পৃথিবীর উৎস সূর্য। এই জ্বলন্ত গোলকটি শুধু পৃথিবীকে আলো ও তাপই দেয় না, এর প্রচণ্ড শক্তি মাঝেমধ্যে আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রাকেও বিপর্যস্ত করে। সৌরঝড়ের কারণে স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যাহত হয়, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে এরই মধ্যে অরোরার মতো মুগ্ধকর দৃশ্যও সৃষ্টি হয়। এত কাছে থাকা সত্ত্বেও সূর্যের অনেক রহস্য এখনো অজানা। তবে, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার (ইএসএ) সোলার অর্বিটার মহাকাশযান প্রথমবারের মতো সূর্যের দক্ষিণ মেরুর ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সেই রহস্যের একটি অংশ উন্মোচন করেছে। এই ঐতিহাসিক সাফল্য বিজ্ঞানীদের কাছে সূর্যের গতিশীল প্রকৃতি বোঝার এক নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে।
২০২০ সালে উৎক্ষেপিত সোলার অর্বিটার সূর্যের কাছাকাছি পৌঁছে এর আচরণ পর্যবেক্ষণ করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। এই মহাকাশযানটি সূর্যের মেরু অঞ্চলের দিকে অনন্য কোণ থেকে দৃষ্টিপাত করতে সক্ষম, যা পূর্বে কোনো মহাকাশযান করতে পারেনি। সম্প্রতি ধারণ করা দক্ষিণ মেরুর ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করে ইএসএ জানিয়েছে, এই চিত্রগুলো সূর্যের চৌম্বকীয় ক্ষেত্র এবং এর তীব্র কার্যকলাপ বোঝার ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাবে।
ছবিগুলোতে দেখা যায়, সূর্যের বায়ুমণ্ডল, যাকে করোনা বলা হয়, ঝকঝকে উজ্জ্বল। এর কিছু অংশের তাপমাত্রা ১০ লাখ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায়, আবার কিছু অঞ্চলে তুলনামূলক ঠা-া গ্যাসের মেঘ রয়েছে, যেগুলোর তাপমাত্রা প্রায় ১ লাখ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই গ্যাসের মেঘ এবং অগ্নিশিখার মতো বক্ররেখাগুলো সূর্যের পৃষ্ঠে চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের গতিশীলতার ফল। এই চৌম্বকীয় ক্ষেত্রই সৌরঝড়ের জন্য দায়ী, যা পৃথিবীর প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর জন্য হুমকি।
ইএসএ-র বিজ্ঞান বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ক্যারোল ম্যান্ডেল এই সাফল্যকে ‘মানবজাতির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, ‘এই ছবিগুলো সূর্যের খুব কাছ থেকে তোলা সবচেয়ে বিস্তারিত চিত্র। এগুলো আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে কীভাবে সূর্য কাজ করে এবং কেন এটি মাঝেমধ্যে এত অস্থির হয়ে ওঠে।’
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক লুসি গ্রিন এই অর্জনকে ‘ধাঁধার হারানো অংশ’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘সূর্যের মেরু অঞ্চলের চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের পরিবর্তন সম্পর্কে আমাদের কাছে এত দিন কোনো তথ্য ছিল না। সোলার অর্বিটার এই তথ্য সরবরাহ করে আমাদের সৌর গবেষণায় নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।’
তিনি জানান, এই তথ্যের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এখন সূর্যের তরল প্রবাহ এবং চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের গতিবিধি পরিমাপ করতে পারছেন, যা মেরু অঞ্চলে সৌর কার্যকলাপকে প্রভাবিত করে।
সূর্যের পৃষ্ঠ একটি গতিশীল তরল গোলক, যেখানে চৌম্বকীয় ক্ষেত্র সবসময় ঘুরছে, অগ্নিশিখা তৈরি করছে এবং সৌর বায়ু ছড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতি ১১ বছরে সূর্যের চৌম্বকীয় ক্ষেত্র জটিল ও অস্থির হয়ে ওঠে, যার ফলে এর উত্তর ও দক্ষিণ মেরু অদলবদল করে। এই সময়ে সৌরঝড় তৈরি হয়, যা পৃথিবীর দিকে কণা ছুড়ে দেয়। এই ঝড়গুলো স্যাটেলাইট, বিদ্যুৎ গ্রিড এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য হুমকি, তবে আকাশে অরোরার মতো দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক ঘটনাও সৃষ্টি করে।
সোলার অর্বিটারের ‘স্পাইস’ যন্ত্রটি সূর্যের বিভিন্ন রশ্মির তীব্রতা পরিমাপ করে, যা হাইড্রোজেন, কার্বন, অক্সিজেন, নিওন ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো রাসায়নিক উপাদান থেকে নির্গত হয়। এই যন্ত্র প্রথমবারের মতো বর্ণালি রেখার সাহায্যে সৌর পদার্থের গতি পরিমাপ করেছে, যা সৌর বায়ুর প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ওয়েন বলেন, ‘এই তথ্য আমাদের মহাকাশ আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তবে, তীব্র সৌর বিস্ফোরণের সংকেত শনাক্ত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।’
