গলের আকাশে যেমন ভেসে বেড়ায় হঠাৎ জমে ওঠা মেঘ, তেমনি বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপে দীর্ঘদিন ধরে ঘনিয়ে ছিল শঙ্কার ঘনঘোর। প্রতিভা ছিল, অভিজ্ঞতাও ছিল। কিন্তু 'ছিল'—এই শব্দটাই যেন হয়ে উঠেছিল এক প্রেতময় অতীত। হিমালয় পাড়ি দিয়ে ফিরে আসা পাণ্ডবদের মতো, সেই অতীতকে পেছনে ফেলে মুশফিক, শান্ত আর লিটন যেন গলে লিখে গেলেন এক নতুন মহাকাব্যিক অধ্যায়—দীর্ঘ অনাহারে থাকা দ্রৌপদীকে পাণ্ডবদের দেওয়া শপথের মতো।
এটা কেবল তিনটি ইনিংস নয়, এটা একসঙ্গে তিনটি ঘোষণা। যেন তারা বললেন, ‘আমরা ফুরিয়ে যাইনি।’ একদিকে নাজমুল হোসেন শান্ত—যাকে হুট করে সরানো হয়েছে ওয়ানডের নেতৃত্ব থেকে, আর একদিকে মুশফিক—যার সামনে ক্যারিয়ারের শততম টেস্ট অপেক্ষা করছে। কিন্তু তার আগেই ব্যাট যেন বিদ্রোহ জানিয়ে বললো, ‘এখনো অনেক কথা বাকি।’আর ছিলেন লিটন দাস—বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের অর্জুন, যার ব্যাটিং শৈলীতে চোখ জুড়িয়ে যায় দর্শকদের। অথচ শেষ ১০ ইনিংসে কোনো অর্জুনসুলভ লক্ষ্যে পৌঁছাননি! তিনজনেই যেন নিজ নিজ শরণ্যে অজ্ঞাতবাসে ছিলেন।
আর গল যেন হয়ে উঠলো কুরুক্ষেত্র—যেখানে আত্মসম্মান, আত্মবিশ্বাস আর নিজের জায়গা ফিরে পাওয়ার যুদ্ধটা তারা শুরু করলেন ব্যাট হাতে।
শান্তর ব্যাটে ২১ ইনিংস পর সেঞ্চুরি। ১৪৮ রানের এক ধৈর্যের উপাখ্যান ছিল সেটা। শান্ত যেন হয়ে উঠেছিলেন যুধিষ্ঠির—যিনি কথায় নয়, কাজে প্রমাণ দেন নিজেকে। আত্মবিশ্বাস হারানোর অভিযোগ, নেতৃত্ব হারানো—সব কিছুকে পেছনে রেখে ব্যাটে তুলে নিলেন প্রতিবাদের সুর। ১৫ চার আর ১ ছক্কার ইনিংসে তিনি যেমন বলের শাসক, তেমনি ছিলেন সময়ের নীরব ভ্রমণকারী। ফিরলেন মাথা নিচু করে, কারণ সেঞ্চুরি পেলেও হয়তো ভেতরে আফসোস ছিল—কেন আরেকটু লড়লেন না ডাবল সেঞ্চুরির দিকে? যেমন যুধিষ্ঠির হার মানেন না, তবু নিজের ভুলের বোঝা বয়ে বেড়ান, তেমনি শান্তও জানেন—এই ইনিংস শুরু মাত্র, যুদ্ধ এখনো বাকি।
আর মুশফিবের ইনিংস দেখে মনে হয়েছে ধর্মরাজের ক্লাসে ফেরার যুদ্ধ। ১৪ ইনিংস সেঞ্চুরি ছাড়া, ৬ ইনিংস দুই অঙ্কেও পৌঁছাতে না পারা—একজন অভিজ্ঞ যোদ্ধার এমন নীরবতা তাকে নিয়ে গড়েছিল প্রশ্নচিহ্ন। কিন্তু তার ১৬৩ রানের ইনিংস যেন এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ধ্যানমগ্ন অর্জুনের ধনুর্বিদ্যা। ৩৫০ বল, ৯টি চার, একটিও ঝড় না তুলে, সবটাই এক ধৈর্যের মহাকাব্য। এই ইনিংসটি ছিল না কেবল রান সংগ্রহ—এটি ছিল এক নিঃশব্দ ভাষণ, এক মহাভারতীয় ঘোরা চক্রকে থামানোর প্রয়াস।
যেমন ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির শত চাপে থেকেও নীতির পথ ছাড়েন না, তেমনি মুশফিকও কৌশলে না, আত্মমর্যাদায় ফিরলেন। শততম টেস্টের আগে তার এই সেঞ্চুরি ছিল এক বার্তা, ‘আমি বিদায় নিচ্ছি না, বরং আরও একবার উঠছি।’
আর লিটন! তিনি যেন অর্জুনের ন্যায়, লক্ষ্যভ্রষ্ট নিপুণতা। ১০ ইনিংস পর পাওয়া ফিফটি, কিন্তু শেষ ১০ রান নেওয়ার আগেই থেমে যাওয়া! লিটনের ৯০ রানের ইনিংসটি ছিল যেন অর্জুনের সেই মুহূর্ত—যখন তিনি কুরুক্ষেত্রে ভীষ্মকে মারার আদেশ পেলেও দ্বিধায় থেমে গিয়েছিলেন। প্রচণ্ড সৌন্দর্য, নিখুঁত টাইমিং, কিন্তু শেষ ছোঁয়াটা আসেনি। ১১ চার, ১ ছয়ে সাজানো ইনিংসটি যেন শিল্প, কিন্তু অসম্পূর্ণ এক পাণ্ডুলিপি। তিনি ফিরলেন মাথা নিচু করে—কারণ শিল্পী যেমন নিজের অসমাপ্ত কাজ নিয়ে ঘুমাতে পারেন না, লিটনের ব্যাটও জানে—এই গল্পের শেষ এখনো লেখা হয়নি।
মুশফিক, শান্ত আর লিটন—তিনজন তিন অভিমান, তিন যন্ত্রণা আর তিন বিশ্বাস। ত্রয়ী, যারা হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের পাণ্ডব। তারা জবাব দিলেন একসাথে, এক মঞ্চে। তাদের ইনিংস ছিল কেবল রান নয়—ছিল আত্মসম্মানের মহাকাব্য, যা হয়তো পৃষ্ঠা গোনার চেয়েও বড় করে দেখবে সময়।
এই ইনিংস কেবল গলে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসকে ৪৮৪ রানে তুলেনি, এটি তুলেছে তিন পাণ্ডবকে আত্মবিশ্বাসের সিংহাসনে। মাঠে তারা বললেন না কিছু, তবে ব্যাটে তারা শপথ নিলেন, ‘যেমন দ্রৌপদীর চুলে হাত পড়েছিল বলে আমরা ফিরে এসেছিলাম, তেমনি প্রশ্ন উঠেছিল বলে আজ আমরা ব্যাট হাতে ফিরেছি। আর এবার ফেরাটাও ইতিহাস হবে।’
গলে ২৬ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ ৪৮৪/৯
‘কিংবদন্তি’ বাজ্জোর থেকে উপহার পেয়ে উচ্ছ্বসিত মেসি
আলকারাজের প্রথম পছন্দ এমা রাদুকানু