারি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে। একমাত্র ছেলে রেজওয়ান এ বছর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে পলাশবাড়ীর তালুকজামিরা দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে।

এই রেজওয়ানের স্কুলে যাতায়াতের মাধ্যম ছিল একটি বাইসাইকেল, যা তাকে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় মামা রবিউল ইসলাম উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় সেই সাইকেল চুরি হয়ে যায়। এরপর সে বাবার কাছে একটি নতুন সাইকেল চায়। কিন্তু রাজু মিয়ার পক্ষে তখন তা কেনা সম্ভব ছিল না।

এ বছর রমজানে কাজের খোঁজে ঢাকায় যান রাজু মিয়া। নাখালপাড়ার একটি মেসে থেকে প্রতিদিন রিকশা চালান। দৈনিক আয় ছিল গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। এর মধ্যে খাওয়া, থাকা, রিকশাভাড়াসহ খরচ হয়ে যেত ৭৫০ টাকা। তারপরও তিনি একটু একটু করে সঞ্চয় করছিলেন ছেলের সাইকেলের জন্য। ঈদের আগমুহূর্তে জমা হয় ৪ হাজার ৩০০ টাকা। এর মধ্যে দুই হাজার টাকা দিয়ে নাখালপাড়া থেকেই কিনে নেন একটি পুরোনো বাইসাইকেল।

কিন্তু ঢাকা থেকে সাইকেল বাড়ি পৌঁছানো ছিল তাঁর পক্ষে দুঃসাধ্য। বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি সাইকেল চালিয়ে যান আবদুল্লাহপুর। সেখান থেকে গাইবান্ধাগামী কোনো বাসে উঠতে গেলে বাসের সুপারভাইজার সাইকেলসহ তাঁর ভাড়া চান ৫ হাজার টাকা। রাজু মিয়ার কাছে এত টাকা ছিল না। চেষ্টা করেন ট্রাক কিংবা পিকআপে ওঠার, কিন্তু সেখানেও মিলেনি সহানুভূতি। বাধ্য হয়ে তিনি নিজেই সাইকেল চালিয়ে রওনা দেন।

যাত্রাপথে সবচেয়ে বড় বিপত্তি ঘটে যমুনা সেতুতে। কারণ সেতুতে বাইসাইকেল চলাচল নিষেধ। তিনি একাধিক বাস ও ট্রাকচালকের কাছে অনুরোধ করেন তাঁকে পার করে দেওয়ার জন্য, কিন্তু কেউ সাড়া দেননি। অবশেষে একটি ট্রাকের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েন তিনি। বাধ্য হয়ে ট্রাকচালক তাঁকে পার করে দেন, তবে এর বিনিময়ে দিতে হয় ৫০০ টাকা।

এরপর আবার সাইকেল চালিয়ে যাত্রা শুরু করেন। বৃহস্পতিবার রাত একটার দিকে বগুড়ার চারমাথা ও মাটিডালির মাঝামাঝি সেনাবাহিনীর একটি তল্লাশিচৌকিতে তাঁকে থামানো হয়। ঢাকা থেকে সাইকেল চালিয়ে ফেরার গল্প শুনে সেনা সদস্যরা মুগ্ধ হয়ে তাঁকে একটি ট্রাকে উঠিয়ে দেন। ট্রাকটি তাঁকে ভোরবেলা নামিয়ে দেয় গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে। সেখান থেকে আবার সাইকেল চালিয়ে শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বাড়ি পৌঁছান এবং ছেলের হাতে তুলে দেন সাইকেলটি।

রাজু মিয়া ও সেনা সদস্যদের কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

রাজু মিয়া বলেন, “সাইকেলটা ও তেইশ শ ট্যাকা নিয়্যা ঢাকাত থাকি রওনা দিচিলাম। পথোত যমুনা বিরিজ পার হওয়া, টেরাক ভাড়া ও খাওয়া মিলি তেরো শ ট্যাকা গেচে। খালি এক হাজার ট্যাকা নিয়্যা বাড়িত আচ্চি। ত্যাক দিয়্যা চাউল ও সোংসারের জিনিসপাতি কিনচি। কিন্তু ঈদোত খাবার জন্নে গোশত কিনব্যার পাই ন্যই। ঈদের দিন মানসে কিচু গোশত দিচে, তাক খামো। হামার কসটো হোক, কিনতু ব্যাটা সাইকেলকোনা পায়্যা খুবি খুশি হচে। তাতেই হামি খুশি। কষ্ট হলেও ব্যাটাক আরও নেকাপড়া করামো।”

ছেলের মুখে সাইকেল পেয়ে যে হাসি ফুটেছে, তা-ই যেন রাজু মিয়ার সকল কষ্টের প্রতিদান। রেজওয়ান সাইকেল হাতে পেয়ে প্রথমে বড় বোনের বাড়ি, এরপর নানাবাড়ি যায়। ঈদের দিন সাইকেল চালিয়ে ঘুরেছে নানা জায়গায়।

রেজওয়ান বলে, “আমার বাবার মতো বাবা সবারই হোক। বাবাকে নিয়ে আমি গর্ববোধ করি।”
ভবিষ্যতে প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে সে, আর বাবার এই ত্যাগ কখনো ভুলবে না বলে জানিয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত